কথাটা শুনেই বুঝতে পারলাম ইনি আমাদের কাল রাত্রের আগন্তুক। কিন্তু অরন্যর ঠিকানা জানলো কীভাবে? ফলো করছে নাকি আমাদের?

অরন্য বলল, “কী চাই?”

মেয়েটি ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে! আমি দরজাটা বন্ধ করলাম। অরন্য তখনও রিভলবারটা তাক করে আছে ওর দিকে!

মেয়েটি একবার ওর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “ওহ প্লিজ! ওটা নামান! একটুও ভয় পাচ্ছি না আমি!”

আমি বললাম, “কিন্তু আপনি কে? কী চাই আপনার?”

মেয়েটি পকেটে হাত দিতেই অরন্য চেঁচিয়ে বলল, “Stop! হাত টা বের করুন! এই ঘরে কিন্তু ক্যামেরা আছে। সব রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে একটা সিকিওর্ড সার্ভারে”  

মেয়েটি বলল, “Calm Down! আই কার্ড বের করছি আমি!”

কথাটা বলেই একটা আই কার্ড বের করে অরন্যর দিকে এগিয়ে দিল মেয়েটি! অরন্য কার্ডটা দেখে আমার দিকে এগিয়ে দিল।

কার্ড এ লেখা ইরাবতী মজুমদার! সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন!

আমি বললাম, “আপনি… আপনি…

ইরাবতী কার্ড টা ফেরত নিতে নিতে বলল, “হ্যাঁ। Call Me ইরা! আমি সিবিআই এর আন্ডারকভার এজেন্ট!”

অরন্য এতক্ষনে রিভলবার টা নামাল। বলল, “কিন্তু এখানে কী চাই আপনার?”

ইরা বলল, “আমার মনে হয় আমার আর আপনার সবারই একটা চাওয়া এখন। কলকাতায় যাতে বিস্ফোরন টা না হয়! কাল রাত্রে সৃঞ্জয় বাবুর বাড়িতে আপনাদের দেখে মনে হল আপনারা বেশ অনেকটাই জানেন! সেই কারনেই মনে হল হয়ত We can help each other!”

আমি বললাম, “কিন্তু আমাদের ঠিকানা পেলেন কীভাবে?”

ইরা বলল, “আপনার নাম সোমবুদ্ধ রায় তো!”

–      হ্যাঁ

–      প্রথমে আপনার ঠিকানায় গিয়েছিলাম। উফফ! সেটার যা অবস্থা! তারপরেই অরন্য দেব এর ঠিকানায় এলাম।

আমি বললাম, “এক সেকেন্ড? সেটার যা অবস্থা মানে?”

ইরা বলল, “আপনি জানেন না? আপনার গোটা ফ্ল্যাট তো লণ্ডভন্ড করা। সমস্ত কিছু ভেঙে ফেলা হয়েছে! আপনার টিভি, ল্যাপটপ মাটিতে পড়ে আছে!”

আমি এবার বুঝতে পারলাম ইন্সপেক্টর মল্লিক কেন বার বার বাড়ির সব ঠিক আছে তো জিজ্ঞেস করছিলেন! উনি জানতেন সব টা! বাস্টার্ডস!

অরন্য বলল, “আপনি ওর ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকেছিলেন?”

ইরা বলল, “হ্যাঁ। বেশ কয়েকবার বেল বাজিয়ে যখন পেলাম না তখন ঢুকলাম!”

–      কীভাবে?

–      যেভাবে আপনারা কাল সৃঞ্জয়বাবুর বাড়িতে ঢুকেছিলেন। শুনুন এত কথা বলার সময় নেই। হাতে আর ৪ দিন আছে। কতদূর কি জানেন আমাকে বলুন!

আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম। অরন্য আমাকে হাতের ইশারায় থামতে বলল। তারপর বলল, “আপনাকে বিশ্বাস করি কী করে বলুন তো? আপনি যে আমাদের কাছ থেকে তথ্যগুলো নিয়ে অন্যদিকে পাচার করবেন না তার কী মানে আছে! আমরা অলরেডি দেখেছি পুলিশ ওদের হাতে! সিবিআই কেও হয়ত ওরা নিজেদের হাতেই রেখেছে!”

ইরা একবার দেখল আমাদের দু’জনের দিকে। তারপর বলল, “শুনুন কলকাতায় বম্বব্লাস্ট আমিও আটকাতে চাই! তার জন্যে আপনাদের সাহায্য লাগবে আমার। আর শুধু আপনাদের কাছ থেকে আমি সাহায্য নেবো না। আপনাদের এই কেসটার জন্য যা সাহায্য লাগে আমি করব! কাজেই… ভেবে দেখুন আমাকে ভরসা করতে পারবেন কিনা!”

অরন্য আমার দিকে তাকাল একবার! তারপর বলল, “বসুন!”

ইরা বসল সোফাতে! আমরা দু’জন দু’টো চেয়ারে বসলাম।

অরন্য বলল, “প্রথমে আপনি বলবেন। কতদূর কী জানেন আপনি! তারপর আমরা!”

ইরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল! তারপর বলল, “বেশ তবে তাই হোক!”

“আরএসপি মানে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী পার্টি কীভাবে এই দেশে ক্ষমতায় এসেছে তা সবাই জানে! ওদের দলটাই তৈরী হয়েছিল এইভাবে! ২০০২ এর দাঙ্গা আজও কেউ ভোলেনি। কীভাবে একজন অন্তস্বত্ত্বা মহিলার সদ্যোজাত বাচ্চা কে খুন করেছিল ওরা শুধুমাত্র মুসলিম বলে! আজ অবধি কেউ সাজা পেয়েছে? একটা রাঘব বোয়ালও ধরা পড়েনি! কিছুদিন আগে আমার বস অফিসে শুনেছিল পশ্চিমবঙ্গের ভোট সামনে। এটার জন্য আরএসপি নাকি প্রচন্ড খাটছে! এমএলএ, এমপি কেনার চেষ্টাও করেছে কিছু কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয় নি! বেঙ্গল পিপলস ফ্রন্ট পার্টির লিডার মানে দিগ্বিজয় রায় চৌধুরী খুব কড়া হাতে রাশ ধরে রাখেন! আর ওঁর ডান হাত মানে অভিজিৎ পুরকায়স্থ সমস্ত দিকে খেয়াল রাখেন। সবাই জানে দিগ্বিজয় চৌধুরীর পর মুখ্যমন্ত্রী হবেন এই অভিজিৎ পুরকায়স্থই। যদি ওরা ক্ষমতায় থাকে তবেই! এই অবস্থায় আমরা খবর পেলাম কলকাতা বা তার আশেপাশে কিছু একটা হতে পারে! ইলেকশনের আগে! কিন্তু ঠিক কি সেটা কেউ জানিনা আমরা! তবে কান্ডটা যে ক্ষমতায় আসার জন্য আরএসপি ঘটাবে সেটা অনুমান করেছিলাম!”

“কীভাবে জানলেন আপনারা?” অরন্য এবার জিজ্ঞেস করল

“কী জানলাম?” ইরার পালটা প্রশ্ন

–      এই যে খবর পেলেন কলকাতার আশেপাশে কিছু একটা হবে! এটা জানলেন কীভাবে?

ইরা বলল, “আগের সপ্তাহে দিল্লীতে একজন আরএসপি নেতার ছেলের বিয়েতে যেতে হয়েছিল আমাকে আর আমার বস কে! সেখানে দলেরই একজন প্রবীন নেতা মাতাল হয়ে অসভ্যতামো করছিল! উনি আমায় ব্যক্তিগত ভাবে চিনতেন মানে নাম জানতেন! কিন্তু বিয়ের পার্টিতে ঐ অভব্য ব্যবহার আমি নিতে না পেরে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিলাম ওকে। উনি তখন রেগে গিয়ে বলেন, ‘তুম বেঙ্গলি লড়কিওমে  ইতনা ঘমন্ড কিস বাত কি হ্যা? কুছ দিন বাদ না রহেগা তুমহারা কলকাত্তা, না রহেগা তুমহারা ঘমন্ড!’ মদের ঘোরে ছিল বলে কেউ অত গুরুত্ব দেয় নি। কিন্তু বস আর আমি দু’জনেই বুঝতে পারি কিছু একটা ঘটাবে এরা! বেঙ্গল ইলেকশনের আগেই! পরের দিনই বস আমাকে আন্ডারকভারে কলকাতা এসে ব্যাপারটা ইনভেস্টিগেট করতে বলেন! তারপরেই আমি কলকাতা আসি!”

আমি বললাম, “কিন্তু সৃঞ্জয়দার কথা কীভাবে জানলেন আপনি?”

ইরা বলল, “ইন্দ্রাক্ষী বলেছিল!”

নামটা শুনে চমকে উঠলাম আমি! অরন্যর দিকে তাকালাম। ও একবার আমার দিকে দেখল। তারপর বলল, “আপনি ইন্দ্রাক্ষীকে চিনতেন?”

ইরা বলল, “আমরা একসাথে Xavier’s এ গ্র্যাজুয়েশন করেছি। খুব ভালো বন্ধুত্ব না থাকলেও সম্পর্কটা মোটামুটি মেইন্টেইন করতাম। সেটা অবশ্য কাজের স্বার্থও ছিল দু’জনেরই। ও আমার কাছ থেকে অনেক খবর পেত। আমিও ওর থেকে খবর পেতাম অনেক!”

“কিন্তু ও সৃঞ্জয়দার ইনভলভমেন্ট টা জানল কীভাবে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

 ইরা বলল, “কী একটা পেনড্রাইভে পেয়েছে বলল! ২রা এপ্রিলের বম্ব ব্লাস্টের কথা ওর মুখেই শুনি প্রথম! তারপরেই দুইয়ে দুইয়ে চার! মিলে গেল!”

–      কবে ফোন করেছিল ও আপনাকে?

–      যেদিন ও পেয়েছিল পেনড্রাইভ সেদিনই রাত্রের দিকে। ওই সাড়ে ১০ টা নাগাদ! বলল পরের দিন দেখা করে সব বলবে। কিন্তু তারপরেই তো…

মানে আমাকে ফোন করে না পেয়ে ওকে ফোন করেছিল! কেন ধরলাম না সেদিন ফোনটা। কেন তখন আমি স্নান করতে ঢুকেছিলাম। এটা মনে পড়লেই মাঝে মাঝে বড্ড দোষী মনে হয় নিজেকে। আমি চাইলে কি সবটা আটকাতে পারতাম? হয়ত পারতাম! জানিনা!

ইরা বলল, “এবার আপনারা বলুন!”

তারপর আমরা আমাদের স্টোরিটা বললাম। কীভাবে সব জানতে পারলাম আমরা! কীভাবে অ্যান্টি সিএএ আন্দোলন, এনআরসি, আর সংখ্যালঘু ভোট একাই আরএসপি কে শেষ করে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট ছিল। সেই কারনেই এই প্ল্যান! পারফেক্ট প্ল্যান যাকে বলে! ব্লাস্টের জায়গাগুলো বাছাও হয়েছে সেভাবেই! সব বললাম ইরা কে!

ইরা সব শুনে বলল, “কিন্তু সমস্যা একটাই। আমাদের কাছে কোনো প্রমান নেই! মানে কারা ঘটাচ্ছে এরা! কীভাবে তারা জড়িত! কিচ্ছু জানিনা আমরা!”

অরন্য বলল, “পশ্চিমবঙ্গে আরএসপির যিনি লিডার, তার সাথে একবার কথা বলা যায়? উনি তো নিশ্চয় সবটা জানেন!”

আমি বললাম, “মানে রাজেশ সিনহার সাথে? তাতে কী হবে? ও কি আমাদের বলে দেবে নাকি সব?”

অরন্য বলল, “বলে হয়তো দেবে না সব! কিন্তু যদি কোনো ক্লু পাওয়া যায়! তাহলে?”

ইরা বলল, “তাহলে আপনারা কাল দেখুন ওখান থেকে কোনো ক্লু পান কিনা! আমি অন্য একটা এঙ্গেল ফলো করি! আজ আসি! অনেক রাত হল!”

আমি বললাম, “আপনার ফোন নাম্বার টা দিয়ে যান! যদি কিছু জানতে পারি আপনাকে জানাবো। আপনিও সম্ভব হলে জানাবেন!”

ইরা বলল, “অবশ্যই! এই ব্লাস্ট টা আটকাতে হবে যেভাবে হোক!”

অরন্য ইরার দিকে নিজের ফোন বাড়িয়ে দিল। বলল, “আপনার নাম্বারটা সেভ করে দিন কাইন্ডলি!”

“আপনারা বসুন। আসছেন উনি”

কথাটা বলেছে যে ছেলেটি, সে সম্ভবত রাজেশ সিনহার অফিসেই কাজ করে। ও হ্যাঁ বলা হয় নি আমরা আজ সকালেই আফসারদার কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে আরএসপির একজন প্রবীন নেতা রাজেশ সিনহার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছি। আফসারদার বোধহয় মাথার ঠিক নেই। কারন আফসারদা জানে আমি ফিল্ডে কাজ করা পছন্দ করি না। কিন্তু আজ যখন বললাম অপজিশন লিডারের একটা সাক্ষাৎকার নিই। সামনে ইলেকশন। তখন শুধু হ্যাঁ নাও বলে ফোন রেখে দিল। স্ট্রেঞ্জ!

একটু পর সেই ছেলেটি এসে দু’টো কোল্ডড্রিংক এর গ্লাস দিয়ে গেল! তার মিনিটখানেক পর ঘরে ঢুকলেন রাজেশ সিনহা। একে আগে টিভিতে দেখেছি আমি। অরন্য কোনো সমাবেশে ফটো তুলতে গিয়ে হয়ত দেখে থাকবে। কিন্তু সামনা সামনি এই প্রথম দেখছি আমি!

উনি এসে ওঁর চেয়ারে বসলেন। তারপর বললেন, “বলুন। আপনাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারি!”

আমি বললাম, “আসলে। সামনেই তো ইলেকশন। তাই আমরা ভাবলাম লিডার অফ অপজিশনের যদি একটা এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার পাওয়া যেত তাহলে ভালো হত!”

উনি একটু খুশি হলেন বোঝা গেল। বললেন, “বাহ! এতো ভালো কথা! বলুন কি জানতে চান!”

অরন্য বলল, “আপনাদের ইলেকশনের প্রস্তুতি কেমন?”

রাজেশ বাবু বললেন, “প্রস্তুতি আর কি বলুন তো! মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। আমাদের প্রস্তুতি বলতে তো এটাই!”

আমি বললাম, “আচ্ছা অনেক সময়ই ইলেকশনের পর দেখা যায় এক দলের এমএলএ আর এক দলে চলে আসছেন! এরকম কোনো তুরুপের তাস আছে নাকি আপনাদের?”

উনি হেসে বললেন, “আরে ধুর! যে যার ইচ্ছেমত পার্টি করবে। এ আর আমরা ঠিক করে দেওয়ার কে! তবে কেউ দলে আসতে চাইলে আমরা তো না বলতে পারি না!”

–      আচ্ছা এই যে অ্যান্টিসিএএ মুভমেন্ট চলছে পার্ক সার্কাসে তারপর দিল্লীর শাহিনবাগে। এটা নিয়ে আপনার কি মত?

–      দেখুন এটা আমাদের রাজ্য সরকারের অক্ষমতা যে ওরা এতগুলো মানুষকে বাড়ি পাঠাতে পারছে না। একটা আইন পাশ হয়েছে সংবিধান মেনে। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। এদের স্পর্ধা কীভাবে হয় এত? সবকটা দেশদ্রোহী!

আমি অরন্যর দিকে তাকালাম। এই শব্দটা আজকাল বড্ড বেশী ব্যবহার হচ্ছে দেখছি।

অরন্য বলল, “কিন্তু ওরা যেটা বলছে যে ওদের ধর্মের মানুষদেরকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না কেন! সেটাও তো একটা ভ্যালিড প্রশ্ন!”

রাজেশবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, “কেন দেব? কেন দেব ওদের? যারা ওদের দেশে অত্যাচারিত হয় শুধু তাদের দেওয়া হবে। ব্যাস!”

অরন্য বলল, “ওদের দেশ মানে? এটাই তো ওদের দেশ!”

রাজেশবাবু একটু থতমত খেলেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ! মানে… আমি বলতে চাইছিলাম মুসলিমরা যেসব দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ সেই দেশগুলোতে যারা অত্যাচারিত তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে!”

অরন্য বলল, “আচ্ছা এই যে মুসলিমরা আপনাদের অ্যান্টিমুসলিম ভাবে। আপনাদের ভোট দেয় না। এরকম কিছু অভিযোগ এসেছে অনেকবার! এটা নিয়ে কিছু করার কথা ভেবেছেন কী?”

রাজেশবাবু মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, “দেখুন সবার নিজস্ব ভোটাধিকার রয়েছে। আমরা আর এসব নিয়ে কী করতে পারি!”

অরন্য বলল, “না মানে ধরুন হঠাৎ যদি দেখা একসাথে লাখ লাখ মুসলিম মারা গেল! তাহলে তো সবটা বেশ সহজ হয়ে যায় তাই না!”

এই রে! এটা কী বলল অরন্য! পুরো ঘেঁটে যাবে এবার সবটা!

রাজেশবাবু কিছুক্ষন আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “আপনারা যেন কোন মিডিয়া হাউস বললেন?”

আমি কিছু বলার আগেই অরন্য বলল, “টাইমস! বেঙ্গল টাইমস!”

আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম। ও কী বলছে এসব!

রাজেশবাবু বললেন, “আর আপনাদের নামগুলো যেন কী বললেন?”

অরন্য চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। আমিও উঠে দাঁড়ালাম ওর দেখাদেখি!

তারপর ও আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “ওর নাম তন্ময় ভাট! আর আমার নাম কুনাল কামরা!”

কথাটা বলে রাজেশ সিনহা কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম ওঁর অফিস থেকে!

আজ বাইক নিয়েই এসেছে ও। আমি পেছনে বসলাম। ও বাইক স্টার্ট দিল।

আমি বললাম, “এটা কী ছিল অরন্য? এসব কেন বলতে গেলি?”

অরন্য বলল, “জানিনা। মাথাটা হঠাৎ গরম হয়ে গেল রে! তুই ভাবতে পারছিস এতগুলো মানুষ একসাথে মারা যাবে তার জন্য ওর চোখে মুখে কোনো অনুতাপের চিহ্ন দেখলি?”

আমি বললাম, “তার জন্যে এভাবে সবটা বলে কেউ? ওরা তো সাবধান হয়ে যাবে!”

অরন্য বলল, “বাল সাবধান হবে! ওদের যা ঔদ্ধত্য! এসবে ওদের কিছুই হবে না!”

আমি আর কিছু বললাম না! আর তিন দিন বাকি। তারপর যে কী হতে চলেছে কলকাতায় আমরা কেউ জানিনা!

“Shit! এটা ঠিক করেন নি অরন্য! এভাবে বাঘের খাঁচায় ঢুকে কেউ বাঘ কে খোঁচায়?”

কথাটা বলেছে ইরা। আমরা বসে আছি। অরন্যর বাড়িতেই। ফেরার সময় অরন্য কে নিয়ে একবার নিজের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম। ঘরগুলোর দিকে জাস্ট তাকিয়ে থাকা যাচ্ছিল না। সব তছনছ করে দিয়ে গেছে ওরা! ল্যাপটপ টা পর্যন্ত মাটিতে পড়ে আছে ভাঙা অবস্থায়। বড্ড কষ্ট হচ্ছিল এটা দেখে! কিন্তু কি আর করা যাবে মৌমাছির চাক এ হাত দিলে কামড় তো একটু খেতেই হবে! তাও ২ টো শার্ট দেখলাম ঠিক আছে। ওই ২ টো নিয়ে বেরিয়ে এলাম ফ্ল্যাট থেকে।

অরন্য বলল, “জানি ঠিক করিনি। মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল! পরের বার খেয়াল রাখবো!”

আমি ইরা কে বললাম, “আপনি কিছু পেলেন?”

ইরা বলল, “নাহ! কিচ্ছু না! আমার একটা খোঁচড় আছে ডক এরিয়ায়। ওর সাথে কথা বললাম। কিছু বলতে পারল না! তবে ওকে সাবধান করে এসেছি। ১ তারিখ রাত্রে যেন পরিবার নিয়ে অন্য কোথায় চলে যায়!”

অরন্য বলল, “তাহলে আবার একটা Dead End! তাই তো? কিছু করার নেই আমাদের আর?”

ইরা কিছু বলল না। আমিও বলতে পারলাম না কিছু। এই কেসের সাথে জড়িত সবাই হয় খুব পাওয়ারফুল নাহলে মৃত! বড্ড কম জানি এই কেস টা নিয়ে আমরা!

ইরা বলল, “একটা কথা বলুন? এই কেসটা যদি সল্ভ হয়। মানে আমরা যদি প্রমান পাই তাহলে আপনারা কী করবেন সেই প্রমান নিয়ে?”

আমি বললাম, “মানে?”

–      মানে এত খাটছেন একটা কেসের জন্য! কেন? এতে আপনাদের কী লাভ? প্রমান নিয়ে আপনাদের পত্রিকা মানে নাগরিক এ প্রকাশ করবেন। তার জন্য এত খাটছেন?

আমি অপরাজিতর কথা বলতে যাচ্ছিলাম। অরন্য চোখের ইশারায় থামতে বলে ওকে বলল, “লাভ? এতগুলো মানুষ জাস্ট মারা যাবে আর আপনি আমাদের লাভ ক্ষতি খুঁজতে বলছেন?”

ইরা শান্তভাবে বলল, “আপনি শুধু শুধু উত্তেজিত হচ্ছেন অরন্য। আমি একবারও তা বলিনি! কিন্তু আপনারা লাইফ রিস্ক নিয়ে এভাবে কাজ করছেন সেটা দেখেই অবাক হচ্ছি! এটাই বললাম!”

অরন্য বলল, “আপনি তো সোম এর ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন! ইন্দ্রাক্ষীর ফ্ল্যাট এ যান নি?”

–      গিয়েছিলাম তো!

–      কিছু পান নি?

–      নাহ! কিচ্ছু পাই নি!

তখনই একটা কথা আমার মাথায় খেলে গেল! আমি বললাম, “আর একজন বোধহয় রয়েছে যার সাথে কথা বলা যায়!”

অরন্য বলল, “কে?”

আমি বললাম, “ইন্দ্রাক্ষীর ফ্ল্যাটের মালিক দীপক বাবু!”

অরন্য ভুরু কুঁচকে বলল, “তুই শিওর?”

আমি বললাম, “নাহ! শিওর একদমই না। কিন্তু ভদ্রলোক কে সেদিন আশ্চর্যরকম শান্ত মনে হয়েছিল! কেন কে জানে! খটকা টা তখন থেকেই রয়ে গেছে!”

ইরা কিছু বলল না। অরন্য একটু ভাবল। তারপর বলল, “চল তাহলে যাওয়া যাক!”

আমি বললাম, “এখন? রাত ৯ টা বাজে তো এখনই।”

অরন্য বলল, “হাতে আর তিনদিনও নেই সোম! রাত দিন এখন ভাবলে চলবে না!”

ইরা সোফা থেকে উঠে বলল, “চলুন। আমিও যাই!”

আমি বললাম, “আপনি?”

ইরা বলল, “হ্যাঁ। কেন? সমস্যা আছে কিছু!”

অরন্য বলল, “না সমস্যা নেই। চলুন!”

আমরা বেরিয়ে পড়লাম তখনই। ক্যাব নিলাম একটা। তিনজন বাইকে গেলে কলকাতা পুলিশ আর আস্ত রাখবে না! আমাদের বাড়ি থেকে বালিগঞ্জ যেতে সময় লাগল ৪০ মিনিট মত! রাস্তায় জ্যাম পাইনি খুব একটা।

ইন্দ্রাক্ষীর ফ্ল্যাটের সামনে যখন নামলাম তখন ১০টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। ফ্ল্যাট টার দিকে তাকিয়েই মনটা কেমন যেন করে উঠল। শেষবার যখন এসেছিলাম তখন ইন্দ্রাক্ষীর দেহটা…

“ঠিক আছিস?” অরন্য জিজ্ঞেস করল আমাকে

ইরা তাকাল আমার দিকে।

আমি বললাম, “হ্যাঁ। ঠিক আছি। চল। উনি থার্ড ফ্লোরে থাকেন!”

লিফট কে করে থার্ড ফ্লোরে উঠে বেল বাজালাম। দরজার বাইরে বড় করে ওঁর নাম লেখা আছে।

কিছুক্ষন পর দরজা খুলল একটি ছেলে! ১৬-১৭ বছর বয়স হবে। আমি বললাম, “দীপকবাবু আছেন?”

ছেলেটি অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে ভেতরে চলে গেল। তারপর “বাবা, তোমাকে কারা ডাকছে” শুনে বুঝলাম এটি দীপকবাবুর ছেলে। একটু পর দীপকবাবু বেরিয়ে এলেন! পেছনে এলেন ওঁর স্ত্রী!

আমাকে দেখে বললেন, “কী ব্যাপার? এত রাতে?”

আমি বললাম, “আপনার সাথে একটু কথা ছিল!”

দীপকবাবু বললেন, “এত রাতে কেন? কাল আসবেন!”

অরন্য বলল, “কাল এলে তো দেরী হয়ে যাবে দীপকবাবু। আমাদের বেশীক্ষন লাগবে না। আমরা ভেতরে যাবো নাকি আপনি বাইরে আসবেন?”

দীপকবাবু কী বুঝলেন জানিনা। স্ত্রী কে বললেন দরজাটা আটকে দাও আমি আসছি এক্ষুনি।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল!

অরন্য বলল, “ছাদে যাই চলুন!”

দীপকবাবু বললেন, “আপনাদের কী দরকার একটু বলবেন? আমি যা বলার পুলিশ কে বলেছি!”

যা বলার পুলিশ কে বলেছি! উফফ কত রহস্য উপন্যাসে যে এই লাইনটা পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই। তারপরেই লোকগুলোর কাছ থেকে এত কিছু জানা যায় যে পুলিশ কে সব বলেনি সেটা খুব ভালোভাবেই বোঝা যায়!

অরন্য বলল, “আরে ঠিক আছে। বেশীক্ষন লাগবে না বললাম তো! চলুন ছাদে যাই!”

দীপকবাবুর অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছাদে গেলেন উনি আমাদের সাথে। ছাদটা সবদিকেই ঘেরা!

দীপকবাবু বললেন, “বলুন! কী বলবেন!”

 “ইন্দ্রাক্ষীর যেদিন…” কথাটা বলতে গিয়েও একবার হোঁচট খেলাম আমি,  “…ইন্দ্রাক্ষীর যেদিন বডি পাওয়া যায়! সেদিন আপনাকে দেখে বড্ড রিল্যাক্সড মনে হচ্ছিল! আপনি কি আগে থেকে কিছু জানতেন?”

দীপক বাবু বললেন, “কীসব ভুলভাল বলছেন? আমি কী করে জানবো?”

আমি বললাম, “আমার কিন্তু মনে হচ্ছিল আপনি কিছু জানেন।”

দীপকবাবু উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে বললেন, “আপনার মনে হওয়া নিয়ে আপনি থাকুন! এসবের জন্য আমাকে যদি ফের বিরক্ত করেন তাহলে কিন্তু আমি পুলিশ কে জানাবো!”

ইরা এতক্ষন চুপ করে সবটা দেখছিল! সে এবার এগিয়ে এসে পকেট থেকে রিভলবার টা বার করে দীপকবাবুর গলায় ঠেকিয়ে বলল, “আর একবার গলা তুলে কথা বলুন! প্লিজ! আর একবার বলুন! I dare you.”

দীপকবাবু হঠাৎ কাঁপতে শুরু করলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “একি! এসব কী? এসবের মানে কী?”

ইরা বলল, “আমি আর একবার জিজ্ঞেস করি বরং! ইন্দ্রাক্ষীর মৃত্যু নিয়ে আপনি কতটা জানেন?”

দীপকবাবু আবারও কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “ওরা! ওরা আমাকে মেরে ফেলবে!”

অরন্য এবার এগিয়ে এসে বলল, “ওরা মানে? ওরা কারা?”

দীপকবাবু বললেন, “ওদের অনেক লম্বা হাত! আমাকে ওরা… আমাকে ওরা…

ইরা রিভলবারটা আর একটু জোরে গলায় চাপ দিয়ে বলল, “ওরা… কারা? শেষবারের মত জিজ্ঞেস করছি!”

দীপকবাবু বললেন, “বেঙ্গল পিপলস ফ্রন্টের লোকেরা!”

এক সেকেন্ড! এসব কী বলছেন উনি! বেঙ্গল পিপলস ফ্রন্ট মানে? যারা এই মুহুর্তে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আছে? তারা কলকাতায় বিস্ফোরন ঘটাতে চায়? তারা চায় সংখ্যালঘুদের মারতে? কিন্তু… কেন? তাতে ওদের কী লাভ?

(চলবে)

তিলোত্তমা ঘূর্নাবর্তে – দ্বিতীয় পর্ব – ৩

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


One thought on “তিলোত্তমা ঘূর্নাবর্তে – দ্বিতীয় পর্ব – ৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি