দরজায় ঠকঠক আওয়াজ শুনেই একটু অবাক হলাম। এত রাতে কী আবার ক্লাবের কেউ এলো? খাবার তো দিয়েই গেছে একটু আগে। তাহলে? কিন্তু এই অচেনা জায়গায় এত রাত্রে হুট করে দরজা খোলা কী ঠিক হবে? পরে মনে হল এখনও বাইরে গান চলছে শোনা যাচ্ছে। ক্লাবেও তার মানে লোক এখনও আছে কিছু হলে একটু জোরে চেঁচাবো না হয়!

এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুললাম। সামনে দাঁড়িয়ে একজন অচেনা ভদ্রলোক। পরনে পাজামা আর পাঞ্জাবি। গায়ে একটা শাল জড়ানো। ইসস! হাইট টা আর একটু বেশী হলে পুরো ফেলুদার মত দেখতে লাগত! বললাম, “কিছু বলবেন?”

ভদ্রলোক বললেন, “আপনিই নির্ঝর বাবু তো?

আমি বললাম, “হ্যাঁ। আমি নির্ঝর গাঙ্গুলী। আপনাকে তো ঠিক…”

ভদ্রলোক হেসে বললেন, “হ্যাঁ আমি জানি আমাকে আপনি চিনবেন না। আপনার সাথে কিছু কথা ছিল। একটু ভেতরে আসতে পারি?”

একটু দোটানায় ছিলাম। অচেনা জায়গায় হঠাৎ করে যাকে তাকে কাউকে ঘরে ঢোকানো ঠিক হবে? তার ওপর এখানে কাউকেই আমি চিনিনা। একটু ক্যুইজের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে এসেছিলাম আজ দুপুরেই। সেটা শেষ হল এই ঘন্টাখানেক আগে। আর তারপরেই এই…

ভদ্রলোক বললেন, “আসলে আপনি আজ বিকেলে ক্যুইজ করালেন তো আমাদের পাড়ায়। ওটা নিয়েই কিছু কথা বলার ছিল আর কি। আমি এই ক্লাবেরই মেম্বার।”

ক্লাবের মেম্বার বলাতে আমি একটু নিশ্চিন্ত হলাম। ক্লাব মানে রঘুনাথপুর কালচারাল ফোরাম। অর্থাৎ যে ক্লাব আমায় এখানে ক্যুইজ সঞ্চালনা করতে নিয়ে এসেছে।

বললাম, “হ্যাঁ। ভেতরে আসুন।”

ভদ্রলোক এসে বসলেন চেয়ারে। এই ঘরটাও ক্লাবের দাক্ষিন্যেই পাওয়া। এখান থেকে কলকাতার যা দূরত্ব তাতে আজ রাতে আমার আর ফেরা হবে না। সেই কারনেই ক্লাব থেকেই পাশের এই বাড়িটা ঠিক করে দিয়েছে।

“ইয়ে… আমার নাম অধিরথ দে।” ভদ্রলোক গলা ঝেড়ে বললেন।

আমি বললাম, “ওহ! আচ্ছা। আপনি ক্যুইজ নিয়ে কিছু বলবেন বলছিলেন…

আমি একটু তাড়ায় ছিলাম। কাল আসলে খুব সকালেই বাস আমার। কাজেই ইনি না গেলে আমার খাওয়া বা ঘুমোনো কোনোটাই হবে না। আর এই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে সকালে ওই একটি বাসই যায় কলকাতা। সুতরাং আমার বাড়ি ফেরার টিকিটও ওই বাস।

অধিরথ বাবু বললেন, “হ্যাঁ। বলছি। তার আগে বলুন তো আপনি কি অনেকদিন থেকেই ক্যুইজ করছেন?”

–      হ্যাঁ। তা প্রায় বছর দশেক তো বটেই। কেন বলুন তো?

–      ইয়ে মানে রেমুনারেশন কীরকম নেন? মানে একটা ধরুন ৩ ঘন্টার কোনো অনুষ্ঠানের জন্য কীরকম টাকা নেন?

এই রে! এটার কী উত্তর দেবো? ক্যুইজ টা তো আমার পেশা নয়। এটা আমার নেশা। পেশায় আমি ডাক্তার। কিন্তু ছোটোবেলা থেকেই ক্যুইজের প্রতি একটা অমোঘ আকর্ষন ছিল আমার। সেই আকর্ষন থেকেই ক্যুইজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন আর তারপর ক্যুইজ পরিচালনা।

আমি বললাম, “কেন হঠাৎ জানতে চাইছেন? মানে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য লাগবে নাকি আপনার?”

অধিরথ বাবু বললেন, “না না। বলুন না। আমার জানাটা প্রয়োজন!”

অগত্যা বলতেই হল ক্যুইজের জন্য আমি কোনো পারিশ্রমিক নিই না!

অধিরথ বাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, “নেন না? আপনি কলকাতা থেকে রঘুনাথপুর চারঘন্টা জার্নি করে এসেছেন ক্যুইজ পরিচালনা করতে অথচ আপনি কোনো টাকা নেন না?”

আমি হেসে বললাম, “না। নিই না। ক্যুইজের প্রতি আমার ভালোবাসাটা এরকমই।”

অধিরথ বাবু কিছুক্ষন চুপ করে রইলেন। আমি বার বার ঘড়ির দিকে দেখছিলাম। ভদ্রলোক কি আরও কিছু বলবেন?

অধিরথ বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর যেটা বললেন তার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না।

উনি বললেন, “আমার ব্যবসাটা কেন খাচ্ছেন?”

প্রশ্নটা শুনে আমি একটু থতমত খেলাম। ব্যবসাটা কেন খাচ্ছেন মানে? আমি কিছু বলার আগেই ভদ্রলোক নিজেই আবার বললেন, “কী লাভ এতে আপনার?”

আমি বললাম, “দেখুন আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি তো লাভ ক্ষতির জন্য ক্যুইজ করি না।”

অধিরথ বাবু বললেন, “হ্যাঁ। কিন্তু আমি তো করি। প্রত্যেক বছর গ্রামের এই মেলায় যে ক্যুইজ হয় সেখানে আমি এতদিন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করে এসেছি। এটা আমার টাকা রোজগারের একটা বড় উপায়। কারন বহু জায়গা থেকে এই মেলায় আসেন বহু মানুষ। এই অনুষ্ঠান তাদের ভালো লাগলে তারা অন্য জায়গাতে আমাকে ডেকে পাঠায় ক্যুইজ পরিচালনার জন্য।”

আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। এসব কী উটকো ঝামেলা রে বাবা!

অধিরথ বাবু বলে চললেন, “আমি ভাবলাম ক্লাব হয়তো অনেক টাকার বিনিময়ে ক্যুইজ করতে কলকাতা থেকে কাউকে এনেছে! কিন্তু আপনার তো এটা পেশা নয়। তাহলে কেন আমার পেশার বারোটা বাজাচ্ছেন?”

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। মাথাটা খুব গরম লাগছে। বললাম, “অধিরথ বাবু, বলছিলাম যে কাল খুব সকালে আমাকে বাস ধরতে হবে। আপনি আজ আসুন। কেমন?”

অধিরথ বাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আমার হাতে একটা কার্ড দিয়ে বললেন এটা আমার কার্ড। যদি কখনও দরকার হয় যোগাযোগ করবেন। কথাটা বলেই উনি বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। কার্ডে দেখলাম লেখা – Adhirath Dey. Quizmaster.

প্রথমে খুব রাগ হচ্ছিল ওঁর ওপর। পরে অধিরথ বাবুর কথাগুলো খুব ভুল মনে হয় নি। সত্যিই তো আমার এটা পেশা না। কাজেই যার এটা পেশা তার ভাত মেরে তো আখেরে আমার কোনো লাভ নেই!

“কেন আমার ব্যবসা টা খাচ্ছেন?” এই কথাটা মাথার মধ্যে ঘুরছিল সারা রাত।

সকালে উঠে বাস ধরে ফিরে গেলাম কলকাতা। এরপর আস্তে আস্তে এই ঘটনার কথা সেভাবে খেয়ালও নেই। অধিরথ বাবু কার্ড তা চেম্বারের টেবিলের ওপরেই এক পাশে রেখে দিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে চোখে পড়লে বেশ মজা লাগে।

ঘটনা ঘটল পরের বছর। সেবার ঠিক একই সময়ে নভেম্বর মাসের শেষের দিকে একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এলো। আমি তখন চেম্বারেই ছিলাম। ধরলাম ফোন।

“হ্যালো”

ও প্রান্ত থেকে আওয়াজ এলো, “হ্যাঁ স্যার। আমরা রঘুনাথপুর কালচারাল ফোরাম থেকে বলছি।”

মনে পড়ল গত বছরের ক্যুইজের কথা। এইভাবেই ফোন করেছিলেন এঁরা। বললাম, “হ্যাঁ বলুন!”

ভদ্রলোক বললেন, “স্যার আগের বছর ক্যুইজ টা কিন্তু আপনি পুরো জমিয়ে দিয়েছিলেন। তাই সবাই চাইছিল এবারের গ্রামের মেলা তেও যদি আপনি আমাদের ক্যুইজ টা করেন।”

ক্যুইজে আমি কখনও না বলি না। অন্তত এর আগে কখনও বলিনি। কিন্তু হঠাৎ অধিরথ বাবুর কথা মনে পড়তেই মনটা কেমন যেন হয়ে গেল।

বললাম, “দেখুন আমি তো এক বছর করলাম। এই বছর ওখানকার স্থানীয় কেউ থাকলে দেখুন না তাকে বলে।”

লোকটি নাছোড়বান্দা। সে বলে, “না স্যার। এখানে সেরকম কেউ নেই ক্যুইজ করার মত। আপনি প্লিজ না বলবেন না!”

আমি বললাম, “কেন? অধিরথ বাবু আছেন না? অধিরথ দে? উনি তো ইনফ্যাক্ট আপনাদের ক্লাবেরও মেম্বার। ওঁকে বলে দেখুন না।”

লোকটি এবার একটু থতমত খেয়ে গেল, “না মানে… আপনি অধিরথ দা কে চিনলেন কীভাবে?”

আমি বললাম, “গত বছর তো উনি এসেছিলেন আমার কাছে। উনিই বললেন। উনি নাকি আগে ক্যুইজ করাতেন ওখানে!”

লোকটি বলল, “আগের বছর? কখন?”

–      ওই তো আপনারা চলে যাওয়ার ঘন্টাখানেক পর। দেখুন আমার মনে হয় আপনাদের এবার ওঁকে দিয়েই করানো উচিত। উনি ওখানকার মানুষ। ভালোই লাগবে ওঁর। For a change এক বছর তো আমি করেই দিলাম। দেখুন না ওঁকে বলে।

লোকটি বলল, “হ্যাঁ স্যার। অধিরথ দা আগে আমাদের মেলায় ক্যুইজ করাতো। খুব খারাপও করাতো না। কিন্তু… আর তো ওকে দিয়ে করানো সম্ভব না স্যার।”

বললাম, “কেন? কী সমস্যা?”

লোকটি বলল, “কারন অধিরথ দা ২ বছর আগে মারা গিয়েছেন।”

–      What? মানে?

লোকটি বলল, “হ্যাঁ স্যার। সেবার স্টেজে ক্যুইজ শেষ করে হঠাৎই মাথা ঘুরে পড়ে যান। আর ওঠেন নি। ডাক্তার বলেছিল হার্ট অ্যাটাক। তারপরের বছরই আমরা আপনার সাথে যোগাযোগ করি।”

আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। গা হাত পা কেমন যেন ঠান্ডা লাগছে।  মারা গেছেন? তাহলে আমার কাছে সেদিন রাত্রে কে এলেন? আর কেনই বা এলেন? আমি কি সেদিন তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম? কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই চোখ গেলো আমার টেবিলের দিকে। এক পাশে যত্ন করে রাখা অধিরথ বাবুর সেই কার্ড। এই এক বছরেও সাদা কার্ডটায় এতটুকু ময়লা জমে নি। যাতে লেখা – Adhirath Dey, Quizmaster.

ক্যুইজ মাস্টার

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি