“আপনি কি দমদম যাচ্ছেন?”
পেছন থেকে অচেনা গলার আওয়াজে বাইক থামালাম। এই পাড়ায় তো আমাকে কারুর চেনার কথা নয়। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম একটি মেয়ে আমার দিকে খুব স্পীডে হেঁটে আসছে। পরনে জিন্স আর কালো কুর্তি। বাইক টা স্টার্ট দিয়ে চলে যাবো কিনা ভাবছি।
মেয়েটি কাছে এসে আবার জিজ্ঞেস করল, “দমদম যাচ্ছেন আপনি?”

জিজ্ঞেস করলাম, “কেন বলুন তো?”

মেয়েটি বলল, “আসলে আমায় আজ ১ টা ২০ র মেট্রোটা ধরতেই হবে। নাহলে খুব অসুবিধেয় পড়ে যাব। তাই বলছিলাম যদি আপনি দমদম যান, আমায় কি একটু নামিয়ে দিতে পারবেন?”

এদিক ওদিক তাকালাম সন্দিগ্ধ চোখে। ব্যাপারটা কী ঠিক হবে? তারপর আমতা আমতা করে বললাম, “না মানে, আসলে…

মেয়েটি বলল, “ওহ আচ্ছা। ঠিক আছে। চাপ নেই। আমি দেখছি অটো পাই কিনা”

কথাটা বলেই আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মেয়েটি এগিয়ে গেল সামনের দিকে। বুঝতেই পারলাম বড্ড তাড়া রয়েছে। পেছনের দিকে তাকালাম একবার। নাহ! কেউ কোথাও নেই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলাম বাইক নিয়ে। মেয়েটির পাশে গিয়ে বাইক থামিয়ে বললাম, “উঠে পড়ুন।”

মেয়েটি অবাক হল একটু। বলল, “সিরিয়াসলি?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ। উঠুন উঠুন। নাহলে দেরী হয়ে যাবে।”

মেয়েটি আর কোনো কথা না বলে উঠে পড়ল বাইকে। আমি বাইক স্টার্ট দিলাম।

ওখান থেকে দমদম বেশীক্ষনের রাস্তা নয়। মিনিট দশেক লাগে বাইকে। প্রথমটায় কেউ কারুর সাথে কথা বলছিলাম না। একটু পরে মেয়েটি নিজেই বলল, “আমার নাম চান্দ্রেয়ী”

বুঝলাম এবার আমার নাম বলার পালা। গলাটা একটু ঝেড়ে বললাম, “ওহ! আমার নাম অরিজিৎ”

চান্দ্রেয়ী নামের মেয়েটি এবার বলল, “Thank You আপনাকে। আমাকে আজ পৌঁছে দেওয়ার জন্য। নাহলে খুব ঝামেলায় পড়তাম। আসলে আমি পরপর তিনদিন লেট করেছি অফিসে। বস বলেছে আর একদিন হলেই Step নেবে। তাই আসলে…”

আমি বললাম, “এই দুপুরবেলা অফিস?”
চান্দ্রেয়ী বলল, “কল সেন্টার তো! আমার ২ টো থেকে শিফট!”

– “আচ্ছা আচ্ছা!”

আমি এবার একটু চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলাম, “একটা কথা জিজ্ঞেস করছি কিছু মনে করবেন না”
– না না… বলুন না…
– রোজ লেট হচ্ছে কেন আপনার?
– আসলে বাবার শরীর টা ভালো যাচ্ছে না। রোজই কিছু না কিছু লেগে আছে। সেই কারণেই আর কি!
– ওহ।

চান্দ্রেয়ী এবার জিজ্ঞেস করল, “আপনি কী করেন?”
আমি কী করি? এই রে! অনেক কিছুই তো করি। কি বলা যায়!

বললাম, “টিউশন পড়াই। Math এর। আর ওই চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছি.।”

চান্দ্রেয়ী বলল, “বাবাহ! Math! বাপরে! শুনলেই ভয় লাগে।”

আমি হাসলাম। এই তো দমদম এসে গিয়েছি।

স্টেশনের বাইরে বাইক থামাতেই নেমে গেল চান্দ্রেয়ী। তারপর আমাকে বলল, “Thank You so much. আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেবো!”

আমি বললাম, “আরে না না! Its Okay.”

চান্দ্রেয়ী বলল, “না না। সিরিয়াসলি বলছি। আজকালকার দিনে এরকম হেল্প কেউ করে না।”

আমি হাসলাম। বললাম, “ঠিক আছে। আসি আমি।”

চান্দ্রেয়ী বলল, “হ্যাঁ। Sure. আপনি বোধহয় আমার পাড়াতেই থাকেন। আর একদিন দেখা হলে কথা হবে। আমিও যাই আজ। মেট্রো মিস করলে চলবে না।”

“হ্যাঁ একদম!” বললাম আমি।

চান্দ্রেয়ী এগিয়ে গেল স্টেশনের দিকে। আমি ওর চলে যাওয়া দেখছিলাম। ওর সাথে আর দেখা হবে না জানি। হঠাৎ টনক নড়ল। দেরী হয়ে যাচ্ছে।
ঘড়িতে দেখলাম ১ টা ১৮ বাজে। আমাকে কোথায় যেন যেতে হবে মনে করার চেষ্টা করলাম। দমদম তো আসার কথা ছিল না আমার।

ও হ্যাঁ। ভজহরি দার গ্যারেজে যেতে হবে। আজ একটু লেট হয়ে গেল। রোজ দুপুরে বাইক চুরি করার পর ওর দোকানেই যাই আমি। ও পার্টস গুলো আলাদা করে দেয় বাইকের। তারপর ওগুলো বেচে যা দাম হয় তার অর্ধেক পাই আমি।

বাইক স্টার্ট দিলাম। ভজহরিদার দোকানে বাইক দিয়েই আবার বাড়ি যেতে হবে সাথে সাথে। ২টোর ব্যাচ টা পড়তে চলে আসবে।

জীবন যুদ্ধ

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি