৪
পাশের একটা ঘরে সবার জেরা হচ্ছে! আমরা যে যার কিউবিকলে বসে আছি। অরন্যকে দেখতে পাচ্ছিনা। কোথায় যে চলে যায় ছেলেটা মাঝে মাঝে! একটু আগে আমার মুখের অবস্থা দেখে বোধহয় ও বুঝতে পেরেছিল সব টা। তারপর আমাকে আস্তে আস্তে ধরে নিয়ে এল নিজের কিউবিকলের দিকে। আমি এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে কিছুই ভাবতে পারছিলাম না!
তাও একটু পর গেলাম আফসারদার ঘরে। আজ ওঁর মনের অবস্থাটা কী হবে সেটা কল্পনাও করতে পারছি না। সৃঞ্জয়দার সাথে সবার সম্পর্ক খারাপ হলেও আফসার দার সাথে কখনও খারাপ ব্যবহার করেনি ও। আফসারদার ঘরের কাঁচের দরজা টা কিছুটা খুলে বললাম, “আসবো?”
আফসারদা টেবিলের ওপর মাথা নীচু করে বসেছিলেন। আমাকে দেখে মুখ তুলে বললেন, “এসো!”
আমি সামনে একটা চেয়ারে বসলাম। বললাম, “তুমি ঠিক আছো?”
আফসারদা বলল, “ঠিক? কি জানি! জানিনা। পর পর দু’জন। আমার অফিস থেকেই… আমি কিছু ভাবতে পারছি না!”
আমি বললাম, “সৃঞ্জয়দার ঠিক কী হয়েছিল জানা গেল?”
আফসারদা বলল, “পুলিশ তো বলছে চুরি করতে এসেছিল চোর। তারপর হঠাৎ ওর ঘুম ভেঙে যায়। তাই খুন করে পালিয়ে যায় চোর!”
আমি কিছু বললাম না। কিছু চুরি হল না অথচ চোর খুন করে চলে গেল!
আফসারদা এবার বলল, “তুমি আজ হঠাৎ এলে কেন? ছুটিতে ছিলে তো!”
আমি বললাম, “আফসারদা এই অবস্থায় ছুটিতে থাকলে মানে একা থাকলে ডিপ্রেশন টা বাড়বে। তাই ভাবলাম কাজের মধ্যে থাকলে যদি…!”
আফসারদা বলল, “ঠিক আছে। সোহিনী সৃঞ্জয়ের নিউজ টা করছে। একটু দেখে নিও হলে। আমার কিছু ভালো লাগছেনা আজ!”
আমি বললাম, “হ্যাঁ দেখে নেবো। তুমি চিন্তা কোরো না!”
কথাটা বলে চেয়ার থেকে উঠে পড়লাম আমি। বেরিয়ে যাওয়ার আগে আফসার দা বলল, “আর ইয়ে…
আমি ফিরে তাকালাম।
“ওই পুলিশের জেরা শেষ হলে আমায় একটু জানিও!”
“ওকে” বলে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে!
একটু পরে আমাকে আবার ওই পুলিশ অফিসার কে ফেস করতে হবে! ধুর! আর পোষাচ্ছে না এসব। এই ঝামেলাটা এবার থামুক। একটু শান্তি চাই আমি!
আফসারদার ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলাম অরন্য বসে আছে আমার কিউবিকলের পাশে একটা চেয়ারে।
আমি এগিয়ে গেলাম ওর দিকে। কাছে গিয়ে বললাম, “তোকে ডাকল?”
ও বলল, “না! আফসারদা ঠিক আছে?”
আমি বললাম, “ওই আর কি! দু’ দু’টো খুন! একই অফিস থেকে। ঠিক থাকা যায়?”
অরন্য বলল, “হুম।”
– কিন্তু আমি একটা কথা বুঝতে পারছি না। আমাকে সৃঞ্জয় দা বলল ইন্দ্রাক্ষীর মার্ডারটা এক্সপেরিমেন্টাল ছিল। মানে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই শরীরে। অথচ সে মৃত! তাহলে সৃঞ্জয়দার ক্ষেত্রে এভাবে মার্ডার করল না কেন? খুন টা তো একই Organization এর কোনো মানুষ করেছে!
অরন্য একটু ভেবে বলল, “কারন তাহলে প্রশ্ন জাগত মানুষের মনে। একই মিডিয়া হাউসের দু’জন মানুষের মৃত্যু হার্ট অ্যাটাকে? মাত্র ২ দিনের ব্যবধানে! আর তাছাড়া তখন ওরা এই চোর খুন করেছে অ্যাঙ্গেল টাও ব্যবহার করতে পারত না!”
তাই তো! এটা মাথায় আসেনি! অরন্য ওর ক্যামেরাটা হাতে নিয়েই খুটখাট করছিল। এমন সময় রাজু এসে বলল, “পরের জন কে ডাকছে। তোমরা দু’জনেই বাকি আছো!”
আমি অরন্যর দিকে তাকালাম। ক্যামেরাটা আমার টেবিলে রেখে ও উঠে পড়ল চেয়ার থেকে।
বলল, “আমি যাই। তুই বোস!”
কথাটা বলে সেই ঘরের দিকে চলে গেল অরন্য! আমি ওর ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে আগের তোলা ফটোগুলো দেখছিলাম। পার্ক সার্কাসের অ্যান্টি সিএএ মুভমেন্ট এর প্রচুর ফটো রয়েছে। সত্যি সারাদেশ জুড়ে যা সব চলছে! কবে যে এসব থামবে! দিনের পর দিন মানুষগুলো এখানে বসে আছে নিজেদের দাবি নিয়ে। অথচ সরকারের কোনো হেলদোল নেই। ওদের কাছে এরা যেন থেকেও নেই।
আর তখনই আমার মাথায় বিদ্যুৎ এর মত খেলে গেল সব টা! সমস্ত কিছু এক লহমায় যেন একটা প্যাটার্নে পড়ে গেল! পেনড্রাইভের ওই বিস্ফোরনের জায়গাগুলো আজকের পরিস্থিতি, সবটাই একটা বড় প্ল্যানের অংশ। অরন্য কে বলতে হবে! ক্যামেরাটা রেখে দিলাম যথাস্থানে!
তখনই রাজু এসে ডাকল আমাকে, “সোমদা, তোমায় ডাকছে!”
বললাম, “অরন্য কোথায়?”
রাজু বলল, “সিগারেট খেতে গেল বাইরে!”
যাই হোক। ওসব পরে হবে। One Problem at a time. আগে ওই অফিসার কে ফেস করতে হবে। টেবিল থেকে জলের বোতলটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে অনেকটা জল খেয়ে আমি এগিয়ে গেলাম সেই Interrogation রুমের দিকে।
৫
অরন্য বসে আছে চেয়ারে। আমরা ওর বাড়িতেই আছি। যেটাকে ও বলে ওর আর একটা অফিস! অফিস থেকে ফেরার সময়ই ওকে বলছিলাম প্রচুর কথা আছে কেস টা নিয়ে।
আমি উত্তেজনায় ফুটছিলাম যেন! কখন ওকে বলব সেটা ভেবেই। ও বলছিল তখনই বলতে। আমি বলেছিলাম এসব কথা রাস্তায় হবে না। আর সত্যিই রাস্তায় এসব কথা বলা খুব রিস্কি। কোথায় কে শুনে ফেলে! আর তার ওপর টায়ার্ড লাগছিল। ওই অফিসারের জেরার পর আর ভালো লাগছিল না এত কথা বলতে। খিদেও পাচ্ছিল।
ঘরে ঢোকার পর আমাকে অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার? টেনশনে আছেন নাকি?”
চেয়ারে বসতে বসতে ওঁর ইউনিফর্মে ওর নাম টা খেয়াল করলাম। পঙ্কজ মল্লিক।
আমি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলাম, “না মিস্টার মল্লিক! টেনশন কেন হবে?”
ওঁকে মিস্টার মল্লিক সম্বোধন করাতে উনি প্রথমটা একটু চমকে গিয়েছিলেন। তারপর নিজের শার্টের দিকে খেয়াল পড়তেই হেসে বললেন, “Nice Observation! বাড়ির সব ঠিকঠাক?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। ভুল ভাল কেন হবে?”
মিস্টার মল্লিক বললেন, “যাক! ঠিকঠাক থাকলেই ভালো! যা সব হচ্ছে আপনাদের অফিসে! একটার পর একটা!”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। আচ্ছা ঐ কেসটার কিছু হল?”
মিস্টার মল্লিক বললেন, “আরে ওসব নিয়ে আপনি টেনশন নেবেন না! আমরা সামলে নিচ্ছি তো!”
– না মানে। আর তো ৫ দিন বাকি। তাই আর কি…
– সব ঠিক আছে ওদিকে। তবে কী বলুন তো অনেক সময় আমরা চাইলেও অনেক কিছু করতে পারি না। হাত বাঁধা থাকে!
আমি বললাম, “হাত বাঁধা মানে?”
মিস্টার মল্লিক বললেন, “হাত বাঁধা মানে ধরুন, মানে… আমরা কিছু করার আগেই কত কিছু ঘটে গেল। ও অনেক জটিল ব্যাপার! বাদ দিন। সৃঞ্জয় বাবুর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?”
আমি বললাম, “ভালোই ছিল! তবে উনি একটু বদমেজাজী ছিলেন। সবার সাথেই খারাপ ব্যবহার করতেন।”
– আপনার সাথে করেছেন কখনও?
– হ্যাঁ। বেশ কয়েকবার!
– আপনার কোনো রাগ টাগ ছিল নাকি সে নিয়ে?
আমি বললাম, “আপনি কি জানতে চাইছেন আমি খুন করেছি কিনা?”
মিস্টার মল্লিক হেসে বললেন, “একদম না। খুন তো চোর করেছে। এটা ফাইনাল। তাও জাস্ট রুটিন জেরা করতেই হয় বুঝতেই পারছেন!”
– ওহ আচ্ছা। নাহ। খুব একটা রাগ ছিল না সেসব নিয়ে। উনি মানুষটাই এরকম!
– শেষ কখন দেখেছিলেন ওকে?
একটু থামলাম আমি। এই প্রশ্নের উত্তরে সত্যি বলা যাবে না। সব ঘেঁটে যাবে!
বললাম, “কাল অফিসে! আমাকে এসে বললেন আমি কেন ইন্দ্রাক্ষীর ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম!”
এরপরের প্রশ্নটাতে আমি একটু অবাক হলাম। উনি জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা আপনি কি Lefty?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ? মানে? কেন?”
– দরকার আছে। ডান হাতে কাজ করেন নাকি বাঁ হাতে?
– ডান হাতেই তো! কেন?
মিস্টার মল্লিক বললেন, “ঠিক আছে। আপনি যেতে পারেন!”
হয়ে গেল? যাহ বাবা! যা বুঝলাম এরা এই কেসটা নিয়ে এগোবেই না ঠিক করেছে। ওই চোর থিওরিটাই রাখবে শেষ পর্যন্ত।
চেয়ার থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলাম।
হঠাৎ অফিসারটি বলে উঠলেন, “সাবধানে থাকবেন! বাড়ির সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নেবেন! আর দরজা ভালো করে বন্ধ করে রাখবেন ক’দিন।”
আমি হ্যাঁ বলে বেরিয়ে আসছিলাম কিন্তু মনের মধ্যে একটা খটকা কাজ করছিল! এরকম অযাচিত উপদেশের কি বিশেষ কোনো কারন রয়েছে?
“হ্যালো! কী হল রে? কী বলবি যে!”
অরন্যর ডাকে ঘোর কাটল আমার!
আমি বললাম, “হ্যাঁ! সরি…”
অরন্য বলল, “বল!”
আমি বললাম, “আজ তোর ক্যামেরায় ওই অ্যান্টি সিএএ মুভমেন্ট এর ফটোগুলো দেখছিলাম। সেটা দেখতে দেখতেই মাথায় এল এটা। ওই পেনড্রাইভে আমি যে যে এলাকা গুলোতে মার্ক করা ছিল দেখেছিলাম সেগুলো সবকটাই কিন্তু মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা! মানে ওই সবকটা জায়গাতেই কিন্তু মুসলিম জনঘনত্ব বেশী। যেমন ধর খিদিরপুর, গার্ডেনরিচ, রাজাবাজার, মেটিয়াবুরুজ এই সব জায়গা কিন্তু মার্কড ছিল ওখানে।”
অরন্য বলল, “বেশ… তারপর?”
– “ধর একটা রাজনৈতিক দলের এমন একটা রেপুটেশন তৈরী হয়ে গিয়েছে যে সবাই জানে তারা মুসলিম বিরোধী। নিজেদের হিন্দুত্ববাদী প্রোপাগান্ডা ছাড়া তারা আর কিছু বোঝে না। তার জন্যে রাম মন্দির, তার জন্যে চিকেন বা মাটন কে বিফ সন্দেহে মুসলিম মারা বা NRC এসব তারা করে! ভারতবর্ষের অনেক রাজ্যেই তারা ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু… কোনোভাবেই তারা বেঙ্গলে ঢুকতে পারছে না! কারন কোনো মুসলিম কখনও তাদের ভোট দেবে না তারা জানে। আর পশ্চিমবঙ্গের যা হিন্দু জনসংখ্যা তারা যদি অর্ধেকও ওদের পার্টি কে ভোট দেয় তাহলেও ওরা জিততে পারবে না। কেন? কারন পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়। আর কলকাতা এবং তার আশেপাশেই ১০ লাখেরও বেশী মুসলিম বাস করে! এবার ধর হঠাৎ করে এই ১০ লাখ মুসলিম এর সংখ্যাটা যদি ১ লাখ হয়ে যায়! ৯ লাখ মানুষ যদি রাতারাতি মারা যায়! তাহলে লাভটা কাদের?”
অরন্য চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। বলল, “তাহলে না থাকবে মুসলিম ভোট, না থাকবে অ্যান্টি সিএএ মুভমেন্ট! পুরো ইলেকশনটাই ঘুরে যাবে সেই রাজনৈতিক দলের দিকে!”
আমি বললাম, “Exactly!”
অরন্য বলল, “ব্রিলিয়ান্ট প্ল্যান কিন্তু! এর পেছনে আরএসপি ছাড়া আর কেউ থাকতেই পারে না! ওই পার্টিটাই এই রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে চায়। আর এই মানুষ মেরে ভোটে জেতার প্ল্যান ওরা ছাড়া আর কেউ করতেই পারে না!”
আমি বললাম, “কিন্তু আমাদের কাছে কোনো প্রমান নেই! কিচ্ছু নেই। কোনোভাবেই আমরা এটা প্রকাশ করতে পারব না!”
অরন্য কিছু বলল না। সারা ঘরময় পায়চারি করতে লাগল অস্থিরভাবে!
আমি বললাম, “তোকে ঐ ইন্সপেক্টর মল্লিক কি বলল?”
অরন্য বলল, “কী আর বলবে! ওই সৃঞ্জয় দা কে নিয়ে জিজ্ঞেস করল! আর Lefty কিনা জানতে চাইল!”
আমি বললাম, “তোকেও এটা জিজ্ঞেস করেছে? কেন বল তো?
অরন্য বলল, “বোধহয় সৃঞ্জয়দার খুনটা যে করেছে সে Left handed.”
আমি বললাম, “কী করে জানলি?”
– জানিনা। মনে হল। নাহলে সবাইকে এটা কেন জিজ্ঞেস করবে। আর তাছাড়া কাল রাতেও মনে হচ্ছিল ছুরিটা যেন একটু অন্য Angle এ..
অরন্যর কথা শেষ হল না! তার আগেই ফ্ল্যাটের কলিং বেল টা বেজে উঠল! আমরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকালাম। এখন বাজে সাড়ে ৯ টা। এই সময় কে এল এখানে! দরজায় পিপহোলও নেই। হুট করে দরজা খোলা ঠিক হবে না। একটার পর একটা খুন যেভাবে হচ্ছে তাতে সত্যিই আর ভরসা হচ্ছে না কোনো কিছুতেই!
অরন্য পাশের ঘরে গিয়ে রিভলবার টা বের করে আনল। এর মধ্যে বেল টা আরও দু’বার বেজেছে। আমি খুলিনি। তারপর অরন্য ডান হাতে রিভলবার টা নিয়ে দরজাটা হালকা করে ফাঁক করল। তারপর খুলে দিল পুরো দরজাটা!
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অচেনা একটি মেয়ে। পরনে জিন্স আর শার্ট!
সে অরন্যর হাতে রিভলবার দেখে হেসে বলল, “এখনও ওই খেলনা রিভলবার নিয়ে ভয় দেখাচ্ছো অরন্য দেব?”
(চলবে)

Arnab da,jvabe BJP-ke thuke eta likhecho,kono go-vokto dkle na abar gutote ase,naam tao RSS theke RSP rekhecho.. jaihok darun lagche, eta boi hisebe published krle kine rakbo..