বেঙ্গল পিপলস ফ্রন্ট রাজনৈতিক দলের বৈঠক চলছিল। আলোচনা চলছিল সামনের ইলেকশন নিয়ে। দলের প্রধান তথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় রায় চৌধুরী সেদিন অবশ্য উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর ডানহাত এবং দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অভিজিৎ পুরকায়স্থ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা সেদিন সবাই উপস্থিত ছিলেন।

দীপাঞ্জন মজুমদার দলের একজন নবীন নেতা। উনি বললেন, “আচ্ছা সংখ্যালঘু ভোটের ব্যাপার টা আমাদের একটু নজর দিলে হয় না? কবে থেকে ওরা অ্যান্টি সিএএ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে পার্ক সার্কাসে। সেটা নিয়ে যদি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী কিছু বলেন তাহলে ওরা –

অভিজিৎ পুরকায়স্থ প্রবীন নেতা। উনি হাতের ইশারায় ওকে থামতে বললেন। তারপর বললেন, “দেখুন… শুনতে খারাপ লাগলেও একটা কথা মানতেই হবে যে সংখ্যা লঘু ভোট আমাদের হাত থেকে কোথাও যাবে না! কেন জানেন?”

সবাই জানে উত্তরটা অভিজিৎ বাবুই দেবেন। তাই কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করল না।

অভিজিৎ বাবু বললেন, “কারন আমাদের বিরোধী দলের অর্থাৎ আরএসপির সংখ্যালঘু দের সাথে সম্পর্ক কোনোকালেই ভালো ছিল না। আজও ভালো নেই। ওদের উদ্দেশ্যটা সবসময়ই হিন্দু ভোট ব্যাঙ্ক শক্ত করার দিকে থাকে। কিন্তু সবাই কে নিয়ে না চললে ক্ষমতায় আসা যায় না। কাজেই ওদিকটা নিয়ে আপনাদের ভাবতে হবে না। সংখ্যালঘু ভোট ওরা পাবে না। আর পশ্চিমবঙ্গে যে পরিমান হিন্দু বাস করে তার অন্তত ৫০ শতাংশ ভোটও যদি আমরা পাই তাহলেই আমাদের জেতা কেউ আটকাতে পারবে না!”

সবাই ঘাড় নাড়ল। মন্তব্য করল না কেউই। কারন আসল পরিস্থিতি সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল। দীপাঞ্জন মজুমদার কিছু একটা বলতে গিয়েও বললেন না। ওর একটা ফোন আসছে বার বার! ফোনটা কেটে দিলেন উনি। অভিজিৎ বাবু মিটিং এর মাঝে ফোন ধরা পছন্দ করেন না।

মিটিং এর পর পার্টি অফিসে বসে কিছু ফাইল দেখছিলেন অভিজিৎবাবু। দলের কেউই প্রায় নেই তখন। ফাইফরমাশ খাটে শিবম নামে একটা ছেলে, সে বাইরে চা খাচ্ছিল। সে হঠাৎ এসে বলল, “স্যার আপনার সাথে তিনজন দেখা করতে এসেছে!”

ঘড়ির দিকে একবার দেখলেন অভিজিৎ বাবু। সাড়ে ৮ টা বাজে! এখন আবার এখানে কে এল?

অভিজিৎ বাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “বল আমি ব্যস্ত। আজ দেখা হবে না!”

শিবম বলল, “বলেছি স্যার। ওরা বলছে তোমার স্যার কে এই কাগজ টা দেখাও। তাহলেই দেখা করবেন উনি!”

কথাটা বলে ছেলেটি ভাঁজ করা কাগজটা এগিয়ে দিল।

অভিজিৎ বাবু নির্লিপ্তভাবে কাগজ টা হাতে নিলেন। ভাঁজ করা কাগজটা খুলে দেখতেই ওঁর সমস্ত নির্লিপ্তভাব কেটে গেল! চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন উনি। দুবার জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলেন। উনি আসলে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না এরকম একটা কিছু হতে পারে!

কয়েক মুহুর্ত পর অভিজিৎ বাবু শিবম কে বললেন, “ওদের ভেতরে নিয়ে আয়! নাম-ধাম কিছু বলেছে ওরা?”

শিবম বলল, “একজনের নাম অরন্য আর একজনের নাম সোমবুদ্ধ আর একজন ম্যাডামের নাম বলল না!”

অভিজিৎ বাবু বললেন, “ঠিক আছে। নিয়ে আয় ওদের!”

শিবম চলে গেল।

অভিজিৎবাবু কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষন।

একটু পর ঘরে ঢুকল তিনজন! ঘরের চার কোনে চারটে ছোটো টেবিলে একটা করে ফুলদানি রয়েছে।

ঘরে ঢোকার পরেই একটি ছেলে হঠাৎ দরজার পাশের ফুলদানির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “আরিব্বাস এটা সেক্সি দেখতে তো!”

পাগল নাকি এ? ওর সঙ্গের ছেলেটি এবার একটু গলা ঝেড়ে বলল, “অরন্য Behave!”

ছেলেটি “ওহ সরি” বলে আবার পিছিয়ে এল। ওদের সাথে একটি মেয়েও রয়েছে। মেয়েটি তাকিয়ে আছে অভিজিৎবাবুর দিকে! তার দৃষ্টি স্থির!

ওরা তিনজন এগিয়ে এল অভিজিৎবাবুর দিকে।

সেই পাগলমত ছেলেটিই কথা বলল প্রথম।

সে বলল, “মিস্টার অভিজিৎ পুরকায়স্থ, আপনি কি পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে চান?”

“চল ওঠ” কথাটা বলে অরন্য তাকিয়ে রইল আমার দিকে।

আমি একবার ওর দিকে, একবার পাইপটার দিকে তাকালাম। একবার ভাবলাম ও মজা করছে। তারপরে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম ও মজা করছে না।

আমি বললাম, “এই পাইপ দিয়ে উঠব? কী ভাবিস আমাকে তুই? স্পাইডারম্যান নাকি?”

“আস্তে কথা বল!” ফিসফিসিয়ে বলল অরন্য, “এখানে প্রচুর মানুষ থাকে! কেউ একজন দেখতে পেলেই আমরা শেষ। ভুলে যাস না আমরা বেআইনি কাজ করছি এখন!”

আমি বললাম, “আমরা সোজা ফ্ল্যাট দিয়ে উঠে যেতে পারি না?”

অরন্য এবার একটু রেগে গেল। বলল, “ফ্ল্যাটের দরজা কে খুলে দেবে? তোর বাবা?”

কথাটা ঠিক বলেছে অবশ্য ও! এতরাতে ফ্ল্যাটের দরজা সত্যিই খোলার কেউ নেই! আর তাছাড়া এমন একজনের ফ্ল্যাটে হানা দিতে চলেছি আমরা! ভাবতেই অবাক লাগছে আজ একটু আগে অবধি আমি প্রানের ভয়ে পালাচ্ছিলাম। আর এখন সেই লোকটারই ফ্ল্যাটে হানা দিচ্ছি যে আর একটু দেরী হলে আমায় খুন করে ফেলত!

ঘন্টাখানেক আগে যখন অরন্যর ফ্ল্যাটে পৌঁছোলাম তখন ওই ল্যাপটপ, অপরাজিতর ফেসবুক পেজ দেখে আমি সত্যিই খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। অরন্য যেটা আমায় বলল তার মূল বক্তব্য হচ্ছে এই – “অপরাজিত – The Unvanquished” এরা স্টিং অপারেশনের জন্য বিখ্যাত! কেউ জানেনা এখানে কারা কাজ করে! প্রত্যেকটা বড় শহরে ওদের লোক আছে। কলকাতাতে আপাতত সংখ্যাটা বড্ড কম। ২ জন। অরন্য রয়েছে। আর একজন কেউ রয়েছে যাকে অরন্য ব্যক্তিগত ভাবে চেনে না। এভাবেই নাকি কাজ করে অপরাজিত! একজন আর একজন কে চেনেনা ভালো করে। যদি কোনো স্টিং অপারেশনে একসাথে কাজ করে তাহলে আলাপ হয়। কিন্তু কলকাতায় আজ অবধি বড় কোনো স্টিং অপারেশন করে নি অপরাজিত! কাজেই…

“কীরে? ওঠ না!” অরন্যর ডাকে আবার বাস্তবে ফিরলাম আমি।

বললাম, “তুই আগে ওঠ। আমি তোর দেখে চেষ্টা করব।”

অরন্য আর কথা বাড়াল না। পাইপের একটা খাঁজে পা রেখে ওপরের কার্ণিশে চলে গেল। তারপর খুব সহজেই এই কার্নিশ থেকে ওই কার্নিশ করে পৌঁছে গেল সেকেন্ড ফ্লোরের বারান্দায়। তারপর হাতের ইশারায় ডাকল আমাকে।

আমি ভগবানের নাম করে পা দিলাম পাইপে! জিন্সটা না ছিঁড়ে যায় এটাই ভাবছিলাম।

যাই হোক এই জায়গাটা ফাস্ট ফরওয়ার্ড করা হোক। কারন অরন্যর যেটার জন্য লাগল পাঁচ মিনিট, আমার সেটার জন্যে লাগল ২০ মিনিট! হাঁফাতে হাঁফাতে যখন বারান্দায় পৌঁছোলাম তখন অরন্য ফোনে কিছু একটা দেখছে।

ফিসফিসিয়ে বললাম, “তোর মনে হয় এতে কোনো লাভ হবে? সৃঞ্জয় দা আমাদের কিছু বলবে মনে হয়?”

অরন্য পকেট থেকে রিভলবার টা বার করে বলল, “যাতে বলে, তার জন্যেই এই অনুঘটক টা সাথে আনা!”

আমি আর কিছু বললাম না। অনেক প্রশ্ন আসছে মাথায়! সৃঞ্জয় দা যদি একা না থাকে? যদি সাথে স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে থাকে? ওদেরকেও রিভলবার দেখাবে অরন্য? আদৌ সব টা ভেবে এসেছে তো ও!

আজ রাত্রে ওর ফ্ল্যাটে যাওয়ার পরেই ও বলল, “একটু জিরিয়ে নে! তারপরেই বেরোবো!”

আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, “কোথায়?”

অরন্য বলেছিল, “এখনও অবধি এই জঙ্গী হামলার ব্যাপারে একমাত্র লিংক হল সৃঞ্জয় দা। ওর কাছ থেকে অনেক কিছু জানা যাবে!”

আমি বলেছিলাম, “তাহলে একটু আগে যখন আমি গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়লাম, তখন ওকে ধরলাম না কেন?”

অরন্য বলল, “কারন তখন ওর সাথেও রিভলবার ছিল। প্রতিপক্ষকে এমন সময় আক্রমন করতে হবে যখন সে আক্রমন টা এক্সপেক্টই করবে না।”

বারান্দার দরজাটা ঠেলতেই খুলে গেল! এটা নিয়েও টেনশন হচ্ছিল খুব। কষ্ট করে পাইপ বেয়ে বারান্দায় উঠে যদি দেখি দরজাটা বন্ধ তাহলেই সব ঘেঁটে যেত!

অরন্য এগোলো পা টিপে টিপে। আমি এগোলাম ওর পেছন পেছন। ঘরটা অন্ধকার। একটু দূর থেকে ফ্রীজ চলার একটা হালকা আওয়াজ আসছে। ২ দিকে ২ টো ঘর। আমরা প্রথমে বাঁদিকের ঘরটার দিকে এগোলাম। আস্তে করে পর্দা সরিয়ে দেখা গেল সেই ঘরে শুধু আসবাবপত্র আর একটা কম্পিউটার রয়েছে।

আমরা এবার এগোলাম ডানদিকের ঘরটার দিকে। ঘরের দরজাটা ভেজানো রয়েছে। ভেতরে ফ্যান চলার আওয়াজ হচ্ছে! অর্থাৎ এটাই সৃঞ্জয়দার বেডরুম। আমি বুঝতে পারছি আমার রক্তচাপ হঠাৎই বেড়ে গেল। দরজাটা বাঁ হাতে করে আস্তে আস্তে খুলল অরন্য। তারপর মুখ বাড়িয়ে দেখল ঘরের ভেতর। ও কি দেখতে পেল জানিনা। তবে দেখার পরেই বেডরুমের ভেতর ঢুকে গেল ও। আমিও গেলাম ওর পেছনে। ঘরে একটা নাইট বাল্ব জ্বলছিল। সেই আলোতে দেখলাম বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে সৃঞ্জয় চৌধুরী।

অরন্য এরপর রিভলবারটা বিছানার দিকে তাক করে রেখে সুইচবোর্ডের সবকটা সুইচ পর পর দিয়ে দিল। ঘরটায় আলো জ্বলে উঠল। প্রথমে চোখটা একটু ধাঁধিয়ে গেলেও পরক্ষনেই যা দেখলাম তাতে আঁতকে ওঠা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। বিছানায় শোয়ানো আছে সৃঞ্জয়দার নিথর দেহ। বুকের ঠিক বাঁদিকে একটা বড় ছুরি বসানো! আর সৃঞ্জয়দার সারা শরীর এবং বিছানা রক্তে লাল হয়ে আছে।

কয়েক মূহুর্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম দু’জনে। অরন্য রিভলবারটা নামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল! আমি বললাম, “এবার? পুলিশে জানাতে হবে তো?”

অরন্য উত্তর দিল না। ওই ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরের দিকে চলে গেল! আমি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আরও কিছুক্ষন। মৃত্যু কি এতই সহজ? এক এক করে মানুষ মারা যাচ্ছে অথচ কেউ কিছু করতে পারছে না। একটু পর আমিও গেলাম পাশের ঘরে। অরন্য দেখলাম কম্পিউটারে বসে আছে।

জিজ্ঞেস করলাম, “কী করছিস?”

ও বলল, “দেখতে চাইছিলাম কম্পিউটারে কিছু আছে কিনা। কিন্তু পাসওয়ার্ড দেওয়া!”

আমি বললাম, “তাহলে?”

অরন্য উঠে পড়ল কম্পিউটার থেকে। আমার দিকে ফিরে বলল, “তাহলে আর কী? কোনো লাভ নেই এসব-

কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেল অরন্য। তারপর পকেট থেকে কম্পিউটার টেবিলে রাখা রিভলবার টা তুলে নিল হাতে। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করল, “সোম, তুই কি ভূতে বিশ্বাস করিস?”

আমি বললাম, “মানে?”

অরন্য আস্তে আস্তে বলল, “গুড! আমিও করি না। কিন্তু তাহলে এই ফ্ল্যাটে আমরা ছাড়াও আর একজন মানুষ রয়েছে!”

কথাটা শুনেই চমকে গেলাম আমি। অরন্য চোখের ইশারা করল সামনের দিকে। দেখলাম ডাইনিং এ লম্বা ছায়া পড়েছে একটা। সম্ভবত বারান্দায় কেউ একটা রয়েছে। আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম অরন্য ঠোঁটের কাছে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলল। আমি থেমে গেলাম।

তারপর অরন্য রিভলবার টা হাতে নিয়ে সামনের দিকে তাক করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তারপর চেঁচিয়ে বলল, “Hands up!”

আমিও ওর সাথেই ছিলাম। দেখলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা ছায়ামূর্তি। অরন্যর কথা শুনে সে পেছন ফিরে তাকালো। তার মুখটা অর্ধেক ঢাকা। কালো একটা মাস্ক পরে আছে সে।

অরন্য বলল, “কে আপনি?”

ছায়ামূর্তিটি এবার এগিয়ে এল আমাদের দিকে। তারপর মেয়েলি গলায় বলল, “কাউকে ভয় দেখাতে হলে এরপর আসল রিভলবার দিয়ে ভয় দেখিও! কেমন?”

আমি তো শুনে থ! মানে? অরন্যর রিভলবারটা আসল নয়? যেটার ভরসায় আমি এতক্ষন ছিলাম এতক্ষন সেটা কিনা নকল আগ্নেয়াস্ত্র? ভাবা যায়!

অরন্য বলল, “কী চাই আপনার?”

মেয়েলি কন্ঠে উত্তর এল, “যাকে দরকার ছিল, তার ডেডবডি ওই ঘরে পড়ে রয়েছে! I hope you didn’t…”

আমি বললাম, “না। আমরা এসে দেখলাম ওভাবেই…

“কিন্তু আপনি কে?” আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই অরন্য বলল

মেয়েটি একটু হেসে বলল, “সব প্রশ্নের উত্তর না জানাই ভালো অরন্য দেব!”

কথাটা বলেই মেয়েটি দৌড়ে বারান্দার দিকে ফিরে লাফ দিল। আমরা দৌড়ে গেলাম সেদিকে। দেখলাম মেয়েটি সুনিপুন ভাবে কার্নিশে পা দিয়ে দিয়ে কত সহজে নেমে চলে গেল নীচে। তারপর চলে যাওয়ার আগে একবার আমাদের দিকে ফিরে হাতটা কপালে ঠেকিয়ে স্যালুট করল মনে হল। তারপর দৌড়ে মিশে গেল অন্ধকারের মধ্যে!

আমি অরন্যর মুখের দিকে তাকালাম। ও নিজেও খুব অবাক হয়ে গেছে বুঝতে পারছি। কে এই মেয়েটি? রাতের অন্ধকারে সৃঞ্জয়দার ফ্ল্যাটে কী করছিল ও?  ওর সাথে কি এই বম্বিং এর কোনো যোগাযোগ আছে?

“তুই শিওর আমাদের আজ অফিস যাওয়া ঠিক হবে?”

প্রশ্নটা করেছি আমি। আমি আজ অফিস যাবো না ভাবছিলাম কিন্তু অরন্যর জোরাজুরি তে যেতে হচ্ছে! আমরা এখন ক্যাবে। অরন্য বলল রোজ বাইক নিয়ে যেতে ইচ্ছে করে না অফিস! কলকাতার রাস্তায় বাইক চালানো টা বড্ড চ্যালেঞ্জিং! তাই আজ ক্যাবেই যাচ্ছি আমরা। অরন্যর শার্ট দেখলাম আমার দিব্যি ফিট করল। সেটাই পরে আছি এখন!

অরন্য বলল, “দেখ আমাদের নরম্যাল বিহেভ করতে হবে। নাহলে সমস্যা বাড়বে!”

আমি বললাম, “কিন্তু আমি তো এক সপ্তাহের ছুটি তে আছি!”

অরন্য বলল, “উঁহু! ছুটিতে থাকলে কাজ হবে না। আমাদের হাতে এক সপ্তাহও সময় নেই!”

কথাটা ঠিক বলেছে ও। আজ ২৮শে মার্চ। হাতে আর ৫ দিন। এর মধ্যেই যা করার করতে হবে! কিন্তু আমরা দু’জনে কতটুকুই বা করব! আর না করতে পারলে কি হতে পারে সেটা ভাবলেই আমার ঘাম দিয়ে জ্বর আসছে।

আমি বললাম, “একটা কথা বল! অপরাজিতর মত একটা হাউসে তুই কাজ করছিস তা সত্ত্বেও নাগরিকের মত একটা জায়গায় পড়ে আছিস কেন?”

অরন্য হেসে বলল, “কারন অপরাজিত টাকা পয়সা খুব একটা দিতে পারে না। অ্যাডভেঞ্চারের লোভে পড়ে রয়েছি এখানে! আমার সংসার চলে নাগরিকের টাকায়। আর তাছাড়া অপরাজিতর প্রেস কার্ড যেখানে সেখানে বের করা চলবে না।”

–      কেন?

–      কারন অপরাজিতর আসল ফান্ডা টা হল পেছনে থেকে কাজ করবে। সমস্ত গোপন তথ্য সামনে নিয়ে আসবে। কিন্তু নিজে কখনও সামনে আসবে না!

–      মানে এখানে আর কারা কাজ করে? কারা এসব চালায় তুই কিচ্ছু জানিস না?

–      নাহ। জানিনা।

–      তাহলে তুই এখানে কীভাবে এলি? মানে অপরাজিত তে জয়েন করলি কীভাবে?

অরন্য বলল, “সেই গল্প আর একদিন হবে। আপাতত চল। নামতে হবে। অফিস এসে গেছি!”

ওর কথা শেষ হতে না হতেই গাড়ি থামলো! কাল রাত্রে বাড়ি ফিরে অনেকক্ষন আমরা দু’জনেই জেগে ছিলাম।

মাথায় বার বার ঐ ছায়ামূর্তির কথা আসছিল। অরন্যকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি, “কে ছিল ওটা?”

অরন্য বিরক্তিভরা গলায় উত্তর দিয়েছিল, “তুইও যে তিমিরে! আমিও সেই তিমিরে!”

“এই রিভলবার টা তাহলে নকল?” আমি প্রশ্ন করেছিলাম সাথে সাথে।

অরন্য বলেছিল, “একদম ফেক না। চালিয়ে দেখবি?”

–      তাহলে ওই মহিলা যে…

–      ধুর! আমি জানিনা ও কেন বলল! তবে হ্যাঁ এটা চোরাই মাল। এটার কোনো লাইসেন্স নেই।”

আমি বললাম, “What? তুই জানিস এটা বেআইনি?

অরন্য হেসে বলল, “সিরিয়াসলি? এইমাত্র যা সব কাজকর্ম করে এলাম আমরা, তোর মনে হয় সেগুলো…

কথাটা কমপ্লিট করল না ও। আমি আর কিছু বললাম না। ঘরময় পায়চারি করতে লাগলাম। কি করা যায় সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। এই কেসের সাথে যুক্ত একমাত্র মানুষটা মৃত!

অরন্য বলল, “আচ্ছা সৃঞ্জয় দার মৃত্যু টা কতক্ষন আগে হয়েছে বলে মনে হয়?”

আমি বললাম, “আমি কী করে জানব? আমি ডাক্তার নাকি?”

অরন্য বলল, “তাও! নাড়ি দেখে! মানে… Shit! Shit! Shit!”

আমি বললাম, “কী হল?”

অরন্য বলল, “আমরা কেউ সৃঞ্জয় দার পালস চেক করিনি! Shit Shit!”

–      তাতে কী হবে? বোঝাই তো যাচ্ছিল উনি মারা গিয়েছেন!

–      না সোম! বোঝা যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে সাংবাদিকতা হয় না। আমাদেরকে সমস্ত কিছু ক্রস চেক করতে হয়। সমস্ত কিছু। নাহলে ঐ Whatsapp Forward গুলোর সাথে সাংবাদিকতার কোনো তফাৎ থাকবে না কয়েকদিন পর থেকে।

“স্টেডি থাকিস!” অরন্যর কথা শুনে সম্বিৎ ফিরল আমার।

তারপরেই খেয়াল করলাম অফিসের বাইরে পুলিশের গাড়ি! আবার একপ্রস্থ জেরা আসতে চলেছে মনে হচ্ছে! অরন্যর কথায় সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লাম। তখনও ভাবিনি ভেতরে গিয়ে আমার জন্য আর একটা বড় চমক অপেক্ষা করে রয়েছে।

ভেতরে গিয়ে দেখলাম সবাই বাংলার পাঁচ এর মত মুখ করে বসে আছে। চঞ্চল সামনে ছিল, “বললাম কী হয়েছে?”

চঞ্চল বলল, “তোরা শুনিস নি? সৃঞ্জয়দা কে কাল রাত্রে কেউ একটা…” এতটা বলে এদিক ওদিক দেখে চঞ্চল ফিসফিসিয়ে বলল, “কেউ একটা খুন করেছে!”

যতটা সম্ভব অবাক হওয়ার ভান করে জিজ্ঞেস করলাম, “মানে? কী বলছো? কীভাবে হল এসব?”

চঞ্চল ফিসফিসিয়ে বলল, “সেটা তো জানা যায়নি। পুলিশ এসে খবরটা দিল।”

কথাটা বলার পরেই দেখলাম আফসারদার ঘর থেকে বেরিয়ে এল একজন সাদা পোষাকের পুলিশ। তাকে দেখেই খুব বড় একটা শক খেলাম আমি! ইনিই সেই অফিসার যিনি পেনড্রাইভ টা পাওয়ার পর ফোন করে কাউকে একটা জানিয়েছিলেন! যার ভয়ে আমি থানা থেকে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলাম। যে ঘটনার পর আমি এখনও অবধি নিজের ফ্ল্যাটে ফিরতে পারিনি!

আমাকে দেখেই অফিসার হেসে বললেন, “কী মশাই ভালো আছেন তো?”

(চলবে)

তিলোত্তমা ঘূর্নাবর্তে – দ্বিতীয় পর্ব – ১

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি