অর্ণব মন্ডল

সেপ্টেম্বর মাস। সেদিন দুপুরে নিজের অফিসে বসে কিছু লেখা পড়ছিলাম। হঠাৎ অমিয় এসে হাজির। অমিয় আমার বন্ধু। অমিয় রায়চৌধুরী। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। আমি তো ওকে ওই সময় দেখে অবাক। এটা ওর চেম্বারে থাকার সময়। বললাম, “কি রে তুই এই সময়? চেম্বার ছেড়ে?”
ও হেসে বলল, “তোকে একটা জিনিস দিতে এলাম।
আমি বললাম, “কি জিনিস?”
তুই কদিন আগে বলছিলি না তোর সৃজনপত্রিকার জন্য একটা লেখা দিতে। সেই ব্যাপারেই আসা।
কলেজে যখন পড়তাম তখন অমিয়র কিছু লেখা পড়েছিলাম। খুব ভাল লাগত ওর গল্প। তাই কয়েকদিন আগে ওর সাথে দেখা হয়ে যেতে ওকে বলছিলাম আমার পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যার জন্য একটা লেখা দিতে। তার জন্য যে ও নিজের চেম্বার ছেড়ে কলেজ স্ট্রীটে আমার অফিসে ছুটে আসবে ভাবতে পারিনি। যাই হোক। খুব ভাল লাগল ওর আসার কারনটা শুনে। বললাম,“তুই আবার লেখা শুরু করেছিস নাকি?”
না। আমি না।
তাহলে?”
একজন পেশেন্টের একটা ডায়রি পেয়েছি। লেখককে না জানিয়ে পুরো ডায়রি প্রকাশ করাটা খুব বাজে ব্যাপার। সেই জন্যেই আমি পেশেন্টের শুধু শেষ ৪ টে দিনের ডায়রির কথা জেরক্স করে এনেছি তোর জন্য
আমার ভুরুগুলো আপনা থেকেই কুঁচকে গেল। একটা লোকের মাত্র ৪ টে দিনের ডায়রির ঘটনা থেকে একটা গল্প হয়ে যাবে? প্রফেসর শঙ্কুরও যে আর বেশিদিন লাগত। আমি কিছু বলছি না দেখে বোধহয় আমার মনের কথা আন্দাজ করেই অমিও বলল, “বুঝতে পারছি তুই কি ভাবছিস। ঠিক আছে তুই ডায়রির এই ৪ টে পাতা পড়। তারপর ছাপা না ছাপা তোর ব্যাপার। তারপর লেখাটা আমার হাতে দিল ও।
বললাম, “ঠিক আছে। তাই হবে।
একটু হেসে ও উঠে পড়ল। বলল গিয়ে নাকি চেম্বার খুলতে হবে। আমি যেন ঘটনাটা পড়ে ওকে জানাই। ও বেরোবার আগে শুধু জিজ্ঞেস করলাম, “ডায়রির মালিকের নাম কি?”
সবুজ রায়বলে ও বেরিয়ে গেল
ওর কথা মত তখনই বসে ডায়রির ৪ টে দিনের ঘটনা আমি গোগ্রাসে গিললাম। সত্যি কথা বলতে কি একবার পড়ার পর আর দ্বিতীয়বার ভাবিনি ছাপব কিনা। একটুও পরিবর্তন না করে ডায়রির ৪ টে পাতা হুবহু তুলে দিলাম আমি পাঠকদের জন্য। আশা করি সকলের ভাল লাগবে।           

২৯ শে জুলাই,২০১২
কাল রাতেও একই ভাবে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। ওপরে ফুল স্পিডে পাখা ঘুরছে। ঘরের জানলা গুলো সবকটাই হাট করে খোলা। তাও আমার সারা পিঠ ঘামে ভিজে গেছে। বেডসাইড টেবিলে রাখা জলের বোতলটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে অনেকটা জল একসাথে খেয়ে নিলাম। কিছুটা জল মুখ থেকে থেকে গড়িয়ে বুকে পড়ল। হালকা নীল নাইট বালবের আলোতে ঘরটা প্রায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। জানলার দিকে একবার তাকিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম আমি। কি হচ্ছে কি আমার সাথে? পরপর তিনদিন হল এই নিয়ে। মাথার কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে টাইম দেখলাম। ৩ টে ১৫ বাজে। ভাবলাম আর এক ঘুম দেওয়া হয়ে যাবে। আজ রবিবার কাজেই সকাল সকাল ওঠার বালাই নেই । মাঝে মাঝে অদ্ভুত লাগে ভাবতে এক সপ্তাহ আগে অবধি আমার পাশে এই বিছানায় আর একজন থাকত। আজ সে নেই। কেমন হঠাৎ করে সবাই আসে আবার হঠাৎ করে চলে যায়। এসবই ভাবতে ভাবতে চোখটা সবেমাত্র বন্ধ করেছি, এমন সময় আবার সেই এক জিনিস। সেই চেনা গলার আওয়াজ হতে লাগল আমার মাথার মধ্যে। প্রথম ২ দিন আওয়াজটা অস্পষ্ট এলোমেলো মনে হয়েছিল। কিন্তু আজ যেন অনেকটা স্পষ্ট। হ্যাঁ, স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি এবার। কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে। সবু-উ-জ…. সবু-উ-জ…! সোজা হয়ে উঠে বসলাম আবার বিছানায়। এত মহাজ্বালা। গলাটা মেয়ের তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ছেলে মেয়ে সে যাই হোক না কেন ওটা আমার মাথাব্যাথার বিষয় নয়। এরকম দিনের পর দিন যদি রাতে একই জিনিস হতে থাকে তাহলে তো ঘুমোনো মাথায় উঠবে। নাহ! বুঝতেই পারলাম আর ঘুমোনো হবেনা। অফিসের ব্যাগ থেকে হেডফোনটা বের করে কানে লাগিয়ে মোবাইলে গান চালিয়ে দিলাম। ভোর রাতের দিকে কখন নিজেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম আমি নিজেও জানিনা।
আজ সকালে যখন ঘুমটা ভাঙল তখন ঘরে রীতিমত রোদ ঘাঁটি গেড়ে ফেলেছে। মাথাটা খুব ভারী ভারী লাগছিল আমার।  উঠে দেখলাম গত কয়েকদিনের মত মা রান্নার কাজে লেগে পড়েছে। আগের রবিবার ঘুম থেকে উঠে রূপকথাকে দেখেছিলাম রান্নার কাজ করতে। ওইদিনের পর আমি আর ডায়রি লিখতে পারিনি ক’দিন। ওইদিনই তো শেষ দেখেছিলাম রূপকথা কে। আজ সারা সকাল কিছু খাইনি আমি। ইচ্ছে করছিল না কিছু খেতে। শেষে মা দুপুর দেড়টার সময় জোর করে খাওয়াতে এসেছিল। আমি খাইনি। ভাতশুদ্ধ থালা ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। মা আমার দিকে অদ্ভূতভাবে তাকিয়েছিল । কিছু বলেনি। চুপচাপ ভাতগুলোকে মাটি থেকে তুলে নিয়ে চলে গেল।
একটা প্রশ্ন আজ সকাল থেকেই আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল।  আমার মাথার মধ্যে আমি কার গলার আওয়াজ শুনছি গত তিনদিন? রূপকথার কি? কিন্তু এটা তো সম্ভব নয়। একজন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর কি করে তার আওয়াজ আমি শুনতে পাচ্ছি? আমি মাথা গরম করে ফেলছি কথায় কথায়? কেন? জীবনে কখনও মায়ের মুখে মুখে আমি তর্ক করিনি। কোনোদিন মা খাইয়ে দিতে এলে খাবার ফিরিয়ে দিইনি। আচ্ছা, আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? ডাক্তার দেখানো কি উচিত আমার?
২ রা আগস্ট,২০১২
আজ সকালে অমিয় রায়চৌধুরীর কাছে গিয়েছিলাম। গত দু’তিন দিন আমার রাতে একই জিনিস হয়েছে। মাথার মধ্যে নিজের নাম শুনতে পাচ্ছি ক্রমাগত। শেষ পাঁচদিন ভাল করে ঘুম হয়নি। রাজীবকে ভাল মনোরোগ বিশেষজ্ঞর কথা জিজ্ঞেস করতে রাজীব ওনার নাম বলল। রাজীব আমার অফিসের সহকর্মী। হঠাৎ মনোরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে কেন যাচ্ছি জিজ্ঞেস করায় বলেছি মায়ের একটু শরীরটা ভাল যাচ্ছেনা। ও আর কিছু বলেনি।  আমার ব্যাপারে সমস্ত কথা শোনার পর ডাক্তারবাবু রূপকথার কথা জানতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কতদিন বিয়ে হয়েছিল আপনাদের?
বললাম, “এক বছর।”
“কি হয়েছিল হঠাৎ?”
“২৩শে জুলাই, রবিবার এর সকালে মা মন্দিরে গিয়েছিল। আর আমি বাজার গিয়েছিলাম। ও বাড়িতে রান্নার কাজকর্ম করছিল। ফিরে এসে দেখি…”
ডাক্তার কথা শেষ না করতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কি দেখলেন ফিরে এসে?”
“দেখলাম যে রান্নাঘরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। গ্যাস লিক করেছিল আগের রাতে। কেউ বুঝতে পারিনি। সকালে ও রান্না করার সময় বিপত্তিটা ঘটে। আমি ছুটে যাই রান্নাঘরে। পাশের ফ্ল্যাটের লোকেরাও ততক্ষনে বেরিয়ে আসেন। মুখে রুমাল চাপা দিয়ে রান্নাঘরের কাছে গিয়ে দেখলাম রূপকথার বডিটা পড়ে আছে মাটিতে।”
কেন জানিনা ডাক্তারবাবু সব শোনার পর আমার দিকে অদ্ভূতভাবে তাকালেন। তারপর হঠাৎ আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা আপনি কি পারফিউম ব্যবহার করেন?”
হঠাৎ এই প্রশ্নে বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তবে উত্তর দিতে খুব বেশী দেরী করিনি, বললাম, “আগে পার্ক এভিনিউ ব্যবহার করতাম। এখন কিছুই করিনা।”
“ঠিক আছে আপনি আজ আসুন। আমায় ব্যপারটা নিয়ে একটু ভাবতে হবে। আপনি এক সপ্তাহ পরে আসুন।”
আমি আর কিছু না বলে চলে এলাম। এক সপ্তাহ পরে কি শোনাবেন জানিনা। এদিকে আমার অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠেছে। ওহ! ডায়রিতে যদি সব সত্যি কথা লিখতে পারতাম খুব হালকা লাগত। কিন্তু আমি জানি আমি পারবনা।
১৩ই আগস্ট, ২০১২
ভেবেছিলাম আর ডাক্তারবাবুর কাছে যাব না। কিন্তু যেতেই হল আজ আবার। সারারাত ঘুমোতে পারছিনা। অফিসে গিয়ে একটু ঝিমোলেই আবার সেই অদ্ভূত আওয়াজ মাথার মধ্যে। চোখের তলায় কালি পড়ে গেছে। শেষটায় বাধ্য হয়েই যেতে হল। ওনার চেম্বার শ্যামবাজারে। গিয়ে দেখলাম উনি চেয়ারে বসে বসে একটা ম্যাগাজিন পড়ছেন। মানসিক রোগীর সংখ্যা কি কমে যাচ্ছে নাকি? হতেই হবে। নইলে এই দুপুরবেলায় ওনার চেম্বার তো ফাঁকা থাকার কথা নয়। আমায় দেখেই হেসে বললেন, “আরে আপনার কথাই ভাবছিলাম। ভাবলাম আপনার বোধহয় রোগ সেরে গেছে। আর আসবেন না আপনি।”
একটু গম্ভীরভাবেই বললাম, “না। এসেছি যখন বুঝতে পারছেন আশা করি রোগ সারেনি।”
“হ্যাঁ। সে তো বুঝতেই পারছি। বসুন আপনি। আজ আপনাকে হতাশ করব না।”
বসলাম চেয়ারে। উনি তারপর বললেন, “সবুজবাবু আপনাকে আমার কতগুলো কথা জিজ্ঞেস করার আছে। ঠিকঠাক উত্তর দেবেন।”
বললাম, “করুন।”
“আপনার বাড়ি ঠিক কোথায়?”
“ডানলপে”
“আর অফিস?”
“ধর্মতলায়।”
কিসে যাতায়াত করেন?”
বললাম, “বাসে যাতায়াত করি। 34B
“গুড! আচ্ছা এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাচ্ছি। টেলিপ্যাথি কাকে বলে জানেন?”
টেলিপ্যাথি শব্দটার সাথে পরিচয় আছে। কোথায় যেন পড়েছিলাম মনে হয়।
বললাম, “শব্দটার সাথে পরিচয় আছে। কিন্তু ডিটেলসে জানিনা কিছুই।”
উনি বললেন , “আজ জেনে নিন। আমি বলছি কাজে লাগবে আপনার। দুজন মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো যান্ত্রিক যোগাযোগ ছাড়া শুধুমাত্র মনের জোরে কথোপকথন বা তথ্য আদান-প্রদানকেই টেলিপ্যাথি বলে। মানে ধরুন আপনি আছেন আপনার ঘরে হঠাৎ স্কুলের কোনো পুরানো বন্ধুর কথা মনে হল। তার সাথে বহুদিন যোগাযোগ নেই আপনার। সঙ্গে সঙ্গে  দেখলেন সেই বন্ধুর ফোন এল। এটা এক ধরনের টেলিপ্যাথি। আবার ধরুন আপনি আছেন কোলকাতায় আর আপনার খুব কাছের কেউ একজন আছেন দিল্লীতে। দুজনের ফোনে কথা হচ্ছেনা। কিন্তু একজন আর একজন কে যা জানাতে চাইছে তা জানিয়ে দিচ্ছে মনে মনে। এটাও টেলিপ্যাথি।”
আমার মাথা এবার গরম হয়ে গেল। কি’সব গাঁজাখুরি কথা বলছেন ভদ্রলোক। বললাম, “তার মানে আপনি কি বলতে চাইছেন? আমার স্ত্রী মারা গিয়েছে। তারপর পরলোক থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করছে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে?”
“আমার কথা এখনো শেষ হয়নি সবুজবাবু। আপনি বাইবেল পড়েছেন?”
একটু রাগতস্বরে বললাম, “নাহ! কেন ওতে টেলিপ্যাথির কথা আছে নাকি? যত্তসব রাবিশ!”
উনি দেখলাম একটুও রাগলেন না। ঠোঁটের কোনে হাসি নিয়ে বললেন, “নাহ! তা নেই। আর টেলিপ্যাথির ব্যাপারটা বিজ্ঞান ঠিক বিশ্বাস করেনা। ওই কথায় পরে আসছি। বাইবেলে একটা কথা আছে জানেন, ‘Be sure your Sin will find you out’. কথাটা একেবারে খাঁটি কথা। একটা ব্যাপার সবসময় মনে রাখবেন মানুষের পাপ  মানুষকে ঠিক খুঁজে বার করবে। কেউ চাইলেও ফাঁকি দিতে পারবে না।”
আমার মাথা খুব গরম হয়ে গিয়েছিল। চেয়ার ছেড়ে উঠে টেবিলে খুব জোরে একটা ঘুঁষি মারলাম। বললাম, “ কি বলতে চাইছেন কি আপনি? কি পাপ করেছি আমি?”
ডাক্তারবাবু আমার কথার জবাব না দিয়ে বললেন, “সল্টলেকের সৌরভ আবাসনের একটা ফ্ল্যাটে আপনি প্রায়দিনই এখন রাতে থাকেন। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি। এর কারনটা জানতে পারি?”
“সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।” কথাটা বলেই বুঝতে পারলাম ঘরে এসি চলছে তাও আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে।
“তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই” ডাক্তারবাবু গম্ভীরভাবে বললেন, “ আপনি আজ আসুন। আর একটা কথা। মেয়েদের পারফিউম আমি চিনি সবুজবাবু। আমার স্ত্রী ‘পিঙ্ক পার্ল’ ব্যবহার করেন। ঠিক ওই গন্ধটাই আমি আগের দিন আপনার গায়ে পেয়েছিলাম। আর আপনার শার্টের কলারের পাশে একটা বড় চুল দেখেছিলাম। যেটা কোনো ছেলের হতে পারে না। নমস্কার। ভাল থাকবেন।”
মাথা নিচু করে বেরিয়ে চলে এলাম। কিছু ভাবতে পারছিলাম না। পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে অন্ধকার তখনও। ডাক্তারবাবু কি করে…। আর লিখতে পারছিনা। মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। আজকের ডায়রি এখানেই শেষ করলাম।
১৫ই আগস্ট, ২০১২

অনেক হয়েছে। আর  পারছিনা। আজ সব সত্যি কথা লিখব আমি ডায়রিতে। এতদিন যা লিখিনি সব লিখব আজ।
স্টুডেন্ট হিসেবে আমি খুব খারাপ ছিল না। স্কটিশ চার্চ থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার পর আমি আশুতোষ কলেজ থেকে অ্যাকাউন্টেন্সী তে গ্র্যাজুয়েশন করেছি। কলেজে পড়তে পড়তে ফাইনাল ইয়ারে অপরাজিতা বলে একটি মেয়ের সাথে আমার প্রেম হয়। বাড়িতে মানতে চায়নি। খুব অশান্তি হয়। আমার বাড়ির সবাই চিরকালই খুব সেকেলে। বাবা মেনে নেবে না আমি জানতাম। সেলস ম্যানেজারের চাকরিটা পাবার পর তাই গোপনে বিয়ে করে ফেলি। আমি আর অপরাজিতা দু’জনে দু’জনকে খুব ভালবাসতাম। বাবা যতদিন বেঁচে আছে ততদিন ওকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় । তাই সল্টলেকে একটা ফ্ল্যাট কিনে আমি ওখানেই ওর থাকার ব্যবস্থা করে দিই। ও কোনোদিন এসব নিয়ে কোনো অভিযোগ জানায়নি আমাকে। এমনকি বাবার শরীর খারাপের সময় বাবা যখন হঠাৎ ঠিক করল আমার বিয়ে দেবে সেদিন ও সব শুনে আমায় বিয়ে করতে বলছিল। ততদিন ও একটা স্কুলে চাকরি পেয়েছে। বাধ্য হয়ে বিয়ে করলাম আমি। রূপকথা, আমার নতুন স্ত্রী ক’দিন পরেই বুঝতে পারল আমার অন্য কারও সাথে সম্পর্ক আছে। জীবনে কখনো ওর শরীর আমি ছুঁইনি। দু’জনে এক ছাদের তলায় থাকতাম বাধ্য হয়ে। বাবা-মায়ের সামনে যতটা সম্ভব ভদ্র ব্যবহার করার চেষ্টা করতাম ওর সাথে। কিন্তু ও বিয়ের ৫-৬ মাস পর থেকেই আমায় ঠেস দিয়ে কথা বলতে শুরু করল ও। তত’দিনে আমার বাবা মারা গেছেন। মায়ের সামনে নোংরা নোংরা কথা বলত আমায়। মা হ্য়ত বুঝেও বুঝত না কিছু। তবে কোনোদিন কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আমি আর থাকতে পারছিলাম না। অসহ্য লাগছিল সংসারে। তাই ঠিক করেছিলাম পৃথিবী থেকে ওকে সরিয়ে দেব। তারপর নিজের মত করে সংসার করব। সেই মত ২২শে জুলাই রাত্রে গ্যাস সিলিন্ডারের পাইপটা খুলে দিয়েছিলাম। সকালে উঠেই মা’কে মন্দিরে নিয়ে যাই। আর সেখান থেকে চলে যাই বাজারে। তারপর বাকি ব্যাপার পুরো ছক অনুযায়ী ঘটে। পুলিশ এসে সব দেখে বলে এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। আমায় কোনো ঝামেলাই পোয়াতে হয়নি। ভেবেছিলাম এরপর অপরাজিতাকে নিজের বাড়িতে এনে রাখব। মাকে জানাব সব। কিন্তু তারপর থেকেই মাথার মধ্যে ওই শব্দ আমার জীবনটা অসহ্য করে দিচ্ছে। এভাবে বাঁচা যায়না। নিজে করতে চেয়েও কিছু করতে পারছিনা। পরাধীনের মত বেঁচে আছি মনে হচ্ছে। আজ ১৫ই আগস্ট। স্বাধীনতা দিবস। আজ আর এভাবে হেরে যাব না আমি। আজ রূপকথাকে বুঝিয়ে দেব আমি ওর চাকর নই। ও আমাকে দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করাতে পারে না। আজ আমি সেটাই করব যেটা আমার মন চাইছে।
         

 

ডায়রির পাতা এখানেই শেষ। কিন্তু আমার মন বলছিল আরও কিছু বাকি আছে এই ঘটনার। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করি অমিয়কে। কোনো ভূমিকা না করেই জিজ্ঞেস করলাম, “সবুজ এখন কোথায়?”
ও বলল, “নিজের স্ত্রীর সাথে সুখেই আছে বোধহয়। এতদিন পরে মাথার শব্দ থেমেছে আশা করি।
পালটা প্রশ্ন করলাম, “মানে অপরাজিতার সাথে?”
নাহ রে! অতটাও ভাগ্য ভাল নয় ছেলেটার। ওর বাবা যার সাথে বিয়ে দিয়েছিল সেই রূপকথার সাথে?”
আমার মুখ থেকে আপনা থেকেই বেরিয়ে গেল, “মানে?”
সবুজ সুইসাইড করেছে ১৫ই আগস্ট। গায়ে কেরোসিন ঢেলে। আগুন জ্বালিয়ে।
ফোনটা কানে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম অনেকক্ষন। হাতটা যেন অসাড় হয়ে গেছে। একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন মাথার মধ্যে ভিড় করছে তখন। এটাই কি টেলিপ্যাথি? এরকমও ঘটে বাস্তবে? রূপকথা কি শেষ পর্যন্ত পেল তার সবুজকে? নাকি পৃথিবী থেকে কোনো অপরাজিতা আবার তার টেলিপ্যাথির জোরে পরলোক থেকে তার স্বামীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে?

টেলিপ্যাথেটিক

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি