সকালে ঘুম চোখে উঠেই বাথরুমের বাইরের সুইচগুলোর দিকে চোখ গেলো অরিন্দম এর। গীজারের সুইচ টা অন করা। প্রত্যেক দিন সকালে এই এক জিনিস চলছে। সুলগ্না এখনও ওঠে নি। সুইচ টা বন্ধ করে বাথরুমে ঢুকে গেল ও। কেন যে মেয়েটা এত ভুলে যায় কে জানে! লাস্ট দু’দিনও ও একই জিনিস করেছে! রাত্রে স্নান করে বেরোনোর সময় গীজারের সুইচ টা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছে। বার বার সুলগ্না কে বলেছে ও এটা হতে থাকলে মারাত্মক ইলেকট্রিক বিল আসবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
টালিগঞ্জের এই ফ্ল্যাটে ও আর সুলগ্না খুব সম্প্রতি শিফট করেছে। আসলে সুলগ্নার ট্র্যান্সফারের চাকরি। তাই হঠাৎই যখন ওরা জানতে পারল সুলগ্নার ট্র্যান্সফার হচ্ছে টালিগঞ্জের একটা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে। তাড়াতাড়ি করে ওদের চলে আসতে হয়। তারপরেই টালিগঞ্জের এই ফ্ল্যাট টা ওদের ভাড়া নেওয়া।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে অরিন্দম আবার চলে গেল লেপের তলায়! সুলগ্নারও ঘুম তখন ভেঙেছে। লেপের তলায় শুয়ে শুয়ে ফেসবুক স্ক্রল করছিল ও। অরিন্দম বলল, “এই, তোকে কতবার বলেছি রাত্রে গীজার টা বন্ধ করে শুতে! খেয়াল রাখিস না কেন? পর পর তিনদিন হল এটা!”

সুলগ্না একটু অবাক হয়ে বলল, “গীজার? সে তো বন্ধ করেছি কাল!”
অরিন্দম বলল, “তাহলে রাত্রে কে চালালো শুনি! রাত্রে তো আমি স্নান করি না! তুই করিস! আচ্ছা তোর ঠান্ডা লাগে না। শীতকালে রাত্রে স্নান করতে?”

– না। সেই জন্যেই তো গীজার রয়েছে। কিন্তু এই… আমি কিন্তু কাল রাত্রে বন্ধ করেছিলাম গীজার!
– থাক! আগের দু’দিনও ভুলে গিয়েছিলি কালকেও নিশ্চয় তাই হয়েছে!

সুলগ্না একটু রেগে গিয়ে বলল, “এই বাজে কথা বলিস না। আমি একবারও বলিনি আগের দু’দিন আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম আমার খেয়াল নেই আমি বন্ধ করেছিলাম কিনা। কিন্তু কাল আমার পরিষ্কার মনে আছে আমি বন্ধ করেছি গীজার!”
ঝামেলাটা হয়তো আরও কিছুক্ষন চলত কিন্তু অরিন্দমের একটা ফোন আসাতে কিছুক্ষন থামল সেটা। অরিন্দম ফোন ধরে পাশের ঘরে চলে গেল! মিনিট পাঁচেক পর যখন ফিরল তখন তার মুখে সাফল্যের হাসি!

“কীরে? ক্লায়েন্ট পেলি?” – সুলগ্না জিজ্ঞেস করল।
অরিন্দম এর মুখে হাসি! বলল, “হ্যাঁ!”

যাক একটু নিশ্চিন্ত হল অরিন্দম। আসলে হঠাৎ এখানে শিফট করার পর কীভাবে কাজ আসবে সেই নিয়ে একটু টেনশনে ছিল ও। কিন্তু আজ হঠাৎ একজন পোর্টফোলিও শ্যুটের কথা বলতে ফোন করায় একটু সেই টেনশনটা কাটল ওর।

৮ টা বাজে। সুলগ্না উঠে পড়ল বিছানা থেকে। অরিন্দম ফোন হাতে নিয়ে ইন্সটাগ্রাম টা সবে খুলেছে। হঠাৎ মিনিট দু’য়েক পরেই সুলগ্নার, “এই? গীজার বন্ধ করতে গিয়ে ফ্রীজের সুইচটাও বন্ধ করে দিয়েছিস কেন?”

অরিন্দম উঠে গেল বিছানা থাকে। “কী হয়েছে?” জিজ্ঞেস করল অরিন্দম!
সুলগ্না বলল, “ফ্রীজটা বন্ধ সারা রাত। দুধ যেটা ছিল পুরো নষ্ট হয়ে গেছে! চা বানাবো কী করে? একটু খেয়াল করবি তো!”

– আমি কী খেয়াল করব? আমি বন্ধ করেছি নাকি?
– তুই তো বললি গীজার বন্ধ করেছিস! তখনই করেছিস হয়তো!
– আরে ধুর। গীজার বন্ধ করেছি এই তো ১৫ মিনিট আগে। এইটুকু সময়ে দুধ নষ্ট হয়ে গেল?
সুলগ্না উত্তর দিল না। গজগজ করতে করতে বাথরুমে ঢুকে গেল!
অরিন্দম ভাবলো কী হচ্ছে এসব সকাল সকাল?

                                                              ২

সুলগ্না বেরোলো সাড়ে ৯ টার দিকে। তার আগে অরিন্দম বেরিয়ে দুধের প্যাকেট কিনে এনেছে। ফ্রিজও চালু হয়েছে। অরিন্দম ল্যাপটপে বসে কিছু পুরোনো ফটো এডিট করছিল। ওর নতুন একটা মডেল লাগবে! নতুন জায়গায় নতুন করে প্রোমোশন শুরু করতে হবে। এমনিতেই বিয়ের মরশুম চলছে!
কলিং বেল টা বাজলো তখনই। এই সময় আবার কে এল? চেয়ার টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়ে দরজা খুললো ও। সামনে দাঁড়িয়ে একজন অচেনা মহিলা। পরনে কুর্তি আর জিনস! বয়স ওই ৩০ এর আশে পাশেই হবে! অরিন্দম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাউকে খুঁজছেন?”
মেয়েটি বলল, “আসলে আমি এই উল্টোদিকের ফ্ল্যাটেই থাকি। আপনারা নতুন এসেছেন তাই আলাপ করতে এলাম!”
অরিন্দম বলল, “ওহ আচ্ছা। আসুন। ভেতরে আসুন।”
মেয়েটি ভেতরে এল!
অরিন্দম বলল, “আমার মিসেস কিন্তু এখন অফিসে! ওর সাথে আলাপ করতে হলে সন্ধ্যেবেলা আসতে হবে!”
মেয়েটি বলল, “হ্যাঁ সে নিশ্চয় আসব! আমি শ্রেয়া বাই দা ওয়ে!”
অরিন্দম বলল, “ওহ! আমি অরিন্দম! কফি খাবেন?”
শ্রেয়া বলল, “হ্যাঁ। খেতেই পারি! আপনি বানাবেন?”
অরিন্দম হ্যাঁ বলাতে শ্রেয়া বলল, “ওহ চলুন আমি হেল্প করছি!”
অরিন্দম হেসে বলল, “না না। এক্ষুনি হয়ে যাবে। আপনি বসুন বরং”
শ্রেয়া বসল না। ঘরটা দেখতে লাগল ঘুরে ঘুরে! দেওয়ালে অরিন্দমের তোলা বেশ কয়েকটা মডেলের ফটো ছিল!”
শ্রেয়া জিজ্ঞেস করল, “এই ফটোগুলো কি আপনার তোলা?”
অরিন্দম রান্নাঘর থেকেই উত্তর দিল, “হ্যাঁ”
“বাহ! বেশ ভালো ছবি তোলেন তো আপনি!” বলল শ্রেয়া।
অরিন্দম কফির কাপে চিনি আর কফি নাড়তে নাড়তে বলল, “ থ্যাংক ইউ!”
– তবে আপনার মডেলগুলো আর একটু বেটার হতে পারত!
– কীরকম বলুন তো?
– মানে ধরুন যাকে দেখতে ভালো তার ফিগার অতটা ভালো না! আবার যার ফিগার ভালো তার মুখশ্রীটা আবার খুব ভালো না।
দুধ গরম হচ্ছিল গ্যাসে। অরিন্দম ভাবল এই হচ্ছে কিছু মেয়ের সমস্যা! কোনো মেয়েকেই ওদের সুন্দরী লাগে না! কিন্তু প্রথম আলাপেই তো আর এসব বলা যায় না!
ও বলল, “ওহ! আচ্ছা। দেখি এখানে তো নতুন কিছু শ্যুট করব! ভালো কাউকে পাই কিনা দেখি!”
কফি কাপে কফি নিয়ে বেরিয়ে আসছিল অরিন্দম।
হঠাৎ শ্রেয়া বলল, “আমাকে দিয়ে হবে?”
অরিন্দম অনুমান করেছিল এরকম একটা প্রস্তাব আসতে চলেছে!
কফি কাপ টা টেবিলে রেখে অরিন্দম বলল, “ডিপেন্ড করছে! আমি আপনাকে অ্যাফর্ড করতে যদি পারি তাহলে আপনাকে দিয়ে ভালোই হবে!”
– না না। I am serious. আমি আশা করি আপনার এই মডেলগুলোর থেকে সব দিক দিয়েই বেটার।
অরিন্দম হেসে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে সে হবে না হয়! আপনি কী করেন?”
– আমি আপাতত কিছুই করি না। বাড়িতেই থাকি! Homemaker যাকে বলে!
– ওহ! আর হাসব্যান্ড কী করেন?
– ওই তো সারাদিন অফিস করে। রাত্রে ড্রিংক করে বাড়ি ফেরে তারপর ঘুমিয়ে পড়েন! আবার পরের দিন অফিস!
মেয়েটা হঠাৎ এত সাবলীল ভাবে নিজের বর এর ড্রিংক করার কথাটা বলে দিল, সেটা দেখে একটু থতমত খেল অরিন্দম। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে টপিক চেঞ্জ করে বলল, “তাহলে আপনি কী ধরনের শ্যুটে আগ্রহী?”
শ্রেয়া কফির কাপ টা নামিয়ে রাখল টেবিলে। তারপর বলল, “সব ধরনের! আমার কোনো কিছুতেই কোনো সমস্যা নেই!”
অরিন্দম বলল, “ঠিক আছে! আমি জানাবো আপনাকে! আমাকেও খুব তাড়াতাড়িই শুরু করতে হবে শ্যুটের কাজ।”
শ্রেয়া বলল, “বেশ! আচ্ছা আপনার স্ত্রী কখন ফেরে?”
অরিন্দম বলল, “ও ফিরতে ফিরতে ৭ টা বাজে।”
– ওহ। তার মানে তো শ্যুট না থাকলে সারাদিন আপনি একা!
– হ্যাঁ। ওই আর কি!
শ্রেয়া এবার উঠে পড়ল চেয়ার থেকে তারপর বলল, “ঠিক আছে। এবার থেকে খুব বোর হলে দুপুরের দিকে আপনাকে মাঝে মাঝে জ্বালাতে আসব!”
অরিন্দম হেসে বলল, “নিশ্চয়! অবশ্যই আসবেন!”
শ্রেয়া চলে গেল বিদায় জানিয়ে। অরিন্দমের মনের মধ্যে কেমন যেন একটা খটকা লাগছিল। মেয়েটা একটু কেমন যেন! যেচে যেচে সব বলে গেল! অদ্ভুতরকম ভাবে হাসেও! কে জানে কেন!
                                                              ৩
সুলগ্না ফিরল ৭ টার দিকে! অরিন্দম একটু ঘুমিয়ে গিয়েছিল। সুলগ্না ফিরে দেখল আবার সেই গীজারের সুইচ অন করা! আশ্চর্য! ওকে সকালে বলে এখন আবার নিজেই স্নান করে গীজার বন্ধ করে নি!
ঘরে ঢুকে ও ডাকল অরিন্দম কে! বলল, “কীরে ছাগল! নিজের বেলায় দোষ নেই? গীজার টা কে বন্ধ করবে?”
অরিন্দম এর তখনও ভালো ভাবে তন্দ্রা ভাবটা কাটে নি! ও বলল, “কি? কে?”
– গীজার! গীজার কে বন্ধ করবে?
অরিন্দম বলল, “মানে? আমি চালিয়েছি নাকি?”
সুলগ্না বলল, “তাহলে কী ভূতে এসে স্নান করে গেল?”
অরিন্দম উঠে বসল বিছানায়। বলল, “না। সিরিয়াসলি বলছি। আমি আজ স্নান করিনি ঠান্ডার জন্যে! গীজার চালাবো কেন?”

সুলগ্নার ভুরুটা কুঁচকে গেল! বলল, “ছি ছি! স্নান করিস নি! বিছানায় লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে আছিস! তোর কাছে শোবোই না আজ রাতে আমি!”

অরিন্দম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তারপরেই বেল বাজল হঠাৎ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবার বাজল বেল!

অরিন্দম নামল বিছানা থেকে! শ্রেয়া এল নাকি আবার? সুলগ্না এগিয়ে গেল দরজার দিকে! অরিন্দম বেরোলো ওর পেছনে। এর মাঝে আরও একবার বাজল বেল টা!
দরজা খুলতে দেখা গেল সামনে দাঁড়িয়ে একজন অচেনা ভদ্রলোক। চোখদু’টো লাল! মাতাল নাকি?
লোকটা দরজা খুলতেই এগিয়ে গেল বাড়ির ভেতর! সুলগ্না কে সরিয়ে অরিন্দমের কলার ধরে দেওয়ালে ঠেসে দিয়ে বলল, “তুই? তুই আমার বৌ কে মডেলিং করাবি?”
অরিন্দম বলল, “কী? মানে?”
সুলগ্নাও হঠাৎ এটা দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছে! সম্বিৎ ফিরতেই এগিয়ে গেল ওদের দিকে।
বলল, “কী হচ্ছে কী? কে আপনি?”
লোকটি গর্জে উঠে বলল, “কে আমি? জিজ্ঞেস করুন আপনার স্বামী কে? আমার বৌ এর সাথে কী করেছে!”
অরিন্দম বলল, “কীসব আবোল তাবোল বলছেন? কলারটা ছাড়ুন!”
লোকটি বলল, “শোন, আজ ওয়ার্নিং দিয়ে গেলাম। ওকে মডেলিং করাতে চাস তো? তার আগে তোকেই মডেল বানিয়ে মাটিতে পুঁতে দিয়ে যাবো!”
কথাটা বলে অরিন্দম কে মাটিতে ঠেলে দিয়ে লোকটি সটান বেরিয়ে গেল ফ্ল্যাট থেকে!
সুলগ্না তখন অরিন্দমকে তুলছে!

“কে ছিল ও? ওর বৌটাই বা কে?” সুলগ্না জিজ্ঞেস করল

অরিন্দম একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, “আরে কেউ না! একজন ভদ্রমহিলা দুপুরে আসেন এখানে! বললেন এই ফ্ল্যাট এই থাকবেন আলাপ করবেন। তারপর নিজেই বললেন মডেলিং করবেন! ফাইনাল কোনো কথাও হয় নি! অথচ দ্যাখ কীসব ঝামেলা!”
সুলগ্না বলল, “আমি কালকেই জানাবো বাড়িওয়ালা কে! এসব আবার কী ঝামেলা!”
অরিন্দম উঠে দরজা বন্ধ করতে করতে বলল, “আমার মনে হয় সেটা আমাদের করা উচিত হবে না!”

– কেন?
– দ্যাখ আমরা তো এখানে নতুন শিফট করেছি! এক্ষুনি ঝামেলায় জড়িয়েছি জানলে সমস্যা হতে পারে। বাড়িওয়ালা আমাদের উঠে যেতে বলতে পারে! সেই কারনেই বলছি এক্ষুনি কিছু বলিস না। আর একদিন হোক। তারপর দেখা যাবে!
সুলগ্না ঘাড় নাড়ল। কথাটা ঠিক! এক্ষুনি ফ্ল্যাটে এসেই অন্য লোকজনের সাথে ঝামেলা হওয়াটা কেউই ঠিকভাবে নেবে না।

                                                                 ৪
ডাইনিং এ কথা বলার আওয়াজ পেয়েই ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল সুলগ্নার। এত রাত্রে কে কথা বলছে। পাশে অরিন্দম অঘোরে ঘুমোচ্ছে! ফোনের ঘড়িটা দেখল ও। এখন সবে সাড়ে তিনটে। শীতকাল মানে সকাল হতে এখনও অনেক দেরী। কথার আওয়াজ কিন্তু থামছে না! গাটা একটু ছমছম করে উঠল সুলগ্নার।

লেপ থেকে বেরিয়ে পা টিপে টিপে ডাইনিং এর দিকে এগিয়ে গেল সে। কোত্থেকে যেন একটা ক্ষীন আলোর রেখা আসছে! ডাইনিং এ ও যা দেখল সাথে সাথে বুকের ভেতর টা ধ্বক করে উঠল যেন। একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া সারা গায়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেল! টিভিতে কিছু একটা চলছে ডাইনিং এ। আর সোফাতে বসে একটা ছায়ামূর্তি সেটা দেখছে। তার মাথাটাই শুধু দেখা যাচ্ছে এদিক থেকে!

একটা অস্ফূট চিৎকার বেরোলো সুলগ্নার গলা থেকে! সেই আওয়াজ শুনেই ঘুম ভেঙে গেল অরিন্দম এর। ধড়ফড় করে উঠে দৌড়ে এল ও সুলগ্নার দিকে।
“কী হয়েছে?” জিজ্ঞেস করল অরিন্দম

সুলগ্না কিছু না বলে সোফার দিকে ইঙ্গিত করল। অরিন্দম প্রথম টা চমকে গিয়েছিল সেটা দেখে। তারপর একটু এগিয়ে হাত বাড়িয়ে ডাইনিং এর লাইট টা জ্বালতেই আসল ব্যাপার টা পরিষ্কার হল।

একটা পাশবালিশ এমন ভাবে সোফায় ছিল যে আলো ছায়া তে সেটা অনেকটা মানুষের মাথা মনে হচ্ছিল।

সুলগ্না কিছু ধাতস্থ হয়েছে ততক্ষনে। ও বলল, “কিন্তু টিভি? টিভি কে চালাল?”
অরিন্দম বলল, “আমি! আমিই দেখছিলাম তারপর বন্ধ করতে ভুলে গেছি!”
সুলগ্না বলল, “তুই এত রাত্রে টিভি দেখছিলি?”

– হ্যাঁ রে। আজ তো বার্সেলোনার খেলা ছিল রাত্রে। ওটাই দেখছিলাম সোফায় বসে! সরি রে। বন্ধ করা হয় নি!
সুলগ্না আর কিছু বলল না। এগিয়ে গিয়ে টিভিটা বন্ধ করে দিল! কিন্তু ও খেয়াল করে নি টিভি তে খেলার চ্যানেল চালানো ছিল না।
অরিন্দম মিথ্যে বলছে। সুলগ্না কে শান্ত করার জন্যে। কিন্তু এই ফ্ল্যাটের ব্যাপার টা ওকেও বড্ড ভাবাচ্ছে! প্রত্যেক দিন কী হচ্ছে কী এটা!

                                                                 ৫
পরের দিন দুপুর বারোটা নাগাদ বেলটা বেজে উঠল 2Bর। দরজা খুলল অরিন্দম। শ্রেয়া দাঁড়িয়ে আছে অপরাধীর মত। হাতে একটা টিফিন বক্স! বলল, “ভেতরে আসব?”
অরিন্দম বলল, “আসুন!”

শ্রেয়া এসে টেবিলের ওপর টিফিন বক্সটা রেখে দিয়ে বলল, “I am really sorry. আমি ভাবিনি এরকম কিছু করবে ও। জানলে আমি ওকে বলতামই না!”
অরিন্দম ম্লান হাসি হেসে বলল, “ঠিক আছে কী আর করা যাবে!”

শ্রেয়া বলল, “না প্লিজ এরকম বলবেন না। আমি কিন্তু সত্যিই মডেলিং করতে চাই!”
অরিন্দম বলল, “দেখুন আমরা তো এখানে নতুন শিফট করেছি! এক্ষুনি কোনো একটা ঝামেলায় জড়ানো উচিত হবে না। আপনার স্বামী যদি আবার ঝামেলা করেন তাহলে কিন্তু আমরা বাড়িওয়ালা কেও জানাবো। এবং সেক্ষেত্রে আমাদের এখান থেকে চলে যেতেও হতে পারে! এই ঝামেলাটাই আমি এখন নিতে চাইছি না! কিছু মনে করবেন না!”

শ্রেয়া বলল, “ঠিক আছে! আমি তো আর জোর করতে পারি না। যাই হোক আমার ভুলে প্রায়শ্চিত্ব করতে আমি আজ একটা জিনিস এনেছি আপনার জন্যে। সেটা কিন্তু খেতে হবে আপনাকে। না বললে হবে না!”

অরিন্দম অবাক হয়ে বলল, “কী এনেছেন?”
শ্রেয়া টেবিলথেকে টিফিন বক্স টা নিয়ে তার ঢাকনা খুলে বলল, “এই যে মাটন কষা! খেয়ে দেখুন! খারাপ লাগবে না!”
মাটন কষাতে না বলার মত সংযম অরিন্দমের নেই। টিফিন বক্স থেকে এক পিস মাটন কষা তুলে নিয়ে মুখে দিল।
শ্রেয়া বলল, “খেয়ে বলুন কেমন হয়েছে!”
খারাপ না। তবে কেমন যেন অদ্ভুত একটা গন্ধ! আর একটু শক্ত যেন! কিন্তু এসব কথা বললে খারাপ দেখায়।
“খুব ভালো! Thank you so much” অরিন্দম মাংসটা চেবাতে চেবাতেই উত্তর দিল।
শ্রেয়া বলল, “তাহলে? মডেলিং এর ব্যাপার টা কী ভেবে দেখবেন?”
অরিন্দম হেসে ফেলল এবার! বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে। করব। কাল আসুন। ইন্ডোর কিছু শ্যুট করে নেবো কাল। কাল তো শনিবার! সুলগ্নাও থাকবে! ভালোই হবে। সামান্য যা মেক আপ লাগবে ও করে দেবে!
শ্রেয়া বলল, “এই রে! আপনার বৌ থাকবে? আপনাকে একা পাবো না?”
অরিন্দম চমকে বলল, “অ্যাঁ? মানে?”
শ্রেয়া মুচকি হেসে বলল, “আরে চিল! মজা করছি। চাপ নেবেন না। ভালোই হবে। আলাপ হয়ে যাবে ওর সাথে!”
অরিন্দম হাসল। যেন ও আগে থেকেই বুঝতে পেরেছে শ্রেয়া মজা করছে!
শ্রেয়া বলল, “আমি উঠি এবার! একটু জল খাওয়াবেন?”
অরিন্দম বলল, “হ্যাঁ নিশ্চয়!”
বোতলে জল ছিল না। অরিন্দম রান্নাঘরের ফিল্টার থেকে জল ভরে এনে দিল! জল খেয়ে চলে গেল শ্রেয়া! বলে গেল কাল দুপুরের ১২ টার দিকেই আসবে। অরিন্দম মাটন কষাটা তুলে রাখল ফ্রীজে!

                                                                ৬
“এটা কার চুল রে?” প্রশ্নটা করেছে সুলগ্না। ও সোফাতে বসে। অরিন্দম সবে বসে টিভিটা চালিয়েছিল!
প্রশ্নটা শুনে ওর দিকে তাকাল সে। সুলগ্নার হাতে একটা লম্বা চুল! অরিন্দম চুলটা দেখেই বুঝতে পেরেছে ওটা কার! কিন্তু না বোঝার ভান করে বলল, “তোরই হবে! অত বড় চুল কার আর হবে?”
সুলগ্না বলল, “চুলটায় হাইলাইট করা। আমার চুলে তো হাইলাইট নেই!”
অরিন্দম বলল, “তাহলে বোধহয় শ্রেয়ার হবে! ও এসেছিল আজ সরি বলতে!”
– সরি বলতে এসে চুল ফেলে গেল সোফাতে?
– আশ্চর্য! আমি কি জানি! ও মাটন কষা নিয়ে এসেছিল। ফ্রীজে রাখা আছে। বলল ওর স্বামী ওরকম করবে ভাবে নি… আমরা যেন কিছু মনে না করি!
– তাতে চুল এর কী হল? চুলটা কেন ফেলে গেল সোফাতে? সোফাতে বসেছিল?
অরিন্দম কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল! তারপর একটু থেমে বলল, “না। ও তো চেয়ারে বসেছিল। টেবিলে রেখেছিল টিফিন বক্সটা!”
– তাহলে?
– হাওয়াতে উড়ে যেতে পারে কী?
– না পারে না। এখন শীতকাল। ফ্যান চললেও আলাদা কথা ছিল।
তাহলে কীভাবে? সোফা থেকে চেয়ারের দূরত্ব অনেকটাই! কোনোভাবেই চুল যাওয়ার কথা না!

সুলগ্না বলল, “অরিন্দম তুই কী আমার কাছে কিছু লুকোচ্ছিস?”
অরিন্দম অবাক হয়ে বলল, “মানে? কী লুকোবো? ও কাল আসবে শ্যুটে! জিজ্ঞেস করে নিস যা জিজ্ঞেস করার!”

– What? তুই ওর শ্যুট করবি?
– হ্যাঁ। কেন করব না!
– ওর বর কাল কী বলে গেল মনে নেই?
– তো কী? শ্রেয়া কি বাচ্চা নাকি? ও মডেলিং করতে চাইছে। তাতে ওর বর বাধা দেওয়ার কে?
– লোকের বৌ এর ফটো তোলার এত শখ কে তোর?
– কী বললি?

সুলগ্না থেমে গেল! এটা বাড়াবাড়ি হল। এই কথাটা বলা ঠিক হয় নি ওর!
অরিন্দম আবার বলল, “কী বললি? আর একবার বল?”
সুলগ্না সোফা থেকে উঠে চলে গেল বেডরুমে!

ঘটনা টা ঘটল আর একটু রাতে! তখন প্রায় ১২ টা। অরিন্দম আজ সোফাতেই শুয়েছে লেপ গায়ে দিয়ে। বেডরুমে যায় নি! সুলগ্না রয়েছে বেডরুমে।

দরজায় খুব আস্তে করে কে যেন টোকা দিল! অরিন্দমের একবার মনে হল তার কান বাজছে হয়তো! তারপর আবার কয়েক সেকেন্ড পর খুব মৃদু টোকা! অরিন্দমের ভয় লাগছিল। আবার শ্রেয়ার বর এল নাকি? জানতে পেরেছে নাকি কাল শ্যুট বলে! সোফা থেকে উঠে পিপ হোল দিয়ে একবার দেখল অরিন্দম! বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার! হঠাৎই খুব সামনে দু’টো সবুজ চোখ চোখে পড়তেই হাড় হিম হয়ে গেল অরিন্দমের। সাথে সাথে দু’পা পিছিয়ে এল ও।

দরজায় টোকা তখনও পড়ছে! ও পিছিয়ে এসে বসে পড়ল সোফায়!
অরিন্দম এই যুগের ছেলে। ভূত এর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। কিন্তু একটার পর একটা যা ঘটছে সেগুলোর কীই বা যুক্তিসম্মত বিশ্লেষন রয়েছে? ওই সবুজ চোখদু’টো ওগুলো কীসের! দরজার একদম কাছে ওটা কী ছিল!

                                                                ৭
পরের দিন বেল বাজল সকাল সাড়ে ১০ টা। কাল অনেক রাতে ঘুমিয়েছে অরিন্দম। তাই আজ সকালে আর ঘুম ভাঙেনি। বেলের আওয়াজ শুনে সুলগ্না এসে দরজা খুলল।
দরজার বাইরে ছিল একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। দরজা খোলার পর বললেন, “কথাটা আমি বিশ্বাস করিনি! তাই নিজের চোখে দেখতে এলাম!”
সুলগ্না বলল, “কে বলুন তো আপনি?”

ভদ্রলোক বললেন, “একজন পরোপকারী মানুষ। তা মা তোমরা অন্য কোনো ফ্ল্যাট পেলে না?”
অরিন্দম এবার উঠে বসেছে সোফায়। সুলগ্না বলল, “আপনি কী কাউকে খুঁজছেন?”
ভদ্রলোক বললেন, “তোমাদের আজ কততম দিন? এই ফ্ল্যাটে?”
– পাঁচ দিন হল। কেন বলুন তো?
– যাক! কেউ যে এখনও খুনোখুনি করে ফেলোনি তোমাদের ভাগ্য ভালো!
অরিন্দম বলল, “মানে?”
ভদ্রলোক বললেন, “তোমরা বড় কিছু হয়ে যাওয়ার আগে যত তাড়াতাড়ি পারো এই ফ্ল্যাট টা ছেড়ে দাও!”
সুলগ্না বলল, “কী হয়েছে একটু বলবেন? আপনি ভেতরে আসুন না!”
ভদ্রলোক বললেন, “পাগল নাকি? এই ফ্ল্যাটে আমি পা দিচ্ছি না!”
অরিন্দম বলল, “এই ফ্ল্যাট টা কি ভূতুড়ে? মানে কোনো অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে এরকম কোনো গল্প রয়েছে কী?”
সুলগ্না একটু রাগী চোখে তাকাল অরিন্দমের দিকে!
ভদ্রলোক বললেন, “অতৃপ্ত কিনা বলতে পারব না। তবে এই ফ্ল্যাটে মানুষ এলে তারা যে বেশ তৃপ্ত হয় সেটা বোঝা যায়!”
– তারা কারা?
ভদ্রলোক বললেন, “কেন? কেউ তোমাদের মাটন কষা খাওয়ায় নি?”
কথাটা শুনেই চমকে উঠল অরিন্দম। বলল, “আপনি সেটা… মানে…
ভদ্রলোক হেসে বললেন, “এইটাই তো হয়। যারা আসে সবাইকেই সে খাওয়ায়! তবে জিনিসটা মাটন না মানুষ সেইটাই বোঝা দায়!”
“What?” চেঁচিয়ে উঠল অরিন্দম।
ভদ্রলোক বললেন, “শোনো এখন অত কিছু বলার সময় নেই। এখানে যারাই এসেছে পাগল হয়ে গেছে। নিজেদের মধ্যে খুন খারাপি করেছে! সেটা হওয়ার আগে ফ্ল্যাট টা ছেড়ে দাও।”
সুলগ্না বলল, “কী হয়েছে একটু বলবেন প্লিজ?”

ভদ্রলোক বলল, “এই ফ্ল্যাটের মেয়েটির ওপর ওর বর অত্যাচার করত খুব। রাত্রে মদ খেয়ে এসে চলত অকথ্য অত্যাচার! শেষে একদিন থাকতে না পেরে মেয়েটি নিজের বর কে মেরে তাকে কেটে সেই মাংস রান্না করে সব ফ্ল্যাটে দিয়ে এসেছিল মাটন কষা বলে! তারপর সে নিজেও আত্মহত্যা করে! একে একে সবাই এই ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেছে তারপর! থাকতে পারে নি।”

অরিন্দম সোফায় বসে পড়ল। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম এই শীতেও। ও কাল তাহলে কিসের মাংস খেল?এই কারনেই কি সেই অদ্ভুত গন্ধ!
সুলগ্না বলল, “আর এই ফ্ল্যাটে লোক আসে নি পরে?”

ভদ্রলোক বললেন, “এসেছিল তো। বেশ কয়েকটা পরিবার এসেছে। কিন্তু পরিনতি ওই একটাই। স্বামী স্ত্রীর ঝামেলা! তারপর কেউ না কেউ খুন করছে অপরজন কে! যাই হোক অনেকক্ষন হল এসেছি। আর বেশীক্ষন থাকলে বিপদ। আমি যাই!”

কথাটা বলেই ওদের আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেলেন ভদ্রলোক!
দরজা বন্ধ করতে করতে সুলগ্না হেসে ফেলল। বলল, “যত সব রাবিশ!”
অরিন্দম বলল, “নাহ। আমারও মনে হচ্ছে কিছু একটা ব্যাপার তো আছেই! গীজারের সুইচ। ফ্রীজের সুইচ। দরজায় ধাক্কা! It’s not normal!”
সুলগ্না বলল, “দরজায় ধাক্কা মানে?”
অরিন্দম কাল রাত্রের ব্যাপার বলাতে সুলগ্না বলল, “সে হয়তো তোর শ্রেয়া এসেছিল ফটোশ্যুটের জন্য!”
– অত রাত্রে?
– হ্যাঁ। একা কিছু দেখাতে চেয়েছিল হয়তো!
– বাজে কথা বলিস না সুলগ্না!
সুলগ্না বলল, “ও গায়ে লাগছে বুঝি?”
অরিন্দম বলল, “কেন এসব বলছিস? ফ্ল্যাট চেঞ্জ করি চল না!”
– কেন রে? শখ মিটে গেল? শ্রেয়াকে আর দরকার নেই?
অরিন্দম বুঝতে পারল না সুলগ্না হঠাৎ এত উত্তেজিত কেন হয়ে যাচ্ছে! এরকম তো ও করে না। চেষ্টা করেও নিজেকে সামলাতে পারল না অরিন্দম।
ও বলল, “একটা ফালতু কথা বলবি না! বের করে দেব ফ্ল্যাট থেকে!”
সুলগ্না চেঁচিয়ে বলল, “তুই আমায় বের করবি ফ্ল্যাট থেকে? নিজে কত টাকা রোজগার করিস রে? আমি চাকরি না করলে তো খেতেও পেতিস না?”

অরিন্দম বলল, “তুই পাগল? পাগল হয়ে গেছিস নাকি? এসব কী বলছিস?
সুলগ্না বলল, “ঠিক বলছি! আবার বলব! শালা বেকার! দুশ্চরিত্র ছেলে একটা। ফটো তোলার নাম করে…

অরিন্দম সুলগ্না কে শান্ত করতে এগিয়ে গেল ওর দিকে। ও খেয়ালই করল না উত্তেজিত অবস্থায় সুলগ্নার হাত তখন গেছে টেবিলে রাখা বড় সবজি কাটার ছুরিতে। শক্ত হাতে ছুরিটা ধরে সুলগ্না হাতটা এগিয়ে দিল সামনের দিকে। তুলো ভরা বালিশ ফাটলে যেরকম আওয়াজ হয় সেরকম একটা আওয়াজ তার সাথে একটা অস্ফূট চিৎকার চাপা পড়ে গেল বেলের আওয়াজে! ১২ টা বাজে! শ্রেয়া ফটোশ্যুটের জন্য এল কী?

ফ্ল্যাট নং 2B

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি