১৪

জ্ঞান যখন ফিরল তখনও মাথাটা ভারী হয়ে আছে। আমি কি মারা গিয়েছি! চোখের সামনেটাও কেমন যেন ঝাপসা লাগছে! উঠে দেখলাম একটা ছোট্টো ঘরে রয়েছি আমি। টেবিলের ওপর শোয়ানো ছিল আমার শরীরটা।

“কী? ঘুম ভাঙল?” গলাটা শুনে চমকে পেছনে তাকিয়ে দেখি অরন্য দাঁড়িয়ে আছে। ওর চুলটা কেমন যেন উসকো খুসকো!

বললাম, “ক’টা বাজে?”

–      “৬ টা বেজে গেছে। সকাল হয়ে গেছে”

–      “কী হয়েছিল?”

অরন্য বলল, “সে কী রে? এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি নাকি?”

ও কথাটা বলার সাথে সাথেই হঠাৎ যেন মনে পড়ে গেল সব টা!

ইরা যখন জিজ্ঞেস করল আমাদের শেষ করে দেবে কিনা।

অভিজিৎ বাবু বললেন, “নাহ! এখানে না! ক্লীন করতে সমস্যা হবে! এদের কোনো ট্রেস রাখা যাবে না!”

ইরা বলল, “তাহলে!”

অভিজিৎ বাবু বললেন, “সুনীল কে ডাকছি! ওদের ল্যাব এ নিয়ে যেতে হবে! ওটা সামনেই।”

কথাটা বলে অভিজিৎ বাবু ফোন বের করে কাউকে একটা ফোন করতে লাগলেন। ইরা আর কিছু বলল না। পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে তাতে কি একটা ওষুধের শিশি থেকে ঢালল। তারপর অরন্যর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এটা সোম এর নাকে চেপে ধরুন!”

আমি তখনই বুঝেছি জিনিসটা ক্লোরোফর্ম!

আমি বললাম, “মানে? ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি!”

ইরা আমার কথায় কর্ণপাত করল না। অরন্যকে বলল, “প্রানে না মেরেও অনেক কিছু করা যায় কিন্তু! সেটা ভুলে যাবেন না অরন্য দেব!”

অরন্য বলল, “এতগুলো মানুষ মারা যাবে ইরা! এতগুলো নির্দোষ মানুষ!”

ইরা বলল, “Not My Problem! রুমালটা ক্যুইক!”

আমি ভাবতে পারছি না। এই ইরার সাথে আমি এত কথা বলেছি! ইন্দ্রাক্ষীর কথা শেয়ার করেছি এর সাথে? সত্যিই মানুষ চেনা বড় দায়! এটা এবার অন্তত আমার বোঝা উচিত!

অভিজিৎবাবু ততক্ষনে ফোন রেখে দিয়েছেন। উনি অরন্যর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “কী ব্যাপার অরন্য দেব! কথা বন্ধ হয়ে গেল তো? কলকাতায় বিস্ফোরন আটকানো গেল না তো!”

অরন্য ঠান্ডা গলায় বলল, “হাম দেখেঙ্গে!”

কথাটা বলে ও রুমালটা নিল! তারপর আমি কিছু বলার আগেই সেটা চেপে ধরল আমার নাকে! প্রথমে অদ্ভুত মিষ্টি একটা গন্ধ! তারপর চোখের সামনে টা যেন অন্ধকার হয়ে গেল! তারপর আর আমার কিছু মনে নেই!

আমি বললাম, “আমরা কোথায়?”

অরন্য বলল, “ওদের কোনো একটা ল্যাব! এখানে বোধহয় ওসব এক্সপেরিমেন্ট হয়! সামনের দরজাটাও লক করা! খোলার চেষ্টা করলাম!”

–      আমাদের মোবাইলগুলো…

–      তুই কি পাগল? ওগুলো আর আমাদের কাছে থাকে কখনও? যখন অজ্ঞান হয়েছিলাম তখনই বের করে নিয়েছে পকেট থেকে।

আমি বললাম, “কিন্তু আমাদের এখনও মারল না কেন!”

অরন্য বলল, “সেটাই ভাবছি!”

আমি বললাম, “অরন্য, ইরা… ইরা আমাদের সাথে…

অরন্য কিছু বলার আগেই হঠাৎ দরজায় চাবির আওয়াজ হল! কেউ একটা আসছে বুঝতে পারলাম।

ঘরে ঢুকলেন অভিজিৎ পুরকায়স্থ এবং আরএসপির নেতা রাজেশ সিনহা!

তাহলে এরা দু’জন আসল নাটের গুরু!

অভিজিৎ বাবু বললেন, “শেষ করার আগে রাজেশ একবার তোমাদের চাঁদবদন দেখতে চাইছিল! তাই নিয়ে এলাম!”

রাজেশ সিনহা বললেন, “এরাই তো আমার ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিল কাল!”

অরন্য বলল, “সেটা তো আর কমপ্লিট হল না!”

রাজেশ সিনহা হেসে বললেন, “ঠিক আছে। আমি মুখ্যমন্ত্রী হলে পরে নিয়ে নিও! ওহো! তোমরা তো বেঁচেই থাকবে না! হে হে!”

নিজের পিজে তে নিজেই হে হে করে হাসতে লাগলেন উনি।

অরন্য বলল, “এক সেকেন্ড! আপনি মুখ্যমন্ত্রী হবেন মানে? ভোটে জিতলে তো অভিজিৎ পুরকায়স্থ মুখ্যমন্ত্রী হবেন শুনলাম!”

রাজেশবাবু মনে হল একবার চমকে উঠলেন আমাদের কথা শুনে!

অভিজিৎবাবু বললেন, “আরে এদের কথা বাদ দিন তো! যা পারছে বলছে! এদের কী তাহলে এক্সপেরিমেন্টাল?”

রাজেশবাবু বললেন, “হ্যাঁ। আবার কী? ওরাও দেখুক আমাদের সিক্রেট ওয়েপন!”

অরন্য বলল, “এটা দিয়েই কী কাল ঐ ৫ টা জায়গায় অ্যাটাক হবে?”

অভিজিৎবাবু হেসে বললেন, “এটা কি ইন্টারভিউ হচ্ছে নাকি?”

অরন্য বলল, “ধরে নিন তাই! ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে জানেন তো!”

অভিজিৎ বাবু বললেন, “স্বর্গে যাবে না নরকে সেটা এত শিওর হচ্ছ কী করে?”

অরন্য বলল, “সিক্রেট ওয়েপন টা ঠিক কী? আর কীভাবে Disburse করবেন সবটা? ওই এরিয়ার জলের লাইন দিয়ে কী?”

রাজেশবাবু বললেন, “বাবাহ! তোমার দেখছি বড্ড কৌতূহল ছোকরা! এটা কি বলিউড সিনেমা পেয়েছো? কী ভাবছো? সব বলে দেবো তোমাকে?”

অরন্য বলল, “আচ্ছা ছাড়ুন! একটা কথা বলুন! এই যে কলকাতায় বম্ব ব্লাস্ট হচ্ছে কাল, এটার মূল মাস্টারমাইন্ড কে? আপনি নাকি অভিজিৎ বাবু?”

অভিজিৎবাবু একবার রাজেশ বাবুর দিকে তাকালেন! তারপর বললেন, “ডক্টর নন্দী কোথায় গেল বলুন তো? ইনজেকশন টা নিয়ে আসতে বললাম তো ওকে!”

রাজেশবাবু পকেট থেকে ফোন বার করতে করতে পেছনে তাকিয়ে বললেন, “এই তো ইরা এসেছে! ইরা ডক্টর নন্দী কোথায় গেল একটু দেখো তো!”

এর পরের ঘটনাটার জন্যে আমি একেবারেই তৈরী ছিলাম না! ইরা এসে রাজেশ সিনহার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কি যেন একটা বলল! কথাটা শুনেই রাজেশবাবু যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন!

তারপর অভিজিৎবাবু কে বললেন, “যা ভেবেছি তাই! আপনারা বিপিএফ এর লোকজন শয়তানেরও অধম!”

অভিজিৎবাবু অবাক হয়ে বললেন, “মানে? আমি? আমি কী করলাম?”

রাজেশবাবু বললেন, “আপনি আমার পেছনে গিয়ে দিল্লীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন? বেঙ্গলের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী নাকি আপনি হবেন!”

অভিজিৎ বাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন! তারপর বললেন, “আমি? আমি কেন এসব বলতে যাবো! আর তাছাড়া সবাই জানে পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হবে! আমি!”

রাজেশবাবু এবার চিৎকার করতে লাগলেন, “ইয়ার্কি পেয়েছেন নাকি? গোটা দলটাকে একা হাতে আমি এতদিন সামলেছি। আর আপনি কটা মুসলমান মেরে হিরো হয়ে যাবেন?”

অভিজিৎবাবু বললেন, “কটা মুসলমান? ১০ লাখ মুসলমান মারছি! ১০ লাখ! বুঝেছেন! এই প্ল্যানটা আমি না নিয়ে এলে এবারের ভোটেও ললিপপ মুখে নিয়ে বসে থাকতেন!”

আমি ভাবলাম হচ্ছে টা কী তখন থেকে! অরন্যও দেখলাম চুপচাপ মজা দেখছে! ইরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। খুব রাগ হচ্ছিল ওর ওপর আমার! ও যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করত তাহলে হয়ত এতক্ষনে যবনিকা পতন হয়ে যেত!

রাজেশবাবু দেখলাম রাগে ফুঁসছেন! ইরার দিকে ফিরে বললেন, “Shoot Him!”

আমি ভাবলাম আরে! এত সামান্য কারনে বলে কিনা Shoot Him! পাগল নাকি? অবশ্য যারা ইলেকশনের জন্যে এতগুলো মানুষ মারার কথা ভাবতে পারে, তাদের কাছে এটা খুব সহজ!

ইরা রিভলবারটা বার করল।

অভিজিৎ বাবু বললেন, “সিরিয়াসলি? আপনি আমার তৈরী বেস এ আমাকে গুলি করতে বলছেন? ভুলে যাবেন না এই পুরো প্ল্যানটা আমার করা! এতগুলো মানুষকে খুন করা, পুলিশ প্রশাসন সমস্ত কিছু কে আমি একা সামলেছি। আমি!”

রাজেশ বাবু ইরার দিকে ফিরে আবার বললেন, “ইরা! তুমি যদি গুলি না চালাও আমি তোমার সুপিরিয়রের সাথে কথা বলব!”

আমি অরন্যর দিকে দেখলাম। ও একমনে নাটক দেখছে মনে হল! আমি তাকাতে আমাকে চোখের ইশারাতে বলল সরে আসতে। আমি আর ও আস্তে আস্তে সরে এলাম ঘরের বাঁদিকটায়!

ইরা রিভলবারটা তুলে অভিজিৎবাবুর দিকে তাক করে বলল, “দেওয়ালের দিকে এগোন?”

অভিজিৎবাবু এবার একটু ভয় পেয়েছেন মনে হল, “মানে? এটা কী হচ্ছে? Are you serious?”

ইরা আবার বলল, “দেওয়ালের দিকে এগোন অভিজিৎবাবু!”

এর পরের চমকটা আরও বড় ছিল আমার জন্যে।

ইরার কথা শুনে অভিজিৎবাবু যখন দেওয়ালের দিকে এগোচ্ছেন! তখন ইরা হঠাৎ রাজেশ সিনহার দিকে তাকিয়ে বলল, “রাজেশবাবু, আপনিও! দেওয়ালের দিকে এগোন!”

মানে? আরে? সবাইকে মেরে দেবে নাকি ইরা?

রাজেশবাবু এটা একদমই এক্সপেক্ট করেন নি। উনি ভুরু কুঁচকে বলে উঠলেন, “What?”

ইরা রাজেশবাবুর পাশেই দাঁড়িয়েছিল। এবার রিভলবার টা ওপর দিকে করে একটা ফলস ফায়ার করল। প্রচন্ড জোর আওয়াজে আমাদের কান ভোঁ ভোঁ করছিল। ওপর থেকে সিলিং এর চাকলা খসে পড়ল ঘরের মধ্যে!

ইরা রিভলবারটা রাজেশবাবুর দিকে তাক করে বলল, “যাবেন… নাকি…

আর কিছু বলতে হল না! রাজেশ সিনহা চুপচাপ গিয়ে দাঁড়ালেন অভিজিৎবাবুর পাশে!

ওরা এতটাই অবাক হয়েছে যে ওদের মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দই বেরোচ্ছে না!

ইরা সবাইকে চমকে দিয়ে অরন্যর দিকে ফিরে বলল, “যেটা দরকার ছিল পেয়েছেন?”

মানে? কী দরকার ছিল? এসব কী হচ্ছে! আমি আর কিচ্ছু ভাবতে পারছি না!

অরন্য বলল, “পেয়েছি! Thank you! বাইরে লোক নেই আর?”

ইরা বলল, “দু’জন গার্ড ছিল! ওরা এখন আরও কিছুক্ষন ঘুমোবে! আর ডক্টর নন্দীর হাত পা বাঁধা রয়েছে চেয়ারের সাথে। তাই আসতে দেরী হয়ে গেল!”

রাজেশ সিনহা বললেন, “এসবের মানে কী? এসব কী ইরা? আমি তোমার সুপিরিয়রের সাথে…

ইরা বলল, “ওহ! আপনি এখনও জানেন না না? আমি আজ বিকেলেই রিজাইন করেছি! আপনাকে জানায় নি কেউ?

অভিজিৎবাবু তখন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন আমাদের দিকে!

অরন্য বলল, “কি অভিজিৎবাবু? কথা বন্ধ হয়ে গেল? বলেছিলাম মনে আছে? হাম দেখেঙ্গে!”

অভিজিৎবাবু বোধহয় এই ঘটনায় এতটাই অবাক হয়ে গেছেন! কী বলবেন কিছু বুঝতেই পারছেন না!

আমি বললাম, “আমায় কেউ বলবে এসব কী হচ্ছে! কেন হচ্ছে? মানে কী ছিল এটা?”

অরন্য বলল, “আপনার কাকু এসে গেছে?”

এই কাকুটা আবার কে! উফফ! আমায় কেউ কিছু বলছেই না!

ইরা বলল, “বাইরে ওয়েট করছে। পুলিশ তো এসেছেই। আর একজন হাই প্রোফাইল মানুষও সাথে আছেন!”

অরন্য বলল, “কে?”

ইরা বলল, “পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় রায়চৌধুরী!”

১৫

“একটা রিপোর্ট লিখতে হবে তো! ওটা তুই করিস! আমি পারি না ওসব!”

কথাটা বলেছে অরন্য। আমরা বসে আছি নাগরিকের অফিসে! অফিসের অন্যান্য কলিগরা তো আছেই! তার সাথে আফসারদা আর ইরাও রয়েছে!

আমাদের কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের কাছে কোনো একটা বাড়িতে! ওটাই ছিল ওদের ল্যাবরেটরি! বাইরে যখন এলাম তখন সবে ভোরের আলো ফুটেছে! মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় রায় চৌধুরীকে আজ খুব কাছ থেকে দেখলাম। আমাদের হাতটা ধরে বললেন, “Thank you! তোমরা না থাকলে কাল হয়ত অনেকগুলো নিরপরাধ মানুষ মারা যেত!”

আমরা হাসলাম। অনেক পুলিশ কে দেখলাম! বাইরে! লালবাজারের ডেপুটি কমিশনার নীলাদ্রী সেন নিজে এসেছেন। মুখ্যমন্ত্রী এসেছে বলে কথা! একটু পর দু’জন কনস্টেবল রাজেশ সিনহা আর অভিজিৎ পুরকায়স্থ কে নিয়ে এল ভেতর থেকে!

আমাদের পাশ দিয়ে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ওঁকে আর রাজেশ সিনহা কে। তখন কেমন যেন অদ্ভুতভাবে হাসলেন উনি আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

আমি অরন্যকে বললাম, “ভেতরে আর কেউ নেই?”

ইরা বলল, “খুব বেশী লোককে এখানে পাওয়া যাবে না। হাতে গোনা কয়েকজন কাজ করে এখানে। তাদের কে পুলিশ ঠিকই খুঁজে নেবে। আর মুখ্যমন্ত্রী যখন নিজে আছেন তখন আশা করি পুলিশ ভুলভাল কিছু করার সাহস পাবে না। এই ল্যাব এই ওই কেমিক্যাল টা বানাচ্ছিল ওরা! যেটা ইনজেক্ট করে মানুষের শরীরে Artificially হার্ট অ্যাটাক দেওয়া যাবে। মানে কলকাতায় বম্ব ব্লাস্টটা আসলে কেমিক্যাল বম্বিং এর…

আমি ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই অরন্য কে বললাম, “চল যাবি তো!”

অরন্য একবার আমার মুখের দিকে তারপর একবার ইরার  দিকে তাকাল!

তারপর বলল, “হ্যাঁ চল যাই। আপনিও চলুন ইরা!”

ইরা ম্লান হাসল। কিছু বলল না। আমার তখনও মাথাটা ওর ওপর গরম হয়েছিল!

তারপরেই আমরা এলাম নাগরিকের অফিসে!  আফসারদা, চঞ্চল এরা কীভাবে খবর পেয়েছিল আমি জানিনা! আমরা আসতেই খুব ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এল সবাই!

আফসারদা বলল, “ঠিক আছো তো?”

সবার যত্নআত্তি সামলে আমরা এখন বসে আছি অফিসেই। আমাকে, অরন্যকে আর ইরা কে ঘিরে বসে আছে সবাই!

অরন্যর রিপোর্ট লেখার কথায় আমি বললাম, “সবটা না জানলে রিপোর্ট টা লিখবো কীভাবে একটু বলবি?”

অরন্য বলল, “সবটাই কিন্তু খুব সহজ!”

আমি বললাম, “সহজ টা আর একটু সহজ করে বোঝা! আমি কিছুই বুঝছি না!”

সবাই দেখলাম অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে রয়েছে পুরো ঘটনা শোনার জন্যে।

অরন্য বলল, “আপাতত সোম যতটা জানে তারপর থেকে শুরু করছি। বাকিটা ওর রিপোর্টে পড়ে নিও সবাই!”

অরন্য বলতে শুরু করল, “প্রথমেই শুরু করি ইরা কে দিয়ে! প্রথম দিনই দেখেছিলাম ইরা বাঁ হাতে সব কাজ করে। আর পুলিশের কথা শুনে মনে হয়েছিল সৃঞ্জয়দাকে যে খুন করেছে সে লেফট হ্যান্ডেড! কাজেই ইরা যখন আমার ফোনে বাঁহাতে ওর নাম্বার টাইপ করে দিল তখন সন্দেহটা আর একটু বাড়ল। তার ওপর কাল সকালে আমি সেন্ট জেভিয়ার্স এ গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে যেটা জানতে পারলাম সেটা হল ইন্দ্রাক্ষীর সাথে এক ব্যাচে ইরাবতী মজুমদার নামে কেউ পড়ে নি! তখন পুরোপুরি শিওর হয়ে গেলাম যে ইরা আমাদের মিথ্যে কথা বলেছে! সুতরাং ওকে ভরসা করা যাবে না! কিন্তু আমি জানতাম ওর সাহায্য ছাড়া কিছু করাও যাবে না!”

আমি একবার ইরার দিকে তাকালাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে তখন থেকে। এক দৃষ্টিতে। কিছু বলতে চায় কি? সাথে সাথে চোখটা সরিয়ে নিলাম আমি।

অরন্য বলে চলল “কাল বিকেলে আমি অফিসে ঢোকার আগে ইরা কে মেসেজ করে অফিসের বাইরে ডেকে পাঠাই আমি! ইরা আসার পর ওকে যখন বলি আমি সবটা জানি! তখন ও জানায় যে সৃঞ্জয়দাকে খুন টা ওকে দিয়েই করানো হয়েছে কারন সৃঞ্জয় দা একটা লুজ এন্ডস হয়ে গিয়েছিল। আমরা জেনে গিয়েছিলাম ওর কথা। তাই সেদিনই ওকে মারার নির্দেশ আসে। কিন্তু সেদিন রাত্রে আমরা হঠাৎ সৃঞ্জয়দার ফ্ল্যাটে হানা দেওয়ায় ও পালানোর সুযোগ পায় নি। এবং তারপরেই আমরা কতটা জানি সেটা দেখার জন্যে ওকে পাঠানো হয়েছিল! ও যদি এগুলো না করত তাহলে নাকি ওর চাকরি থাকত না! আর এরা এতটাই পাওয়ারফুল যে পুলিশ, প্রশাসন কেউ কিছু করতে পারবে না! কারন কারা যে ভালো আর কারা যে খারাপ সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। তারপর আমি ওকে বলি নাগরিকের মত একটা বড় নিউজপেপারে যদি সবটা প্রকাশ করা হয় তাহলে কিন্তু খেলা ঘুরে যাবে! ওকেও আর দিনের পর দিন এই অন্যায় করতে হবে না! প্রথমে ও রাজি হয় নি! কিন্তু পরে আমাদের সাহায্য করতে রাজি হয়! তবে ও কিন্তু জানতো এটার জন্য ওকে সিবিআই ছাড়তে হবে! আমি জানিনা ও কার জন্যে বা কী জন্যে আমাদের সাহায্য করতে রাজি হল! কিন্তু ও না থাকলে এত তথ্য প্রমানসহ সবটা ফাঁস করতে আমরা পারতাম না!”

আমি আর ইরার দিকে তাকাচ্ছি না। কিন্তু আমি জানি ও এখনও আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।

অরন্য বলল, “তারপরেই প্ল্যান ছকে নিই। ওকে বলি আপাতত ও ওর রোলটাই প্লে করুক। আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করুক! কারন ওদের বেস অফ অপারেশন টা আমাদের দেখা দরকার!”

আমি বললাম, “এক সেকেন্ড! এক সেকেন্ড! তুই কী করে শিওর হলি যে ওরা আমাদের নিয়ে যাবে ওদের বেস এ?”

অরন্য বলল, “না নিয়ে গেলেও সমস্যা হত না! কারন প্রমান আমার হাতে তখনও ছিল! তুই খেয়াল করেছিলি কিনা জানিনা। ঘরে ঢোকার আগে আমি ঘরের কোনে রাখা ফুলদানির কাছে গিয়েছিলাম। ছোট্টো একটা ক্যামেরা প্লেস করতে। ইনফ্যাক্ট আমার জামার এই বোতামটাও একটা ক্যামেরা! যদি অভিজিৎবাবু ইরাকে ওখানেই আমাদের খুন করতে বলত তাহলে ওই ক্যামেরাতে সেটাও ধরা পড়ত। আর যদি না বলে আমাদের ওদের বেসে নিয়ে যায় তাহলে জামার বোতামের ক্যামেরাটা কাজে লাগত!”

আমি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম, “এগুলোই কি অপরাজিতর ওয়ারহাউস থেকে নিতে গিয়েছিলি কাল?”

অরন্য সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল। তারপর বলল, “যদি ওদের ল্যাব এ না নিয়ে যেত তাহলে ওই পার্টি অফিসেই ইরা ওর কাকুকে আসতে বলত! তার একটু আগেই ওর কাকু ওখানেই মিটিং এ ছিলেন। কিন্তু ওরা আমাদের ওখানে নিয়ে গেল বলেই অত কিছু জানতে পারলাম। আর রাজেশ সিনহার সাথে অভিজিৎ পুরকায়স্থর ওই ঝামেলার ভিডিওটা একটা বড় প্রমান হয়ে থাকবে! যদিও ওটার পুরো কৃতিত্ব ইরার। আমি ওকে বলিওনি এটা করতে। ও রাজেশ সিনহার কানে কানে কী বলেছিল আমি তাও জানিনা এখনও।”

ইরা বলল, “আমি বলেছিলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে খবর এল। অভিজিৎ বাবু দিল্লী গিয়েছিলেন কয়েকদিন আগে। এই প্ল্যানটা কাজ করলে উনিই পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন!”

আফসারদা বলল, “আচ্ছা ওর কাকুর কথা বললে একটু আগে। তিনি কে?”

ইরা বলল, “দীপাঞ্জন মজুমদার! উনি বিপিএফ এর একজন মেম্বার। ওকে ফোন করে সবটা জানিয়েছিলাম আমি। কাকুই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে খবর পাঠান!”

আমি কিছু বললাম না।

আফসারদা অরন্যকে বলল, “আর এইসব ক্যামেরা সব সময় তোমার সঙ্গে থাকে নাকি? তোমার সাথে তো ব্যক্তিগত কথা বলা যাবেনা দেখছি!”

অরন্য জানে অপরাজিতর কথা আফসারদা কে বলা যাবে না।

ও বলল, “না না! মানে আমার ক্যামেরার শখটা বরাবরই! তবে সব সময় সাথে থাকে না। আজ লাগবে জানতাম। তাই নিয়ে বেরিয়েছিলাম!”

আফসারদা বলল, “তা তোমরা যে এই কেসটায় কাজ করছ সেটা তো আমাকে একবার বলতে পারতে!”

আমি বললাম, “আসলে আফসারদা, যা সব হল পরপর, কাউকে ঠিক ভরসা করতে পারছিলাম না!”

আফসারদা বলল, “তাও একবার বলতে পারতে! ওখানে গিয়ে কী না কি বিপদ হত বলতো!”

অরন্য কিছু একটা উত্তর দিল। আমি খেয়াল করলাম না। আমি তখন ইরা কে দেখছি। ও চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে গেল অফিসের গেটের দিকে। আমার কি ওর পেছনে যাওয়া উচিত! অরন্যর দিকে তাকালাম আমি।

ও ইশারাতে বলল আমাকে যেতে। সবাই অরন্যকে নানারকম প্রশ্ন করছিল!

আমি চেয়ার থেকে উঠে একটু দ্রুত হেঁটে গেলাম ইরার পেছন পেছন। তারপর ডাকলাম ওকে।

“ইরা!”

ইরা থেমে পেছন ফিরে তাকাল। একটু ম্লান হেসে বলল, “বাবাহ! আমি ভাবলাম আর কথাই বলবে না!”

আমি বললাম, “কোথায় যাবে এখন?”

ইরা বলল, “সিবিআই তো আর যাওয়া হবে না! কিছুদিনের জন্য মানুষের চোখ এড়িয়ে থাকাটাই বোধহয় সেফ আমার জন্যে। দেখি কোথায় যাওয়া যায়!”

আমি কী বলব কিছু বুঝতে পারছিলাম না। এই মানুষটাকে আমি কতদিনই বা চিনি। এই অবস্থায় কি বলা উচিত আমার? সান্ত্বনা দেওয়া উচিত কি?

বললাম, “ইরা, ইন্দ্রাক্ষীর নামটা না ব্যবহার করলেই পারতে… ওটা আসলে…

ইরা মাথা নীচু করে বলল, “আসলে আমাকে বলা হয়েছিল তোমাদের বিশ্বাস অর্জন করতে। আমি জানতাম এই নামটা বললে কাজ হবে…

আমি কিছু বললাম না। একটু থেমে ইরা নিজেই বলল, “I am sorry সোমবুদ্ধ! For Everything!”

আমি বললাম, “আরে ধুর! তুমি না থাকলে…

ইরা বলল, “আমি ঠান্ডা মাথায় একটা জলজ্যান্ত মানুষকে খুন করেছি সোম! Don’t justify this.”

আমি বললাম, “সৃঞ্জয় দাকে তো? জানি! And he deserved it. ও ইন্দ্রাক্ষী কে…

আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। ইরা বলল, “আসছি সোম! ভালো থেকো তোমরা!”

কথাটা বলেই আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গেল ইরা! আমি কতক্ষন ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়েছিলাম জানিনা!

হঠাৎ পায়ের আওয়াজ পেয়ে পাশে তাকিয়ে দেখলাম অরন্য দাঁড়িয়ে!

ওর সেই চিরপরিচিত প্রশ্নটা আবার করল ও। “ঠিক আছিস?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ।”

তারপর বললাম, “আচ্ছা এই স্টিং অপারেশনটা তো আর স্টিং হল না। মানে এখন যদি তুই এটা অপরাজিত কে দিস তাহলে তো ওর সাথে যে তুই জড়িত সেটা জেনে যাবে লোকজন!”

অরন্য বলল, “সেই জন্যেই তো এটা অপরাজিত তে প্রকাশ পাবে না! নাগরিকে বেরোবে। তুই লেখ ভালো করে সবটা!”

আমি বললাম, “অপরাজিত কিছু বলবে না?”

অরন্য বলল, “নাহ। ওরা শুধু চায় সত্যিটা সামনে আসুক! এবারের মত না হয় নাগরিকই অপরাজিতর ভূমিকা পালন করুক।”

কথাটা বলে অফিসের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল অরন্য!

হঠাৎ কী মনে হতে থেমে আমার দিকে ফিরে বলল, “আর হ্যাঁ। চোখ কান খোলা রাখ। এখনও অনেক কিছু বাকি!”

আমি বললাম, “মানে? কেন?”

অরন্য বলল, “পেনড্রাইভে কী লেখা ছিল ভুলে গেলি? First Phase? ফার্স্ট ফেজ টা আমরা তো ভেস্তে দিলাম! পরের ফেজ এ কি আছে আমরা কিন্তু কিচ্ছু জানি না!”

সত্যিই তো! এটা তো একদম মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল! ফার্স্ট ফেজেই এরা প্রায় ১০ লাখ মানুষকে মেরে ফেলছিল! সেকেন্ড ফেজে আবার কী আসতে চলেছে কে জানে! সত্যিই আজকাল মানুষ মারা কত সহজ না! ১০ লাখ মানুষ জাস্ট একরাতের মধ্যে শেষ হয়ে যেত! শুধুমাত্র একটা রাজ্যে ক্ষমতায় আসার জন্য এরা যদি এতগুলো মানুষকে মারতে পারে তাহলে এরা যে আর কী কী করতে পারে সেটা ভাবলেই শিউরে উঠছি!

পৃথিবীটা যেন একটা বড় যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে গিয়েছে! একদল মানুষ ক্ষমতা দখলের লড়াই করছে। আর বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মুহুর্তে যুদ্ধ করতে হচ্ছে আমাদের মত সাধারন মানুষকে। অনেকগুলো প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরছিল!  সেকেন্ড ফেজে কি আসতে চলেছে? সামনে আরও বড় কোন যুদ্ধ আসন্ন কি? আর এই যুদ্ধে আমি আর অরন্য একা লড়তে পারব তো? কে জানে!

পুনশ্চ – কিছু কথা আপনাদের সবাইকে জানিয়ে দেওয়া দরকার! শত চেষ্টা সত্ত্বেও নাগরিক পত্রিকার পরের দিনের সংস্করনের এই ঘটনা বিস্তারিতভাবে  প্রকাশ করা যায় নি। মুখ্যমন্ত্রী নিজে আফসারদা কে ফোন করে বলেছিলেন ঘটনাটা চেপে দিতে! সামনে ইলেকশন। কোনো পার্টিই চায় না তাদের গায়ে কালি লাগুক! অভিজিৎ পুরকায়স্থ এবং রাজেশ সিনহাকে খুব গোপনে Conspiracy Against State অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কেসে ফাঁসিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড করে দেওয়া হয়! আর ইন্সপেক্টর পঙ্কজ মল্লিক কে আর পাওয়া যায় নি! শুধু বিপিএফ এর স্থানীয় নেতা পল্টুর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল সন্তোষপুরের দিকে একটা ড্রেনে! গলার নলি কেটে রাতের অন্ধকারে ওর দেহটা কেউ ফেলে গিয়েছিল!

অর্থাৎ কলকাতায় এতগুলো মানুষের মৃত্যু আটকানো গেলও ঠিকই। কিন্তু সেটার কথা মানুষের কাছে পৌঁছোনো গেল না! এই জন্যেই এই জায়গায় অপরাজিতকে খুব প্রয়োজন ছিল!

অরন্য সমস্ত কিছু দেখে শুধু একটা কথাই বলল, “সব মনে রাখা হবে সোমবুদ্ধ! সব কিছু মনে রাখা হবে!”

(ফিরবে)

তিলোত্তমা ঘূর্নাবর্তে – দ্বিতীয় পর্ব – ৫

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


3 thoughts on “তিলোত্তমা ঘূর্নাবর্তে – দ্বিতীয় পর্ব – ৫

  1. নেক্সট পার্ট এর অপেক্ষায় রইলাম কিন্তু
    ❤️❤️❤️❤️❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি