১০
দীপকবাবুর ফ্ল্যাট থেকে যখন বেরোলাম তখন ১১ টা বাজতে যায় প্রায়! একটার পর একটা ধাক্কায় আমরা তখন বিধ্বস্ত! তখনও ভাবিনি আমাদের জন্য আরও বড় চমক অপেক্ষা করে রয়েছে।
একটু আগে ছাদে যখন দীপকবাবু বললেন ইন্দ্রাক্ষীর খুনের পেছনে বেঙ্গল পিপলস ফ্রন্টের লোকেরাই রয়েছে তখন আমরা সবাই চমকে গিয়েছিলাম। এই উত্তরটা আমরা আশা করিনি একেবারেই!
অরন্য বলল, “মানে? ওরা কেন মারবে ইন্দ্রাক্ষীকে?”
দীপকবাবু বললেন, “সে আমি জানিনা। ওদের পার্টির একটা ছেলে এসে ছুরি দেখিয়ে বলল সেদিন রাত্রে ফ্ল্যাট এর মেইন গেট যেন খোলা রাখি আর নিজেরা যেন দরজা তাড়াতাড়ি আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ি!”
আমি বললাম, “পার্টির ছেলে মানে? কি নাম তার?”
দীপকবাবু একটু সময় নিচ্ছিলেন একটু। ইরা আবার গলায় রিভলবারটা জোর করে চেপে ধরে বলল, “কী নাম? নাম কি ছেলেটার?”
দীপকবাবু বললেন, “পল্টু! পল্টু ওর নাম। এই পাড়ারই ছেলে! সামনের চা দোকানে গেলেই ওর খোঁজ পাবেন! আমার গলায় লাগছে প্লিজ ছাড়ুন এবার!”
ইরা ওর গলা থেকে রিভলবার সরিয়ে নিল!
সত্যিই এরকম একজন সাথে থাকলে সাহস টা এমনিই বেড়ে যায়! তার ওপর সিবিআই এর অফিসার!
আমি বাইরে এসে দেখলাম ফ্ল্যাটের সামনেই সেই চা দোকানটা এখনও খোলা! অরন্য সিগারেট কিনল ওখান থেকে। আমি খাইনা ও জানে! তাই ইরা কে অফার করল সিগারেট। ইরা বলল ছেড়ে দিয়েছি আমি!
আমি এরপর একটা বেফাঁস কাজ করলাম। হঠাৎ করে চা দোকানে জিজ্ঞেস করে বসলাম, “আচ্ছা পল্টু কে কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারেন?”
চা দোকানের ভেতরে একটা বেঞ্চে শুয়ে ছিল কেউ একটা! সে বলে উঠল, “কেন? কী দরকার?”
আমি বললাম, “দরকারটা পল্টুর সাথেই! আপনি চেনেন কিনা বলুন!”
ছেলেটি এবার সোজা হয়ে বসল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বলল, “হ্যাঁ চিনি তো! আমিই পল্টু! কী দরকার বল!”
এই ছেলেটিই তাহলে পল্টু! এই তাহলে ইন্দ্রাক্ষী কে…
আমি কিছু বলার আগেই অরন্য বলল, “এই সামনের ফ্ল্যাটের ফার্স্ট ফ্লোরে একজন মহিলা থাকতেন। তাকে চিনতেন?”
পল্টু বলল, “ওহ যেই মালটা মরে গেল ক’দিন আগে! হ্যাঁ এই পাড়ায় দেখেছি কয়েকবার! হেব্বি দেখতে ছিল কিন্তু!”
আমি বুঝলাম আমার মাথাটা গরম হতে শুরু করেছে!
ইরা বলল, “তা আপনি শুনলাম ওই মহিলা যেদিন মারা যায় সেদিন ওর ফ্ল্যাট মালিক কে মেন গেট খোলা রাখতে বলেছিলেন!”
পল্টু একবার বাঁকা চোখে দেখল ইরা কে। তারপর বলল, “এটা কি ওই দীপুদা বলেছে নাকি?”
আমি এবার একটু জোরেই বললাম, “কথাটা কি সত্যি?”
পল্টু বলল, “কে জানে! হতেই পারে! অতশত মনে থাকে না! কাকে কী বলি!”
আমি আর থাকতে পারলাম না। এগিয়ে গিয়ে পল্টুর শার্টের কলার ধরে ঠেসে দিলাম দেওয়ালে! বললাম, “যেটা জিজ্ঞেস করা হয়েছে সেটা বল!”
অরন্য আমার কাঁধে হাত রাখল। বলল, “ছেড়ে দে সোম!”
আমি চেঁচিয়ে বললাম, “ছেড়ে দে মানে? কি ছেড়ে দে? এই শুয়োরের বাচ্চাগুলো মানুষ খুন করবে আর স্বাধীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে! কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না তাই না?”
পল্টু তখনও তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছিল। ওর মুখ থেকে তীব্র মদের গন্ধ আসছে!
হঠাৎ আমাদের পেছনে একটা গাড়ি এসে থামল। পেছন ফিরে দেখলাম গাড়ি থেকে নামলেন ইন্সপেক্টর পঙ্কজ মল্লিক! সাথে একজন কনস্টেবল!
আমাকে পল্টুর কলার ধরে থাকতে দেখে বললেন, “আরে আরে! করছেন কী? করছেন কী? বাচ্চাটা মরে যাবে তো!”
অরন্য আর ইরা আমার হাত ছাড়িয়ে দিল। ইন্সপেক্টর মল্লিক বললেন, “আপনারা এখানে হঠাৎ? কী মনে করে?”
অরন্য বলল, “আপনি এখানে কী মনে করে?”
ইন্সপেক্টর মল্লিক হেসে বললেন, “আরে আমার এরিয়া তো এটা। একটু টহল দিচ্ছিলাম আর কি! সব ভালো তো?”
তারপর কনস্টেবলকে পল্টুর দিকে ইশারা করে বললেন, “এই একে জিপে তোল!”
ইরা বলল, “কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ওকে?”
ইন্সপেক্টর মল্লিক এবার ইরার দিকে ফিরে বললেন, “আপনি কে?”
ইরা নিজের কার্ড বের করে ইন্সপেক্টর মল্লিকের দিকে এগিয়ে দিতেই উনি বললেন, “ওহ! সরি ম্যাম বুঝতে পারিনি!”
ইরা আবার বলল, “ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
ইন্সপেক্টর মল্লিক বললেন, “আরেহ এখানে একটা বাড়িতে চুরি হয়েছিল ক’দিন আগে! সবাই বলছে নাকি পল্টু কে ঢুকতে দেখেছে। তাই ওকে নিয়ে যাচ্ছি থানায়! একটু ওষুধ দিতে হবে! যাই ম্যাম?”
ইরা বলল, “ঠিক আছে যান!”
অরন্য হঠাৎ বলে উঠল, “আপনার নাম্বারটা দেবেন কাইন্ডলি?”
ইন্সপেক্টর যেন একটু চমকে উঠলেন! বললেন, “আমার নাম্বার? কেন?”
অরন্য বলল, “ঐ ইন্দ্রাক্ষীর কেসটায় কিছু ডেভেলপমেন্ট হল কিনা ফোন করে জানবো আমরা!”
ইন্সপেক্টর একবার আমার দিকে একবার ইরার দিকে তাকালেন।
ইরা বলল, “নাম্বারটা দিন ওকে!”
সিবিআই এর একজন অফিসারের রিকোয়েস্ট ফেলবেন এত বড় দুঁদে পুলিশ ইন্সপেক্টর উনি নন সেটা বোঝা গেল। চুপচাপ ওকে ফোন নাম্বারটা দিয়ে দিলেন উনি। তারপর “আসছি ম্যাম” বলে চলে গেলেন!
আমি বললাম, “ওর নাম্বার নিলি কেন?”
অরন্য বলল, “কাজে লাগবে পরে!”
ইরা বলল, “আমার এক কাকু রয়েছেন বিপিএফ এ! আমি দেখছি যদি কিছু খোঁজ পাওয়া যায়!”
অরন্য ওর কথা যেন শুনতেও পেল না!
১১
পরের দিন সকালে উঠে দেখি অরন্য নেই! আমাকে না জানিয়ে কোথায় গেল সেটাই ভাবছিলাম। হঠাৎ মিষ্টি গলায় “Good Morning” শুনে খেয়াল হল কাল ইরা আমাদের ফ্ল্যাটেই ছিল! ডাইনিং এ সোফাতে শুয়েছিল।
বললাম, “আর একদিন পর কী হতে চলেছে সেটা ভাবলেই বুকের ভেতরে যা হচ্ছে! আর আপনি বলছেন Good Morning!”
ইরা হাসল। বলল, “দাঁড়ান না। একদিন তো আছে আমাদের হাতে! তার মধ্যে যদি কিছু হয়!”
বললাম, “জানিনা। সব পথই তো বন্ধ হয়ে গেল আস্তে আস্তে। আমি তো আর কোনো রাস্তা দেখছি না!”
ইরা বলল, “অন্ধকারের মধ্যে থেকেই অনেক সময় হঠাৎ একটা আলোর রেখা এসে নতুন একটা রাস্তার সন্ধান দেয় সোম!”
কি জানি! আমাদের যে সেই আলোর রেখা কবে আসবে! একটু থেমে আমি বললাম, “অরন্য কোথায় জানেন?”
ইরা বলল, “না। এই ঘন্টাখানেক আগে বেরোলো। জিজ্ঞেস করলাম কোথায় যাচ্ছে। বলল কাজ আছে!”
আমি বললাম, “একবার ফোন করি দাঁড়ান!”
কথাটা বলে ফোন করলাম অরন্যকে। একটুক্ষন রিং হওয়ার পর ফোন ধরে অরন্য বলল, “হ্যাঁ বল!”
জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কি অফিসে?”
অরন্য বলল, “নাহ। একটু কাজে এসেছি। তুই অফিস বেরিয়ে যা!”
একবার ইরার দিকে আড়চোখে তাকালাম। ও ফোনে কি একটা দেখছে। তারপর চাপা গলায় বললাম, “কিন্তু ইরার কী হবে?”
অরন্য বলল, “ওর যদি অন্য কোনো কাজ না থাকে ফ্ল্যাটেই থাকুক না হয়। আর নাহলে অফিস নিয়ে চলে আয়! আমি আসব একটু পরেই!”
আমি বললাম, “অফিসে? আফসারদা কে কী বলব?”
অরন্য বলল, “সে কী বলবি তুই দেখ! আমি কি জানি! স্কুলে পড়ি নাকি আমরা!”
কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল অরন্য! উফফ! এই ছেলেটা মাঝে মাঝে বড় ঝামেলায় ফেলে!
ইরা বলল, “কী বলল অরন্য?”
আমি বললাম, “অফিস চলে যেতে বলল। ও চলে আসবে!”
– ওহ আচ্ছা।
– আপনার আজ কোথাও যাওয়ার আছে নাকি?
– নাহ! আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমি আপনার সাথে অফিস যেতে পারি!
আমি বললাম, “অফিস! হ্যাঁ… মানে… ঠিক আছে… তাই চলুন!”
মনে মনে তখন আমি প্রমাদ গুনছি। আফসারদা কে কী বলব? বাকিদেরকেই বা কী বলব? কে হয় ও আমার!
ফ্ল্যাট চাবি দিয়ে বেরোনোর সময় আফসারদা কে ফোন করলাম।
বললাম, “তুমি কি অফিসে?”
আফসারদা বলল, “নাহ। আমি আজ যাইনি। শরীর টা ভালো নেই!”
আমি মনে মনে খুশিই হলাম। যাক! একটা দিক থেকে নিশ্চিন্ত!
তাও জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে?”
আফসারদা বলল, “জ্বর এসেছে কাল রাত থেকে। তুমি একটু সামলে দিও ওদিক টা!”
বললাম, “ঠিক আছে। চাপ নেই! তুমি রেস্ট নাও!”
ক্যাব বুক করেই নেমেছিলাম। গাড়িতে উঠলাম দু’জনে। ইরা পেছনে বসছিল। আমি সামনে বসতে যাচ্ছিলাম।
হঠাৎ ইরা বলে উঠল, “একি? সামনে বসছেন কেন? আমি কি এতই healthy যে পেছনে আর একজনের জায়গা হবে না?”
আমি লজ্জা পেয়ে বললাম, “না না। আরে সেরকম ব্যাপার নেই! এমনি… মানে…
– পেছনে আসুন!
আমি বাধ্য ছেলের মত পেছনের সীটেই বসলাম। ইরার পাশে!
কিছুক্ষন দু’জনেই চুপ। একটু পর ইরা বলল, “আপনি ইন্দ্রাক্ষীকে খুব পছন্দ করতেন… তাই না?”
আমি হাসলাম। বললাম, “এখনও বোঝা যায় নাকি?”
ইরা বলল, “সিবিআই তে যারা কাজ করে তাদের চোখে ধরা পড়বে বলেই আমার ধারনা!”
আমি আর কিছু বললাম না!
ইরা বলল, “ও জানতো?”
আমি বললাম, “বলার সুযোগ পেলাম কই!”
– সুযোগ পেলে বলতেন?
– কি জানি! বলতাম হয়ত!
ইরা আর কিছু বলল না। সত্যিই অদ্ভুত মেয়ে এই ইরা! যখন প্রয়োজন রিভলবার বের করে মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে। আবার যখন প্রয়োজন তখন এমন ভাবে কথা বলছে মনে হচ্ছে কত কাছের একজন বন্ধু!
একটু পর নীরবতা ভাঙলাম আমি নিজেই। বললাম, “আপনার বস কে জানালেন? যা যা হল!”
ইরা বলল, “সবটাই জানিয়েছি। ওদিক থেকে যা যা করা সম্ভব উনি করছেন! কিছু খোঁজ পেলেই ফোন করবে বললেন!”
আমি বললাম, “আপনি তো আন্ডারকভারে রয়েছেন এখন?”
ইরা একবার ক্যাব ড্রাইভারের দিকে দেখল। তারপর আমার দিকে ফিরে ইশারায় বলল, “আস্তে বলুন। হ্যাঁ। তাতে কী হয়েছে?”
– না মানে এরকম একটা কেসে আপনাকে হঠাৎ আন্ডারকভারে পাঠানো হল কেন? ডিরেক্ট এসে রাজেশ সিনহার কলার ধরে আপনি সিবিআই হেড কোয়াটার্সে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন না?
– এটা এতটাই সেনসিটিভ ইস্যু যে দাঙ্গা লেগে যেতে পারে। তার ওপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠেছে ওই সব প্রমান বেরোনোর পর। এখন আন্ডারকভার ছাড়া কোনো গতি নেই!
– আমি জাস্ট মানতে পারছি না যে এই লোকগুলো কলকাতার মত জায়গায় এত মানুষ মারার ষড়যন্ত্র করেছে অথচ আমরা কিছু করতে পারছি না!
ইরা আবার ড্রাইভারের দিকে দেখল। তারপর বলল, “সোম… আস্তে কথা বলো!”
ধুর আর আস্তে! আমার মাঝে মাঝে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করছে। আর ২ দিন! আর ২ দিন পর যে কী হবে কেউ জানিনা আমরা! সব শেষ হয়ে যাবে। এক লহমায় ১০ লাখ মানুষ শেষ!
আমি বললাম, “বিশ্বাস করো! আমার পক্ষে যদি সম্ভব হত আমি নিজে হাতে এই ষড়যন্ত্রের মাস্টার মাইন্ডগুলোকে শেষ করতাম। কিন্তু আমার পক্ষে তো সেটা সম্ভব না।
ইরা বলল, “মাস্টার মাইন্ড কারা সেটা তো বুঝতে হবে আগে! একবার দেখছি আরএসপি আর একবার দেখছি বিপিএফ! কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না!”
– রাজনীতি জিনিসটাই নোংরা! এরা কেউ ভালো না। যে ক্ষমতায় আসে সেই স্বৈরাচারী হয়ে যায়!
ইরা কিছু বলল না। গাড়ি থামল আমাদের অফিসের সামনেই! আমরা দু’জনে নেমে গেলাম অফিসের ভেতরে।
১২
অফিসে অনেকক্ষন থেকেই সবাই কেমন অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছিল। স্বাভাবিক। একটা অচেনা মেয়ে অফিসে এসে আমার কিউবিকলের পাশে বসে আছে দেখলে লোকজন অবাক হয়ে তাকাবে তো বটেই! আমি শুধু ঘড়ি দেখছিলাম আর ভাবছিলাম অরন্য কখন আসবে আমায় বাঁচাতে।
ইরা আমার পাশে বসে ছিল সারাদিন। তবে আমি কাজ করছিলাম যখন, তখন কথা বলেনি বেশী। তখন বোধহয় ৭ টা বাজে, ইরা বলল, “আমি আসছি একটু!”
তারপর আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গেল ও মেইন গেটের দিকে। কে জানে কোথায় গেল! তারপরেই সোহিনী আমাকে একটা রিপোর্ট দিতে এসে টিটকিরি দিয়ে গেল! আমি বললাম বন্ধু! কিন্তু সে কথা আর কে শোনে! অরন্য এখনও এল না। ধুর! সারাদিন ধরে কী করছে ছেলেটা কে জানে! ফোনটা টেবিলেই ছিল। হাতে নিয়ে ফোন করতে যাবো হঠাৎ একটা চেনা গলা বলে উঠল, “কীরে তোর গার্লফ্রেন্ড কোথায়?”
মুখ তুলে দেখলাম অরন্য! বললাম, “আমার গার্লফ্রেন্ড? সিরিয়াসলি?”
অরন্য বলল, “সেরকমই মনে হচ্ছে তো! প্রেমে ট্রেমে পড়লি নাকি?”
আমি গম্ভীর গলায় বললাম, “তুই তো তিনদিন বেশ ছিলি! আবার পুরোনো মোডে ফিরলি কেন?”
অরন্য বলল, “মুড ভালো থাকলে আমি এরকমই থাকি!”
– মুড ভালো থাকার আর কী হল? আর ২ দিন বাদেই তো!
– আরে ধুর! কিচ্ছু হবেনা আর দু’দিন বাদে।
– মানে টা কী?
– দেখতে পাবি তার আগে ইরাকে ফোন কর। আমাদের বেরোতে হবে!
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কোথায় বেরোবো?
অরন্য বলল, “দেখতে পাবি! চল অনেক কথা আছে!”
আমি বললাম, “তার আগে বল তো তুই গিয়েছিলি টা কোথায় সারাদিন?”
অরন্য বলল, “অপরাজিতর একটা Warehouse রয়েছে। ওখান থেকে কিছু জিনিস নিতে গিয়েছিলাম।“
– কি জিনিস?
– ধীরে বৎস ধীরে! সব জানতে পারবে!
ওর কথা শেষ হতেই দেখলাম ইরা ফিরে এসেছে। মুখটা কেমন যেন গম্ভীর লাগছে!
বললাম, “কোথায় গিয়েছিলে?”
অরন্য ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালো! আমার মুখে আপনি থেকে তুমি শুনে একটু অবাক হয়েছে বোঝা গেল!
ইরা বলল, “অফিসের ফোন ছিল। তাই বাইরে গিয়েছিলাম কথা বলতে!”
আমি বললাম, “সব ঠিক আছে তো?”
ইরা যেন একটু অন্যমনস্ক! বলল, “হ্যাঁ। ঠিক আছে! আমায় ফিরতে হবে কাল! বস ডাকছে!”
অরন্য বলল, “আচ্ছা এসব কথা পরে হবে বরং। এখন চলুন! খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি!”
আমি আর ইরা দু’জনে পরস্পরের দিকে তাকালাম। তারপর গেলাম অরন্যর পেছন পেছন। ও দেখলাম ক্যাব বুক করেই রেখেছিল। ক্যাব আসতেই সোজা গিয়ে উঠে বসল সামনের সীটে। তারপর আমাকে ফোনে টেক্সট করে বলল, ‘You are welcome’
উফফ! আজ কী হয়েছে এর! শুধু ফাজলামি করছে! কোথায় ছিল সারাদিন কে জানে!
ইরা বলল, “বলুন! কী বলবেন?”
অরন্য বলল, “ফাইনালি কেস সল্ভড! আর কিছুক্ষনের মধ্যেই যবনিকা পতন ঘটবে!”
আমি বললাম, “বাবাহ! কি ভাবছিস নিজেকে? শারদ্বত হাজরা?”
অরন্য ভুরু কুঁচকে বলল, “সে আবার কে?”
আমি বললাম, “প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। কয়েক মাস আগে নাগরিকে ওর একটা কেস এর ব্যাপারে বেরিয়েছিল। ও এভাবেই কথা বলে দেখেছিলাম!”
অরন্য বলল, “ওহ! আচ্ছা। না ভাই! আমি গোয়েন্দা না! তবে সত্যিই আর কিছুক্ষনের মধ্যে সবটা ক্লিয়ার করে দিতে পারবো বলেই আমার ধারনা!”
আমি বললাম, “তুই তার আগে বল এই খুন এই বিস্ফোরন এর পেছনে আছে কারা? আরএসপি নাকি বিপিএফ?”
অরন্য বলল, “এইখানেই তো মজা! দু’টো রাজনৈতিক দলই এর সাথে যুক্ত!”
আমি বললাম, “মানে? দু’জনেই যুক্ত মানে? এতগুলো মানুষকে মেরে দু’টো দলেরই কী স্বার্থ থাকতে পারে? আর তুই এসব কথা বলছিস কীভাবে?”
অরন্য বলল, “স্বার্থ আছে! সেটার জন্যেই তো আজ সারাদিন লাগল! অনেক কিছু ভাবলাম বুঝলি! সমস্ত কিছু ভেবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, রাজনীতির থেকে খারাপ পেশা আর কিছু নেই! আর তার সাথে ধর্ম যদি ঢোকে তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই! মারাত্মক ভয়ংকর কিছু একটা তৈরী হয় দুটো মিলে!”
আমি বিড়বিড় করে বললাম, “এটাও শারদ্বত হাজরা বলে!”
অরন্য বলল, “আরে এ কে রে ভাই! খালি শারদ্বত শারদ্বত করে যাচ্ছে!”
আমি বললাম, “ সরি। ও কিছু না। তুই বল!”
অরন্য বলল, “কাল রাত্রে যেটা হল তারপর আর একটা মাত্র রাস্তা খোলা ছিল! ভাবিনি এতে কাজ হবে! তাও চান্স তো নিতেই হত! সেই কারনেই ঐ ইন্সপেক্টর মল্লিকের নাম্বারটা নিয়েছিলাম!”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “ওটা নিয়ে কী লাভ হল?”
ইরা এতক্ষন চুপ করে সব শুনছিল! এখন বলে উঠল, “ঐ ইন্সপেক্টর শেষ ক’দিন কোন নাম্বারে বেশী কথা বলেছে সেটা জানার প্রয়োজন ছিল। তাই না?”
অরন্য বলল, “হ্যাঁ। খুব স্পেসিফিক্যালি বলতে গেলে যেদিন সোম থানায় গিয়েছিল পেনড্রাইভ টা দিতে। সেদিন সন্ধ্যেবেলা কাকে ফোন করেছিল সেই নাম্বারটা দরকার ছিল!। তাহলেই রাঘব বোয়ালের খোঁজ পাওয়া যাবে!”
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, “তারপর? পেলি?”
অরন্য হেসে বলল, “পুলিশ অফিসারের নাম্বার নিয়ে এসব কাজ করা খুব রিস্কি! তাও এক চেনা বন্ধু ছিল বলে হল। নাহলে হত না! নাম্বারটা হাতে পেয়েই ট্রু-কলারে চেক করলাম! নামটা দেখে জাস্ট চমকে গেলাম আমি!”
আমি বললাম, “কে কে?”
অরন্য নিজের ফোন টা এগিয়ে দিল আমার দিকে! আমি ফোনের স্ক্রীনে নামটা দেখে থ হয়ে গেলাম! সিরিয়াসলি? এতো সর্ষের মধ্যে ভূত না। সর্ষে নিজেই ভূত! আমি ফোনটা এগিয়ে দিলাম ইরার দিকে! ইরাও দেখলাম খুব অবাক হয়ে গেল!
ও বলল, “সিরিয়াসলি?”
অরন্য বলল, “তাই তো দেখলাম। আমরা এখন ওঁর কাছেই যাচ্ছি! দেখা যাক উনি কী বলেন!”
আমি বললাম, “কিন্তু কেন?”
অরন্য বলল, “রাজনীতি ভায়া! এই জায়গায় সব কেনর উত্তর তুমি পাবে না!”
১৩
“মিস্টার অভিজিৎ পুরকায়স্থ, আপনি কি পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে চান?”
প্রশ্নটা করেছে অরন্য! সবাই এতক্ষনে বুঝতেই পেরে গেছে আশা করি। এই সমস্ত কিছুর পেছনে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কে কাজ করেছেন! আমরা এখন ঠিক তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। অভিজিৎ পুরকায়স্থ। বেঙ্গল পিপলস ফ্রন্টের সর্বভারতীয় সভাপতি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় রায় চৌধুরীর ডান হাত! ট্রু-কলারে নামটা এঁরই ছিল! ইনি অবশ্য প্রথমে আমাদের সাথে দেখা করতে চান নি! ওঁর দলের একটি ছেলে বলল উনি নাকি ব্যস্ত! তখন অরন্য একটা কাগজে “কলকাতায় বিস্ফোরন” লিখে ছেলেটির হাতে দিয়ে বলল, “তোমার অভিজিৎ বাবু কে দেখাও। তাহলেই উনি দেখা করবেন!”
তারপরেই আমাদের তলব পড়ে ভেতরে। অরন্যটা সত্যি! পার্টি অফিসে ঢুকেই একটা ফুলদানি দেখে বলে “আরিব্বাস এটা সেক্সি দেখতে তো!” আমি ধমক দিতে একটু সিরিয়াস হল ও। মাঝে মাঝে ওর মাথায় যে কি চাপে কে জানে!
“মানে?” অভিজিৎ পুরকায়স্থ বললেন অরন্যর প্রশ্নের উত্তরে!
অরন্য বলল, “আরে এটা তো খুব সহজ প্রশ্ন! আপনি কি পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে চান?”
অভিজিৎ বাবু বললেন, “আপনারা কি রিপোর্টার?”
অরন্য বলল, “আচ্ছা আমিই বলে দিচ্ছি বরং। আপনি ছেড়ে দিন! হ্যাঁ। আপনি পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে চান! হয়তো সামনের ইলেকশনে জিতলে দিগ্বিজয় রায় চৌধুরীই মুখ্যমন্ত্রী হতেন! কিন্তু সে তো আর মাত্র ৫ বছরের জন্যে। সবাই জানে পরের টার্ম এ দিগ্বিজয় রায় চৌধুরী আপনাকেই পদটা ছেড়ে দিতেন। কিন্তু আপনার আর তর সইল না। সেই কারনে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী পার্টির হাতে মোক্ষম একটা প্ল্যান তুলে দিলেন আপনি! কিন্তু শর্ত ছিল ভোটে জেতার পর আপনাকে মুখ্যমন্ত্রী হতে হবে! তাই না?”
অভিজিৎ বাবু বললেন, “আপনারা যাবেন নাকি আমি পুলিশে খবর দেবো? আর আমার একটা ফোনে কী হতে পারে আইডিয়া আছে তো আপনাদের?”
ইরা এতক্ষন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল অভিজিৎ পুরকায়স্থর দিকে। এরপর পকেট থেকে রিভলবার বের করে সেটা তাক করল ওর দিকে। অভিজিৎবাবু ওর দিকে দেখলেন একবার তারপর একটা বাঁকা হাসি হাসলেন!
তারপর বললেন, “যাক! সব প্রিপারেশন নিয়ে এসেছো তাহলে?”
গলার স্বরটা পালটে গেল যেন হঠাৎ ওঁর! ইরা রিভলবার টা নিয়ে সরে এল একটা সাইডে।
আমি বললাম, “আপনি কী ভেবেছেন? এতগুলো মানুষ কে এত সহজে মেরে ফেলবেন? আর কেউ কিছু জানতেও পারবে না?”
অভিজিৎ পুরকায়স্থ হেসে বললেন, “এমা! জানতে পারবে না কেন? পরের দিন পেপারে পড়বে তো! তারপর ফেসবুকে কয়েকটা পোস্ট শেয়ার হবে! অনেক লেখালেখি হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাভের লাভ টা যাদের হওয়ার তাদেরই হবে!”
আমি খালি ভাবছি মানুষটা এখনও হেসে হেসে এসব বলছে কীভাবে! লজ্জা ভয় কোনোটাই কি করছে না ওর!
আমি ইরার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম, “আমি জানি আপনার অনেক লম্বা হাত! আপনার সাথে আলাপ করিয়ে দিই! ইরাবতী মজুমদার, সিবিআই! You are finished Mr. Purakayastha! সব শেষ!”
হঠাৎ অভিজিৎ বাবু বললেন, “আপনি সোমবুদ্ধ… তাই না? Well সোমবুদ্ধ, একটা ব্যাপার আপনি ঠিক বলেছেন! আমাদের হাতটা একটু বেশীই লম্বা! কতটা লম্বা সেটা আপনাদের কল্পনারও বাইরে! তাই না ইরা?”
অভিজিৎ বাবুর মুখে ইরা ডাকটা শুনে একটু অবাক হয়েছিলাম। চমকে ইরার দিকে তাকাতেই দেখলাম, ওর হাতের রিভলবার টা ঘুরে গেছে। এবার আমার আর অরন্যর দিকে!
তার মানে? ইরা? ইরাবতী মজুমদার! সিবিআই! সব এদের হাতে? আমি আর কিছু ভাবার মত অবস্থায় নেই। এসব কী হচ্ছে। এটা তো হওয়ার কথা ছিল না! এদের এই মাকড়সার জালটা আর কতদূর বিস্তৃত! কেউ তো থাকবে যে এটার সাথে যুক্ত নয়!
আমি অস্ফূট স্বরে বললাম, “ইরা… তুমি…
ইরা বলল, “সরি সোমবুদ্ধ! I’m really sorry!”
আমি অরন্যর দিকে তাকালাম। অরন্য ইরাকে বলল, “এটা কী আমার রিভলবারটাই?”
ইরা বলল, “Of Course! নিজের সার্ভিস রিভলবার দিয়ে তো আর এই কাজগুলো করা সম্ভব নয়। তাই সকালে যখন বেরোলেন তারপরেই আপনার ঘর থেকে রিভলবার টা বের করে রেখেছিলাম।”
অরন্য বলল, “Well Done!”
এসব কী হচ্ছে! এতদূর এসে সব শেষ হয়ে যাবে নাকি? আমরা কি হেরে যাবো এভাবে?
ইরা একবার অভিজিৎবাবুর দিকে তাকালো! তারপর বলল, “শেষ করে দিই স্যার?”
(চলবে?) 😉
