“এই এটা কী হল? এটা কী করলেন আপনি?”
ভীড় মেট্রোতে দাঁড়িয়েছিলাম বাঁদিকের গেটের কাছে। হঠাৎ পেছন থেকে আওয়াজ শুনে ফিরে তাকালাম। একটি ছেলে প্রশ্নটা করেছে আমাকে। হাতের ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আমাকে বলছেন?”
ছেলেটি আরও জোরে চেঁচিয়ে বলল, “হ্যাঁ আপনাকেই তো। কি ভেবেছেন কি আপনি?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কি হয়েছে একটু বলবেন? আপনাকে তো আমি ঠিক চিনতে পারছি না। আপনি কি টাকা পান আমার থেকে?”
“একদম ফালতু বকবেন না” ছেলেটি বলল, “আপনি… আপনি আমার গার্লফ্রেন্ডের ফটোতে লাভ রিয়্যাক্ট করলেন কেন?”
“অ্যাঁ? কে আপনার গার্লফ্রেন্ড? আমি কখন তার ফটোতে লাভ রিয়্যাক্ট করলাম?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
– “এইমাত্র করলেন তো! প্রথমে ফটোটা ভালো করে দেখলেন ওপর নীচ। তারপর করলেন লাভ রিয়্যাক্ট। ফোন টা বার করুন দেখাচ্ছি”
এবার আমার মনে পড়ল। একটু আগেই ফোনটা নিয়ে ফেসবুক টা স্ক্রল করছিলাম। তখন আমার প্রোফাইলে থাকা একটি মেয়ের ফটোতে লাভ রিয়্যাক্ট করেছি। কিন্তু সে তো আমার প্রোফাইলে বহুদিন আছে। এই চাঁদবদন টা তার বয়ফ্রেন্ড আগে তো দেখিনি কখনও।
বললাম, “দেখুন, আমি আমার ফোনে কার ফটোতে লাভ রিয়্যাক্ট দেবো সেটা কি আপনি ঠিক করে দেবেন? যান যান! বিরক্ত করবেন না!”
ছেলেটি বলল, “অবশ্যই আমি ঠিক করে দেবো না। কিন্তু আমার গার্লফ্রেন্ড কে আপনি বাজে নজরে দেখবেন আর সেটা আমি মেনে নেবো ভেবেছেন?”
আমার এবার বিরক্ত লাগছিল। আশে পাশের লোকগুলো কেমন অদ্ভুতভাবে দেখছে আমাদের দিকে। আমি বললাম, “নোংরা নজরে কোথায় দেখলাম? ফেসবুকে ফটো দিয়েছে তাই দেখছিলাম।”
– বাজে কথা বলবেন না। আমি দেখেছি। আপনি মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখলেন। তারপর লাভ রিয়্যাক্ট দিলেন।
“এই চলুন ফুটুন তো!” কথাটা বলেই মেট্রো থেকে নেমে যাচ্ছিলাম শ্যামবাজারে। ছেলেটি হঠাৎ পেছন থেকে খামচে ধরল আমার জামার কলার টা। পেছনে ফেরার আগেই আমাকে ঠেলে দিল ছেলেটি। তারপর নিজেও বেরিয়ে এল মেট্রো থেকে।
আমি বললাম, “আপনার মাথায় কি ছিট আছে নাকি দাদা?”
“এই তোদের মত কুকুরগুলোর জন্য আমার গার্লফ্রেন্ড ঠিক থাকতে পারে না।” বলে উঠল ছেলেটি, “তোরা লাভ রিয়্যাক্ট দিয়ে মেসেজ করে করে ওকে দুর্বল করে দিস। তার জন্য ও বাধ্য হয় অন্য ছেলেদের সাথে…
বুঝলাম একটা অদ্ভুত পাগলের পাল্লায় পড়েছি যার গার্লফ্রেন্ড আবার একাধিক মানুষজনের সাথে ইন্টুপিন্টু করে বেড়ায়। সুতরাং ইন্সিকিওর টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি!
ঝামেলা করে লাভ নেই বুঝে বললাম, “দেখুন দাদা কিছু মনে করবেন না। আমি আপনার গার্লফ্রেন্ডের ফটো আনলাইক করে দিচ্ছি। কেমন?”
ছেলেটি বলল, “আনলাইক আর করে কী হবে? যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। শালা শুয়রের…
বাকিটা আর লিখছিনা। সেন্সর হয়ে যাবে। তবে এই কথাটা বলার পরেই পেছনে একটা ভারী গলার আওয়াজ শুনলাম।
“কী হচ্ছে কী এখানে? মারামারি করছো কেন?”
কথাটা শুনে তাকিয়ে দেখলাম একজন মোটা করে পুলিশ এগিয়ে এসেছে আমাদের দিকে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক এবার তো মুক্তি পাবো এই পাগলের হাত থেকে।
বললাম, “দেখুন না দাদা, তখন থেকে বিরক্ত করছে আমায়!”
পুলিশ টা আমার দিকে দেখে বলল, “আপনি অতটাও সুন্দরী না যে আপনাকে লোকে বিরক্ত করবে!” তারপর সেই ছেলেটিকে বলল, “কি হয়েছে ভাই? কি সমস্যা?”
ছেলেটি বলল, “আরে দেখুন না ওই ছেলেটি মেট্রোয় আপনার গার্লফ্রেন্ডের দিকে নোংরাভাবে দেখছিল। তারপর আবার তার ফটোতে লাভ রিয়্যাক্ট করেছে।”
আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম। পুলিশটি আমায় থামিয়ে বলল, “কোথায় তোমার গার্লফ্রেন্ড?”
ছেলেটি বলল, “সে তো আজ আমার সাথে নেই!”
পুলিশটির ভুরু এবার কুঁচকে গেছে। উনি বললেন, “তাহলে বাজে ভাবে তাকালো কীভাবে?”
– ফোনে স্যার। ফোনে আমার গার্লফ্রেন্ড কে বাজে ভাবে দেখছিল ও।
আমি বললাম, “দেখুন ওনার গার্লফ্রেন্ড আমার ফেসবুক প্রোফাইলে আছেন। উনি একজন মডেল। নিজের ফটো ফেসবুকে দিয়েছেন আর আমি তাতে লাভ রিয়্যাক্ট করেছি। ব্যাস! ওতেই উনি খেপে গেছেন!”
পুলিশ মুখে একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে বলল, “তোমরা সব আজকালকার ছেলেরা এক একটা জিনিস বটে! ফেসবুক, মেয়েছেলে ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারো না! আমার ছেলেও তোমাদের বয়সী। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে অর্জুন এখন একটা অনাথ আশ্রমে বাচ্চাদের পড়ায়।”
আমি বললাম, “দেখুন…
“দাঁড়াও!” পুলিশ অফিসারটি আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল, “আমার কথা এখনও শেষ হয় নি! আমি আমার ছেলেকে বলে দিয়েছি। ওকে চাকরি করতে হবে না। ও শুধু ভালো মানুষ হোক। তুমি জানো ওর কোনো ফেসবুক প্রোফাইল নেই। কোনো মেয়েবন্ধু নেই! আর তোমরা? ছি!”
আমি বললাম, “দেখুন আমি আসছি! এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে!”
ছেলেটি বলল, “যাবি মানে? তুই সন্দীপ্তার ফটোতে লাভ রিয়্যাক্ট করেছিস! ওর দিকে বাজে ভাবে তাকিয়েছিস? তোকে আমি ছাড়ব না!”
আমি বললাম, “আপনি ডাক্তার দেখান দাদা! আপনার সমস্যা আছে!”
ছেলেটি এবার পুলিশ কে বলল, “স্যার! এর একটা বিচার করুন প্লিজ! নাহলে সবাই এরকম অসভ্যতামো করে ছাড় পেয়ে যাবে!”
পুলিশটি এবার আমাকে বলল, “এই ছেলে! সরি বল তুই একে! আর ইয়ে… ওর গার্লফ্রেন্ডকে ইয়ে কর… কি যেন বলে… ডিসফ্রেন্ড কর ফেসবুকে।”
ছেলেটি পাশ থেকে বলল, “আনফ্রেন্ড!”
বাবা ছোটোবেলা থেকেই বলত আমি নাকি খুব হারামি। ওই সময় মেয়েটিকে আনফ্রেন্ড করে দিলেই ঝামেলাটা মিটে যেত হয়তো। কিন্তু না… আমি তো তা করব না।
আমি এই সময় বলে উঠলাম, “মেয়েটি যে ওর গার্লফ্রেন্ড তার প্রমান কী?”
“মানে?” ছেলেটি গর্জে উঠল, “আমি মিথ্যে কথা বলছি?”
আমি বললাম, “সত্যির উল্টোটা তো মিথ্যেই হয় মগনলালজী”
“আমার নাম মলয়” ছেলেটি বলল।
আমি বললাম, “সে যাই হোক! হতেই পারে মেয়েটি ওর চেনা। কিন্তু গার্লফ্রেন্ড কিনা তার কোনো প্রমান তো নেই! আছে?”
মলয় বলল, “না। সন্দীপ্তা ফটো তোলা পছন্দ করে না।”
আমি বললাম, “তাই নাকি? উনি তো মডেল! উনি ফটো তোলা পছন্দ করেন না?”
– না। ওর ফ্যামিলির অনেকে ফেসবুকে আছে। ওরা দেখলে চাপ হবে!
আমি বললাম, “বিশ্বাস করি না। উপযুক্ত প্রমান ছাড়া আমাদের কাউকেই বিশ্বাস করা উচিত নয়। তাই না স্যার?”
পুলিশ অফিসারটি নিজের ফোনে কি একটা দেখছিলেন। আমার কথা শুনে গলা ঝেড়ে বললেন, “তা তো ঠিকই।”
ছেলেটি বলল, “ঠিক আছে। চলুন তাহলে সন্দীপ্তার ফ্ল্যাটে। এই মেট্রোর পাশেই থাকে।”
আমি বললাম, “পারলাম না। আপনি যান। আমার অত টাইম নেই।”
মলয় বলল, “স্যার। উনিই তো প্রমান চাইলেন। তাহলে এখন চলে গেলে কী করে হবে?”
পুলিশটি বলল, “না হবে না। অ্যাই ছেলে! চলো প্রমান নিয়ে আসি! তারপর তোমার বিচার হবে!”
আমি মনে মনে নিজের ভাগ্যের বাপ বাপান্ত করতে করতে রাজি হলাম ওদের সাথে যেতে। কি কুক্ষনে যে আজ অফিস থেকে ফেরার সময় মেট্রোতে উঠেছিলাম কে জানে!
মেট্রোর পাশেই একটা গলি রয়েছে। আমরা তিনজন বেরিয়ে ওই গলিতে পা দেওয়ার পরেই একটা ফোন এল পুলিশ অফিসারটির ফোনে,
– হ্যাঁ বাবু বল।
– …
– ও পৌঁছে গেছিস?
– …
– আচ্ছা। খুব ভালো। পড়া ভালো করে। পড়ানো হলে ফোন করিস।
– …
অফিসারটি ফোন রেখে আমাদের বললেন, “এই ভর সন্ধ্যেবেলা আমাকে কে কার গার্লফ্রেন্ড দেখতে যেতে হচ্ছে তোমাদের সাথে। আর আমার বাবু অনাথ আশ্রমে বাচ্চাদের পড়াচ্ছে! লজ্জা হয় আমার আজকালকার ইয়ং ছেলেদের দেখলে!”
কেউ কোনো উত্তর দিলাম না। একটু পর একটা সাদা ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে গিয়ে মলয় ছেলেটি বলল দোতলায় থাকে সন্দীপ্তা। তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, “এবার বিশ্বাস হল?”
পুলিশটিও তাকালো আমার দিকে। আমি বললাম, “আমিও বলতে পারি আমার কাকিমা থাকে এই ফ্ল্যাটের চারতলায়। তাহলেই কি বিশ্বাস করে নেবেন আপনারা?”
মলয় বলল, “ঠিক আছে চলুন ওপরে।” তারপর পকেট থেকে দু’টো চাবি বের করে বলল, “এই যে সন্দীপ্তার বাড়ির চাবি। আমার কাছে দেওয়া আছে এক সেট। চলুন দেখাচ্ছি।”
আমার এবার একটু ভয় ভয় লাগছিল। এই পুলিশ আর মলয় ছেলেটি দুজনেরই মাথায় মনে হয় ছিট আছে। যদি সত্যিই দেখা যায় মেয়েটি এর গার্লফ্রেন্ড তাহলে বাড়ি ফিরতে দেবে তো?
দোতলায় উঠে পকেট থেকে চাবি বের করে মলয় দরজা খুলতে যেতেই আমি বললাম, “আমি বললাম ঠিক আছে। থাক। বিশ্বাস করলাম আমি।”
মলয় বলল, “না না। ওসব হবে না চাঁদু। হাতে নাতে প্রমান দিয়ে তবেই আমি ছাড়ব তোমায়”
কথাটা বলেই গোদরেজের লকে চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিতেই খুলে গেল দরজা। এই লকগুলো বেশ ভালো। দু’দিক দিয়েই খোলা যায় চাবি থাকলে। আলাদা করে তালা দিতে হয় না!
দরজা খোলার পরেই যেটা দেখলাম সেটা একেবারেই এক্সপেক্ট করিনি দেখবো বলে। ডাইনিং এ সোফায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় আধশোয়া হয়ে আছে একটি ছেলে এবং মেয়ে। দু’জনের ঠোঁট একে অপরের ঠোঁটে। ব্যারিকেড বানাচ্ছে বোধহয়। মেয়েটিকে আমি চিনি। সন্দীপ্তা।
“OH MY GOD! এটা কী করছ তুমি?” খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠেছে মলয়।
গলা শুনেই চমকে উঠে মেয়েটি তাকালো আমাদের দিকে। তারপরেই চাদরটা টেনে ঢাকা দিল নিজের শরীর। ছেলেটিও চমকে গিয়েছে চিৎকার শুনে।
এদিকে তখন আর একটা চিৎকার আমার মাথায় এসেছে। যেটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত! আমাদের সাথের পুলিশ অফিসারটি তখন চেঁচিয়ে উঠেছেন, “বা-বা-বাবুউউ? তুইইই???”
এই মার গেড়েছে। অনাথ আশ্রমের নাম করে এর বাবু তাহলে এখানে অনাথসেবা করত? এক পা এক পা করে পিছিয়ে এলাম আমি। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নীচে দিলাম দৌড়। অনেক প্রমান পেয়েছি। আর না। এরপর যা যা ঘটবে সেটা কাল পেপারে পড়ে নেব না হয়! আপাতত চাচা আপন প্রান বাঁচা মোড অন।
