শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা চরিত্রগুলি নিয়ে কাটা-ছেঁড়া করার জন্য ক্ষমা চাইছি। এটি একটি পরীক্ষামূলক লেখা ব্যোমকেশ কে নিয়ে। সময়কাল আমাদের ২০১৬ র কলকাতা। আসলে ব্যোমকেশ মানেই ধুতি পাঞ্জাবী এবং পুরোনো কলকাতা এই ব্যাপারটা থেকে বেরোতে চেয়েছিলাম। আপনার এই প্রচেষ্টা ভালো না লাগলে নিজগুনে ক্ষমা করে দেবেন।
১
– আপনার নাম?
– অতুল মিত্র
– কি করেন?
– তেমন কিছু না। ওই একটু ছবি তোলার শখ রয়েছে। মাঝে মাঝে বিয়ে বাড়িতে ছবি তুলি। জানেনই তো আজকাল এই পেশা তে বেশ ভালোই চলে যায়।
– আমি যে ফ্ল্যাটে থাকার জন্য রুমমেট চাইছি সেটা জানলেন কীভাবে?
এবার একটু জেরার স্বরেই বললাম। আসলে একেই এই গরমে মাথার টিকি অবধি জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। তার ওপর সবে ইউনিভার্সিটি থেকে এসে একটু রেস্ট নিচ্ছিলাম। তার মাঝে এর উপদ্রব।
মুহুর্তের জন্য মনে হল লোকটা যেন একটু তাচ্ছিল্য সহকারে হাসল তারপর বলল – এত বড় একটা ফ্লেক্স টাঙিয়েছেন বাইরে। তার ওপর দরজার বাইরেও তো “Need Flatmate” লেখা রয়েছে।
আমার এবার খেয়াল হল। তাই তো? এটা একদম মাথায় আসেনি। কি বোকা বোকা প্রশ্ন করে ফেললাম।
লোকটা এবার হঠাৎ বলল, “একটু ভেতরে আসতে পারি?”
আমি একটু দোটানায় পড়েছিলাম এটা নিয়ে। অচেনা লোককে ঘরে ঢোকানো ঠিক হবে কিনা সবে ভাবছি লোকটা আবার নিজেই বলল – খুব জলতেষ্টা পেয়েছে অজিত বাবু। যা গরম!
আমি আবার চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম যে আমার নামটা জানল কী করে? ফ্ল্যাটের বাইরে তো নাম লিখে রাখিনি আমি। রাখিনি তার কারন হ্যারিসন রোডের এই ফ্ল্যাটটা এখনো আমার নিজের না। এখানে শুনেছি আগে একটা মেসবাড়ি ছিল। ফ্ল্যাটের মালিক এখন অনুকুল বাবু। এখানে থাকেন না। পাশে একটা বাড়িতে থাকেন। তবে অনুকুল বাবুর সাথে কথাবার্তা চলছে শিগগিরি হয়তো কিনে নেব লোন নিয়ে। তারপর একটা ফ্ল্যাটমেট রেখে যতটা তোলা যায় ততটা টাকা তুলে নেবো ভেবেছি।
লোকটা বলল – অত ভাববেন না আপনি বোধহয় ইউনিভার্সিটি থেকে এসে আই ডি কার্ডটা খুলতে ভুলে গেছেন। ওই দেখেই নামটা বললাম।
আবার একটা “তাইতো” সুলভ মুখ করে পরক্ষনের লোকটার দিকে তাকিয়ে সত্যি মায়া হল। বেচারা গরমে ঘেমে স্নান করে গেছে। বললাম – হ্যাঁ হ্যাঁ আসুন। জল দিচ্ছি আমি।
কথা বলার পর আমার ছেলেটাকে আমার বেশ ভালো লেগেছিল। তাই ওইদিনই ওর সাথে ফাইনাল কথা হয়ে যায়। এক সপ্তাহ পরে আমি ফ্ল্যাট টা কিনে নি। আর ঠিক তার পরের দিন ও জিনিসপত্র নিয়ে ঢুকে যায় ফ্ল্যাটে।
অতুল ছেলেটা ডিস্টার্বিং এলিমেন্টস না। তবে ওর কাছে বেশ কিছু লোক আসে প্রায়। সব সময় এক লোক আসে না। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লোক। তারা এলে ও তাদের নিয়ে ওর ঘরে চলে যায়। ঘন্টাখানেক এর মধ্যেই তারা চলে যায়। একদিন আমায় নিজেই বলল ওরা নাকি ওর ক্লায়েন্ট। আমি আর বেশি কথা বাড়াইনি কারন আগেই বলেছিল ও ফটোগ্রাফার।
আমার কাছেও আমার ইউনিভার্সিটির বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবীরা আসে। আড্ড-গল্প হয়। অতুল কোনোদিন কাছ অবধি ঘেষে না। একদিন আমি যেচে আলাপ করানোর চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু হাই হ্যালোর বেশি আর কিছু এগোয়নি। আমিও আর জোর করিনি।
২
আগস্ট মাস। একটু বৃষ্টি হয়েছে বিকেলে। তাই ওয়েদারটা একটু ভাল। আমার বন্ধুদের গ্রুপটা সবাই এসেছিল সেদিন। একটা বেশ অদ্ভুত এবং সিরিয়াস ব্যাপার নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। আমাদের প্রত্যেকের ল্যাপটপ থেকে আমাদের একটা গ্রুপ ছবি কিভাবে না জানি ডিলিট হয়ে গেছে। অদ্ভুত ব্যাপারটা হল, কিভাবে সেটা আমরা কেউ জানি না। আর আমাদের ল্যাপটপে আমরা নিজেরা ছাড়া কেউ হাত দিই না।
গত বছর আমরা দীঘা গিয়েছিলাম। কলেজের ফাইনাল পরীক্ষার পর। তখনই তোলা হয়েছিল ফটোটা। প্রদীপ্ত তুলেছিল ওর DSLR e টাইমার সেট করে। সবার একসাথে ভালো ফটো আর নেই ওটা ছাড়া তা নয়। কিন্তু ডিলিট টা হবেই বা কীভাবে সেটাই বুঝতে পারছিলাম না।
ঐশানী আমাদের মধ্যে একটু ভীতু গোছের। ও বলল – “দেখ আবার কোনো ইন্টারনেট ভাইরাস আবিস্কার হয়েছে কিনা যেটা সবার কম্পিউটারের মধ্যে ঢুকে ফটো দেয়।”
“ফটো ডিলিট করার জন্য ইন্টারনেট ভাইরাস? তুই চেপে যা মা।” আমাকে বলতেই হল। কারন টেকনলোজির ব্যাপারে আমার জ্ঞান একটু বেশি বলেই আমার ধারনা তুলনামূলকভাবে।
“তাহলে ফটোগুলো গেল কোথায়? একসাথে সবার ভ্যানিশ হয়ে যাবে?” অমরেশ বলল এবার।
অনন্যা একটু গলা ঝেড়ে বলল, “দেখ, আমার একটা কনফেসন আছে।”
“কিরে? তুই ডিলিট করেছিস সবার ফটো গুলো?” সমীরন বলল।
“সবারটা করিনি। কিন্তু আমারটা আমি নিজেই করেছি। প্রদীপ্তর সাথে সেই ঝামেলাটা হওয়ার পরে করেছি।”
এই ব্যাপারটা আমরা সবাই জানতাম। প্রদীপ্ত আর অনন্যার একটা সম্পর্ক ছিল কলেজে পড়ার সময়। কিন্তু বেশ কয়েক মাস হল ওদের ব্রেক আপ হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম খুব সমস্যা হত ২ জনের একটা ঘরে থাকতে। আর সেটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন ২ জনে মানিয়ে নিয়েছে।
প্রদীপ্ত হাত তোলার ভঙ্গী করে বলল, “Same Here.”
সত্যবতী বলল, “আমার কাছে ছিল না ফটোটা। সমীরন কে মেল করতে বলেছিলাম ও করেনি।”
“মানে টা কি? আমি মেল করেছিলাম। তুই ভালো করে কম্পিউটার হ্যান্ডেল করতে পারিস না তাই পাস নি।”
সত্যবতী আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু এই সময় অমরেশ হঠাৎ বলল, “সে না হয় হল। সত্যবতী ছাড়া বাকি ৬ জন এর কাছ থেকে ছবিটা গেল কোথায়? ছবির তো আর ডানা গজায় নি। আর তা যদি না গজায় ধরে নিতে হবে কেউ একজন ডেলিবারেটলি ছবিটা ভ্যানিশ করিয়েছে। এই চিত্রচোর-টি কে?”
অতুল এই সময় কি একটা কারনে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। চুরির কথা শুনে হঠাৎ এগিয়ে এসে বলল, “ কি চুরি গেছে বললে? ছবি?”
আমি বললাম, “আরে আর বোলো না। আমাদের একটা গ্রুপ ছবি সবার কম্পিউটার থেকে একসাথে ডিলিট হয়ে গেছে। কিভাবে সেটা কেউ জানে না।”
“আমারটা আমি জানি। কারন আমি নিজেই ডিলিট করেছি ওটা।” পাশ থেকে অনন্যা বলল।
“কেন?” কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করল অতুল, “মানে কিছু জরুরী দরকার হয়েছিল?”
“হ্যাঁ জরুরী দরকার তো বটেই। কিন্তু সে কথা থাক। আমারটা আমি ডিলিট করেছি। কিন্তু বাকিদেরটা জানিনা।”
“আরে না না থাকবে কেন? ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং তো। শোনা যাক” বলে একটা খালি চেয়ার টেনে নিয়ে বসে গেল অতুল আমাদের সাথে।
আমার এবার একটু অস্বস্তি হতে লাগল। একে ও আমার ভাড়াটিয়া আর দ্বিতীয়ত ওকে কেউ সেভাবে চেনে না। ওর সামনে খোলাখুলিভাবে কেউ কথা বলবে বলে মনে হয়।
“আসলে কি জানেন তো? আমার এই অদ্ভুত ব্যাপারগুলো শুনতে খুব ভালো লাগে। আর আমার একজন বন্ধু রয়েছে সে তো একদম এক্সপার্ট এসব ব্যাপারে। তবে আপনারা Uncomfortable ফিল করলে চাপ নেই।” অতুল বলল এবার।
সত্যবতী বলল, “না না। চাপের কী আছে। একটা গ্রুপ ছবি ছিল সকলের একসাথে। সেটা হঠাৎ করে সবার কম্পিউটার থেকে ডিলিট হয়ে গেছে। এখন একজনের কাছেও নেই। এটাই হল ব্যাপার।”
“কে তুলেছিল ফটোটা?”
“আমি। ও হাই! আমার নাম-
“প্রদীপ্ত। হ্যাঁ জানি আমি। আগে একদিন আলাপ করালো তো অজিত। আচ্ছা আপনি রাখেননি ওরিজিনাল একটা কপি?”
“না। আসলে আমারও একটা সমস্যা ছিল তাই আমিও ডিলিট করেছিলাম।” কথাটা বলে একবার আড়চোখে অনন্যার দিকে তাকাল প্রদীপ্ত।
“ওহ। আর বাকিদের গুলো একসাথে মিসিং তাই তো?”
সত্যবতী বলল, “নাহ। আমাকে পাঠানো হয়নি ছবিটা। আমি বলেছিলাম পাঠাতে।”
“আমি মেল করেছিলাম তোকে। ভুলভাল কথা বার্তা বলিস না।” এবার একটু জোরেই বলল সমীরন।
ঐশানী এতক্ষন চুপ করেছিল। এবার আবার বলে উঠল, “কোনো একটা ভাইরাস এর কাজ। আমি বলছি শোন।”
অনন্যা বলল, “এই তুই থাম না। বাজে বকিস না।”
“কি ভাইরাস?” অতুলের ভুরুটা কুঁচকে গেল।
আমি বললাম, “আরে ওর ধারনা কোনো একটা নতুন কম্পিউটার ভাইরাস আবিস্কার হয়েছে যেটা এটার জন্য দায়ী।”
অতুল কিছু না বলে শুধু হাসল। তারপর সত্যবতীর দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা আপনি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন?”
“হ্যাঁ কেন বলুন তো?” একটু বেশ অবাক হল সত্যবতী।
“একবার মেলটা চেক করুন না। দেখুন না ফটোটা পান কিনা?” তারপর সমীরনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর আপনিও সমীরনবাবু। পারলে একবার দেখুন না SENT MAIL টা। থাকলে তো থাকবে ওখানে।
ওরা হঠাৎ ব্যাপারটাতে এরকম একটা উৎসাহ পেয়ে যাবে ভাবিনি। দুজনেই কথা না বাড়িয়ে ফোন বের করে ফটো খুঁজতে শুরু করে দিল।
মিনিট তিনেক পর সত্যবতী বলল, “নাহ। নেই। আমি তো জানি ও আমাকে পাঠায়নি।”
সমীরন কিছু না বলে মাথা নিচু করে খুঁজে যেতে লাগল। “এই তো। পেয়েছি।” হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল সমীরন তারপর ফোনটা অতুল এর দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, “আমি বললাম না আমি পাঠিয়েছি। আমার ঠিক মনে ছিল।”
অতুল ফোনটা দেখে ফেরত দিতে দিতে বলল, “বাহ। এই তো মিসিং ফটো পাওয়া গেল। যাক এবার সবাই কে মেল করে দিন আবার।”
আমি বললাম, “সেই শেষ পর্যন্ত চুরি যাওয়া চিত্র উদ্ধার হল।”
“তোরা বোধহয় একটা জিনিস মিস করে যাচ্ছিস” অমরেশ একবার মুখ বাড়িয়ে ফটোটার দিকে দেখে বলল, “ফটোটা পাওয়া গেছে। কিন্তু কাজটা যে ঘটালো তাকে পাওয়াটাও দরকার।”
অতুল বলল, “আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে আমি আমার বন্ধুর সাথে একবার আলোচনা করে দেখতে পারি। ও একটা সুরাহা করতে পারবে হয়ত ব্যাপারটার।”
প্রদীপ্ত বলল, “হ্যাঁ দেখুন তো। ব্যাপারটা জানাটা দরকার। তোরা কি বলিস?”
আমরা সকলেই এই প্রস্তাবে না করলাম না। কারন সবার মধ্যেই একটা কৌতূহল হচ্ছিল। তাই যতক্ষন না জানতে পারব কিভাবে ছবিটা উধাও হয়েছিল ততক্ষন ঠিক নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না।
রাতে খেয়ে ফেরার পর অতুল আমায় বলল, “তোমায় একটা অপ্রিয় কথা বলার আছে।”
“কী?”
“আমার ধারনা এই কান্ডটা তোমাদের মধ্যেই কেউ একটা ঘটিয়েছে।”
“মানে? কে বলল? তোমার ওই বন্ধু?”
“হ্যাঁ ওর সাথে কথা হল। এটা আর কেউ হতে পারে না। একে অপরের কম্পিউটারের অবাধ Access শুধু এদেরই আছে।”
“ধুর। আমরা কেউ কারুর কম্পিউটার এ হাত দিই না। সবারই প্রাইভেসি বলে একটা জিনিস আছে। ল্যাপটপে অনেক পার্সোনাল জিনিস থাকে। আর তাছাড়া এদের আমি কলেজ লাইফ থেকে চিনি।”
“হ্যাঁ আমার পয়েন্ট কিন্তু এটাই। তোমরা সবাই কেউ কাউকে ৩-৪ বছরের বেশি চেনো না। হতেই পারে কেউ একটা করেছে এটা।”
“আর মোটিভ? মোটিভ কি?”
“মোটিভটা জানলে তো হয়েই যেত। সেটাই তো জানিনা।”
আমার এবার খুব বিরক্ত লাগল। অতুলকে আমি চিনি ২ মাস। আর এদের আমি চিনি অন্তত ৩ বছর। অতুল ঠিক করে দেবে কে ভাল কে খারাপ? আমি এবার একটু ঝাঁঝিয়ে বললাম, “দেখো ভাই যদি শিওর না হও তাহলে কারুর নামে Accusation লাগিও না। আগে মোটিভ বা প্রুফ কিছু একটা পাও তারপর বোলো এসব। তোমার বন্ধু এক্সপার্ট হোক আর যাই হোক আমার থেকে বেশি আমার বন্ধুদের নিশ্চয় ও চেনে না।”
অতুল কিছু বলল না। জলের বোতল নিয়ে ওর ঘরে ঢুকে গেল।
৩
পরের দিন ঘুম থেকে উঠে দেখি ও নেই। শনিবার ছিল। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস আর আজ হবে না। তাই ঘরেই থাকব ভেবেছিলাম। কাল রাতে অতুলের সাথে একটু বেশি রূঢ় ভাবে কথা বলে ফেলেছি। ভেবেছিলাম সকালে সরি বলে দেব কিন্তু দেখতে না পেয়ে অগত্যা পেপার নিয়ে বসলাম। সারা সকাল বিকেল অতুলের পাত্তা নেই। দুপুরে খেতে যাওয়ার আগে ফোন করেছিলাম। কিন্তু ধরেনি। রাতে খেতে বেরোবো এরকম সময় একটা মেসেজ পাঠালো – “Plesase Bring my dinner. Haven’t eaten” না খেয়ে কি রাজকার্য করছে কিছু বুঝতে পারলাম না। যাই হোক নিয়ে এলাম ওর খাবার। অতুল ফিরল তারও এক ঘন্টা পরে। সাড়ে এগারটায়।
ফিরেই বলল “খাবার দাও।”
তারপর ডিনার করে এক গ্লাস জল খেয়ে চেয়ারে বসে বলল, “কী? খুব কৌতূহল হচ্ছে?”
“সেটাই স্বাভাবিক নয় কি?” আমি একটু রাগত স্বরে বললাম।
“আচ্ছা তুমি কি জানো তোমার বন্ধু অনন্যার নতুন প্রেমিক জুটেছে। এবং সে ভীষন মাত্রায় পসেসিভ। সেই কারনেই ও ওই ফটোটা ডিলিট করতে বাধ্য হয়েছে। কারন ওতে প্রদীপ্ত ছিল।”
“তুমি এত কথা জানলে কি করে? কে বলল তোমাকে?”
“আচ্ছা তুমি কী জানো অমরেশ আর সমীরন দু’জনেরই ভীষন হাতটান যাচ্ছে। বাড়ির অবস্থা ভালো না। কিম্বা ঐশানী তোমার প্রেমে পড়েছে এবং ওর ধারনা তুমি অনন্যাকে ভালোবাসো।”
না আমি সত্যি জানতাম না। এতগুলো খবর একসাথে! হজম হতে সময় লাগবে। খুব চেষ্টা করেও অবাক হওয়াটা আটকাতে পারলাম না। বললাম, “ঐশানীর ব্যাপারটা বুঝতে পারি না তা নয়। কিন্তু পাত্তা দিই না। তবে ও অনন্যাকে নিয়ে এটা ভাবত বলে আমি জানতাম না।”
অতুল কিছু বললনা। আমি বললাম, “তাহলে ঐশানী করেছে বলছ এটা। রাগের মাথায়। সবার ল্যাপটপ থেকে ডিলিট করে দিয়েছে আমি আর অনন্যা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম বলে ফটোটায়।”
অতুল এবার চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। বলল, “আমি কিছুই বলছি না ভায়া। যা বলার তুমি নিজেই বললে।”
“তাহলে ঐশানী তাই তো?”
“হতে পারে আবার নাও হতে পারে”
“হেঁয়ালি কোরো না প্লিজ। তোমার বন্ধু কি বলল?”
“তেমন কিছু বলে নি।”
“আচ্ছা কি লাভ হল বলতো এই ছবিটা ডিলিট করে? মানে যদি Jealousy থেকে না হয়ে থাকে ছবিটা কে বা কেন ভ্যানিশ করবে।”
অতুল এবার মৃদু হেসে বলল, “ছবি চুরি টা হয়ত লোককে ভুল পথে চালানোর জন্যে। পেছনে অন্য কারসাজি আছে। সেটা ঢাকা দেওয়ার জন্যেই হয়ত ফটোটা ডিলিট করা হয়েছে। যাতে-”
“যাতে সবাই ভাবে যে ফটোটা গেছে। আর কিছুর দিকে খেয়াল না দেয়। ব্রিলিয়ান্ট।” আমি ওর কথা শেষ না করতে দিয়ে বললাম, “আর কি? জানতে পেরেছে তোমার বন্ধু?”
অতুল এবার একটা হাই তুলে বলল, “আরে এভাবে একদিনে কেস সলভ্ হয় নাকি। সময় লাগবে। যদিও অনেকটাই গুটিয়ে এনেছি। সাসপেক্ট এখন ৫ জন। শুধু মোটিভটা পরিস্কার হচ্ছে না। সেটা হলেই…”
“পাঁচ জন মানে? আমি ছাড়া আর কে বাদ গেল লিস্ট থেকে?”
অতুল নিজের ঘরের দিকে এগোলো। যাওয়ার আগে বলে গেল, “তুমি বাদ আমি কিন্তু বলিনি এখনো।”
“মানে?”
অতুল উত্তর দিল না। খুব বিরক্ত লাগছিল নিজের। কিন্তু দেখলাম আমার কোঁচকানো ভুরুর তোয়াক্কা না করে ও ওর নিজের ঘরে গিয়ে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। আমাকেও অগত্যা এগোতে হল নিজের বিছানার দিকে।
সকালে অতুলের ধাক্কাতে ঘুম ভাঙল। বলল তাড়াতাড়ি ব্রাশ করে রেডি হও। বেরোতে হবে। আমি চোখ ঘষতে ঘষতে বললাম, “কোথায় বেরোতে হবে?” “ঐশানীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে ৫৪০০০ টাকা উধাও হয়ে গেছে। কিছু বোঝা যাচ্ছে না।”
আমি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলাম, “মানে? কি বলছ কি? তোমায় কে খবর দিল?”
“ওসব পরে হবে। চল একবার দেখা করে আসি।”
আমি আর দেরী না করে মিনিট দশেকের মধ্যে তৈরী হয়ে নিলাম। ট্যাক্সিতে যাওয়ার সময় অতুল জানলার দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিল। আমি আর ঘাঁটাইনি।
যখন পৌছলাম ঐশানীর বাড়িতে তখন বাজে ৮ টা। দেখলাম প্রদীপ্ত বাদে সবাই উপস্থিত হয়েছে আমাদের আগেই। প্রদীপ্ত নাকি আসতে পারবে না জানিয়েছে। ওকে আজ একটু বাইরে যেতে হবে রাত্রে ট্রেন যদিও। কিন্তু সকালে নাকি অনেক কেনাকাটার আছে।
অতুল শুনে বলল, “আজকেই বেরিয়ে যাচ্ছে প্রদীপ্ত বাবু? খুব জরুরী কিছু?”
সমীরন বলল, “তা তো জানিনা। তবে মনে হয় জরুরী।”
ঐশানী বিছানার ওপর মাথা নীচু করে বসেছিল। অতুল এবার ওর সামনে গিয়ে বলল, “আপনার টাকাটা কিভাবে গেল একটু বলবেন? মানে জানতে পারলেন কীভাবে?”
আমি এবার বলতে বাধ্য হলাম, “আহ! অতুল। এখন না। পরে হবে তোমার গোয়েন্দাগিরি।”
অমরেশ বলল, “ না না। এটা দরকার। ব্যাপারটা তো আর ছবি চুরির পর্যায়ে নেয়। টাকা চুরিতে এসেছে। আর তুই ভুলে যাচ্ছিস আমাদের সবারই ছবি ডিলিট হয়েছে ল্যাপটপ থেকে। এরপর কার যাবে জানিনা।”
সত্যবতী বলল, “হ্যাঁ। সেটাই।”
ঐশানী এরপর মাথা তুলে বলল, “ভোরবেলা ফোনে মেসেজ এল আমার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা হয়েছে।”
“পুলিশে খবর দিয়েছেন?”
কিছু না বলে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল ঐশানী।
“মেসেজটা একবার দেখতে পারি?” অতুল জিজ্ঞেস করল এবার।
ঐশানী বিছানায় ওর পাশে রাখা ফোনটা তুলে নিয়ে মেসেজটা খুলে অতুলকে দিল।
অতুল মেসেজটা পড়ে বলল, “একবার আপনার ল্যাপটপ টা ব্যবহার করতে পারি?”
“হ্যাঁ দাঁড়ান পাশের ঘরে আছে এনে দিচ্ছি।“ বলে বিছানা থেকে উঠতে যেতেই অনন্যা বলল, দাঁড়া আমি এনে দিচ্ছি। তুই বস।
তারপর বেরিয়ে ল্যাপটপটা নিয়ে এল। তারপর পাশের একটা খালি চেয়ারে বসে মিনিট খানেক কি করল জানিনা। মাঝে শুধু একবার মুখ তুলে বলল, “পাসওয়ার্ডও দিয়ে রাখেন না ল্যাপটপে?”
ঐশানী কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। এনার্জি পেলো না হয়ত।
ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সবাই ট্যাক্সি ধরলাম। ওর বাড়ি বাগবাজারে। ট্যাক্সিতে উঠেই অতুল বলল, সেন্ট্রাল মেট্রো। একটু তাড়াতাড়ি চলুন।
“আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর এবার তোমায় দিতেই হবে।” আমি এবার একটু রাগত স্বরে বললাম।
“ঠিক আছে বল শুনি তোমার কি জিজ্ঞাস্য” বাইরের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল অতুল।
“আমরা কি এখন তোমার গোয়েন্দা বন্ধুর কাছে যাচ্ছি?”
“না। নেক্সট?”
“ঐশানীর টাকা যাওয়ার ব্যাপারটা তোমায় কে বলল?”
“সত্যবতী। নেক্সট?”
“মানে? ও তোমার নাম্বার জানলো কি করে?”
প্রশ্নটা করার পরেই আস্তে আস্তে অনেকটাই পরিস্কার হয়ে গেল সব টা। ঐশানী অনন্যার ঝামেলার কথাটাও তাহলে সত্যবতীই বলেছে ওকে।
অতুল বলল, “ওর সাথে দেখা করেছিলাম কাল। কথা হল। তখনই নাম্বার নিলাম।”
“আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?”
“Eastern Railway এর অফিসে। কিছু কাজ আছে।”
“আমরা এখন কি অবস্থায় আছি? মানে এই ঘটনার সুরাহা থেকে।”
“বেশিদূর না। তবে আর একটা এরকম ঘটনা ঘটবে।”
“কার সাথে?” আমি এবারে প্রায় আঁতকে উঠে বললাম।
“সেটা জানলে তো হয়েই যেত? তোমার কোন ব্যাঙ্ক-এর অ্যাকাউন্ট?”
“SBI মানে State -”
“হ্যাঁ আমি জানি SBI মানে। তুমি চাপ নিও না। তোমার টাকা যাবে না।”
ইতিমধ্যে আমরা এসে গেছি সেন্ট্রাল। নামতে যেতেই অতুল বলল, ওয়েট কর ট্যাক্সি তে। আমি আসছি এখুনি। তারপর ফোন বের করে কাকে না জানি ডায়াল করতে করতে নেমে গেল ট্যাক্সি থেকে। সামনের বিশাল বিল্ডিংটায় ঢোকার আগে শুনতে পেলাম ফোনে কাউকে বলল – “হ্যালো পার্থ? কয়েকটা নাম লেখ তো।”
ট্যাক্সি তে বসে আছি। ভাড়াটা বাড়ছে। তবু ভালো এটা OLA নয়। হলে পকেট ফাঁকা হয়ে যেত। কিছুক্ষন পরেই সমীরনের ফোন এল। ফোনটা ধরা মাত্র ওপ্রান্ত থেকে খুব উত্তেজিত গলায় সমীরন বলল, “ভাই অতুল বাবু কোথায়? একটু দে না। সর্বনাশ হয়ে গেছে আমার।”
আমার এবার বুকটা ধ্বক করে উঠল। এই কি আবার একটা ঘটল নাকি? বললাম, “ও এখন আমার সাথে নেই। কি হয়েছে বল আমাকে।”
“আমার অ্যাকাউন্ট থেকে গেছে ৭০ হাজার। আমি শেষ হয়ে গেলাম ভাই।”
আমি কি বলব বুঝতে না পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে রইলাম। এ কি শুরু হল আমাদের সাথে। একটা ছবি দিয়ে শুরু হয়েছিল। আর কি যাচ্ছেতাই অবস্থায় চলে গেল পুরো ব্যাপারটা।
ওদিক থেকে হাঁফাতে হাঁফাতে আবার বলল, “আমি লালবাজারে যাচ্ছি। তুই বলে দিস অতুল বাবু কে। আমার আর কিছু রইল না।”
আমি বললাম, “ কি হল জানাস। আমি অতুলকে বলে দেব।”
ফোনটা রাখার পরেই দেখলাম অতুল আসছে হাতে ২ টো কাগজ। কিছু একটার প্রিন্ট আউট হবে। আমার মুখ দেখেই বোধ হয় বুঝতে পেরেছিল কিছু হয়েছে। ট্যাক্সির দরজা বন্ধ করতে করতে জিজ্ঞেস করল, “ কি হয়েছে? এবার কার গেল?”
“সমীরন” আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম।
অতুল ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলল, “হ্যারিসন রোড চলুন।” তারপর আর কোনো কথা না বলে গুম হয়ে বসে রইল। ট্যাক্সি থেকে নামার পর আবার একটা ফোন। এবার অনন্যা। তাড়াতাড়ি করে ফোনটা ধরলাম।
“হ্যালো?”
“আমারও গেল বুঝলি?”
“মানে? কখন?”
“এই তো মেসেজ পেলাম। তবে চাপ নিস না বেশি যায়নি কারন PNB তে আমার বেশি টাকা ছিল না। হাজার তিনেক গেছে। মনে হল জানানো দরকার। তাই জানিয়ে দিলাম।”
অতুল ততক্ষনে ঘরে ঢুকে নিজের ঘরে শুয়ে পড়েছে। কিছু একটা ভাবছে বুঝতে পারলাম। একবার শুধু গিয়ে বলে এলাম। এবার অনন্যা। তিন হাজার।
“পুলিশ কে জানাচ্ছে?” অতুল চোখ বন্ধ করেই প্রশ্নটা করল।
“সেটা বলল না। তবে সমীরন লালবাজার গেছে বলল।”
অতুল আর কিছু বলল না। দুপুর হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কারুরই ক্ষিদে পায়নি আমাদের। যা হচ্ছে খাওয়ার কথা আমার মনেও ছিল না।
ঘন্টাখানেক পর অতুলের একটা ফোন এল বুঝতে পারলাম। একটা দিক এর কথা যা শুনতে পেলাম সেটাই এখানে লিখছি।
“হ্যাঁ পার্থ বল। পেলি?”
“__”
“বাহ! ফাটাফাটি। দাঁড়া একটা কাগজ পেন নি।”
“__”
“হ্যাঁ বল এবার।”
“__”
এর পর প্রায় ২০ সেকেন্ড ওদিক থেকে কিছু বলা হল। তারপর অতুল বলল, “থ্যাঙ্কস রে। জানাবো তোকে পরে সবটা”
তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আবারও কাউকে একটা ডায়াল করল। তারপর চটিটা পায়ে দিয়ে আমাকে বলল, দাঁড়াও আসছি এখুনি।
ইতিমধ্যে বোধহয় ওদিক থেকে ফোন ধরা হয়েছে। শুনতে পেলাম অতুল বলছে, “হ্যালো পুরন্দর পান্ডে সাহেব? আপ কাঁহাপর হ্যা? ঘরপে ইয়া ডিউটি পে”
আর কিছু শুনতে পেলাম না আমি। মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা টেনশন দানা পাকাচ্ছিল। আর শুধু মনে হচ্ছিল এই বোধহয় আমার কাছে এসএমএস আসবে। একবার ভাবলাম ব্যাঙ্কে ফোন করে বলি আমার অ্যাকাউন্ট লক করে দেওয়ার জন্যে। তারপরেই মনে হল অতুল তো বলল আমার নাকি কোনো চিন্তা নেই। আমার টাকা যাবে না। ভরসা করে দেখাই যাক না ছেলেটাকে।
অতুল ফিরল প্রায় ২০ মিনিট পর। মুখে অসামান্য একটা হাসি নিয়ে। সাথে দেখলাম কিছু খাবারও কিনে নিয়ে এসেছে।
বললাম, “কিছু পেলে?”
অতুল অত্যন্ত উৎসাহের সাথে বলল, “হ্যাঁ পেয়ে গেছি চিত্রচোর এবং অর্থচোর কে?”
“দুজন কি আলাদা?”
“নাহ একজনই। আর চিন্তা কোরো না। আজকের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে?”
“কে বলল? তোমার বন্ধু?”
“হ্যাঁ ওইরকমই।” তারপর একটু থেমে অতুল বলল “এই তোমার OLA তে অ্যাকাউন্ট আছে?”
আমি এবার একটু অবাক স্বরেই বললাম, “হ্যাঁ কেন বল তো?”
“৭ টায় একটা বুক করো গাড়ি। হাওড়া যেতে হবে। আমাদের।”
অতুল এই কথাটা বলামাত্র কেন জানিনা আমার কাছে আরও অনেকটা পরিস্কার হয়ে গেল সব টা। আজ হাওড়া তে ট্রেন ধরে বাইরে চলে যাচ্ছে প্রদীপ্ত। তাহলে কি পুরো ঘটনাটাই… আমি আর কিছু ভাবার আগেই অতুল বলল, “কি গো? বুক করলে? ভুলে যাবে পরে। এখনই বুক করে রাখো।”
আমি কিছু না বলে একটা OLA বুক করে দিলাম। কিন্তু মনের ভেতর একটা চাপা অশান্তি দানা বাঁধছিল। শেষ অবধি প্রদীপ্ত সবার সাথে এরকম টা করল। একবার মনে হল ফোন করে বলি সবাই কে ওর এই কীর্তির কথা। কিন্তু বেশ কষ্ট করেই সেই লোভ সংবরন করলাম।
৭ টা বাজার মিনিট ১৫ আগেই গাড়ি চলে এল আমাদের। অতুল দুপুরের পর থেকে টানা ঘুমিয়েছে। ৬ টা ১০ নাগাদ ঘুম থেকে উঠে তৈরী হয়ে কাদের যেন ফোন করল।
তারপর ঠিক ৭ টা নাগাদ আমরা রওনা দিলাম হাওড়ার উদ্দেশ্যে।
৪
পথে একটা ফোন এল ওর। কার তা জানিনা। ফোন টা ধরে “হ্যাঁ বলুন।” আর
“ওকে! থ্যাঙ্ক ইউ। থাকুন ওখানে আমি এসে গেছি প্রায়” বলেই ফোনটা রেখে দিল। হাওড়া তে পৌঁছলাম প্রায় ৪৫ মিনিট পর। স্টেশনে গিয়ে সোজা ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা হাওড়া অমৃতসর এক্সপ্রেসে উঠে পড়ল। আমিও গেলাম পেছন পেছন।
তারপর হঠাৎই একজন পাঞ্জাবী ভদ্রলোককে কলার ধরে টানতে টানতে নীচে নামিয়ে আনতে গেল। আমার অবস্থা তখন গোলমেলে। ভেবে এসেছিলাম প্রদীপ্তকে দেখব এ কাকে দেখছি? এই লোকটাই বা কে? ট্রেনের কামরার অন্যান্য লোকগুলোও অবাক হয়ে ভাবছে কি হল। কিন্তু কেউ বাধা দিল না। হঠাৎ অতুল বলল, “প্রদীপ্ত বাবু একটু শারীরিক সাহায্য লাগবে এবার। অজিত কে দিয়ে হবে বলে মনে হচ্ছে না।”
তারপরে যেটা ঘটল তাতে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। পেছনের কামরা থেকে বেরিয়ে এল প্রদীপ্ত। তারপর দুজনে মিলে ওই পাঞ্জাবীকে বাইরে নিয়ে এল চ্যাংদোলা করে। তখনও ভাবিনি যে আমার আরও অবাক হওয়া বাকি আছে। পাঞ্জাবী লোকটি এতক্ষন একটা কথাও বলেনি। শুধু গায়ের জোরে অতুল আর প্রদীপ্তকে আটকানোর চেষ্টা করছিল। এরপর স্পষ্ট বাংলা উচ্চারনে বলল, “কি ভেবেছেন কি বলুন তো? এরকম অভদ্রতা করার মানে কি?”
গলাটা শুনেই আমার পেটের ভেতরটা খালি খালি লাগা শুরু হয়ে গিয়েছিল। আরে এ গলা তো আমাদের সবারই খুব চেনা। অতুল এরপর চাপ দাড়ি সহ পাগড়ি একটা টান দিতেই বেরিয়ে এল লোকটার আসল মুখ, তারপর বলল “মানেটা তো আমার থেকে ভালো আপনি বলতে পারবেন সমীরন বাবু।”
আমি তখন থ। প্রদীপ্তর মুখ এর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম আমার মত এতটা অবাক ও হয়নি। ইতিমধ্যে একজন আর পি এফ কিছু একটা ঝামেলা বুঝে এগিয়ে আসছিল আমাদের দিকে।
সমীরন তখন গজরাচ্ছে, “এটা কি হল? আমার ট্রেন আছে। আমাকে আটকানো হচ্ছে কেন? কি করেছি আমি?”
অতুল বলল, “সবমিলিয়ে ৫৭ হাজার টাকা চুরি করেছেন। এবং সেটা সাথে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন।”
“মানে? আমি কোথায় চুরি করলাম? আমার নিজেরই তো ৭০ হাজার টাকা-
অতুল ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, “সমীরন বাবু আমি বলি কি, এসব কথা থানায় গিয়ে হবে।”
আর পি এফ কে দেখলাম ৩ জন সাদা পোশাকের পুলিশের সাথে কিছু কথা বলছে। তারপর আমাদের দিকে এগিয়ে এল চারজনে।
“আমি থানায় যাবো। কি প্রমান আছে আপনার কাছে? আমার ব্যাগ দেখবেন? দেখুন ট্রেনেই রাখা আছে। কোনো টাকা নেই আমার কাছে।” সমীরন চেঁচাতে চেঁচাতে বলল।
“টাকা কি শুধু সাথেই থাকে নাকি সমীরন বাবু? আমি নিশ্চিত আপনার স্মার্টফোনের PAYTM অ্যাপটা খুললেই টাকার পরিমানটা আমরা পেয়ে যাব। আর History চেক করলেই টাকা গুলোর Transaction Time টাও পেতে খুব অসুবিধে হবে না।”
কেঁচোর মুখে ঘি পড়ল মনে হল। সমীরন আর কিছু বলল না। ইতিমধ্যে পুলিশ ৩ জন আর আর পি এফ ও এসে গিয়েছে। অতুল বলল, “আসুন পুরন্দর বাবু। আলাপ করিয়ে দি। ইনি পুরন্দর পান্ডে। লালবাজার থানার ও.সি.। আর ইনি হচ্ছেন সমীরন চ্যাটার্জি। আপাতত আপনার ক্লায়েন্ট। আপনার সাইবার ডিপার্টমেন্ট এর লোককে দিয়ে ওঁর ফোনটা চেক করালেই প্রমান হাতে পেয়ে যাবেন।”
পুলিশ অফিসারটি কনস্টেবল দের ইশারা করতেই ওরা এসে হাতকড়ি পরিয়ে নিয়ে গেল সমীরন কে। পুরন্দর সাহেব তারপর অতুলের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “So? Another One this month?”
অতুল হেসে বলল, “হ্যাঁ ওই আর কি। আচ্ছা আসি আজ। রাত্রে ফোন করে নেব একবার। তারপর আমাদের দিকে ফিরে বলল চল অজিত। আর প্রদীপ্ত তোমার তো ট্রেন মিস হয়ে যাবে। বসে যাও এবার।”
“হ্যাঁ আমি যাই এবার। পরে এটা নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে রইল। কি খেলটাই না দেখালেন আপনি।” প্রদীপ্ত বলল, “ঠিক আছে। Bye Everyone”
আমরা তারপর রওনা দিলাম আমাদের হ্যারিসন রোডের ফ্ল্যাটের দিকে।
৫
সিগারেট টা ধরিয়ে একটা টান দিয়ে অতুল বলল, “বল এবার তোমাদের কার কী প্রশ্ন আছে?”
আমরা সবাই বসে আছি আমাদের ফ্ল্যাটে। প্রদীপ্ত ফেরেনি এখনো। তাই ও নেই। বাকি সকলেই রয়েছি। সবার মধ্যেই অনেক প্রশ্ন আছে। ভালো ব্যাপার হল ঐশানী আর অনন্যার টাকা ফেরত এসেছে। বলা বাহুল্য ওরা ভীষন খুশি আজ। আজ সম্ভবত সন্ধ্যের খাওয়া দাওয়াটাও স্পনসর করছে ওরা।
অমরেশ প্রথম প্রশ্ন করল, “প্রথম থেকে খুলে বলুন তো সবটা। আমার কাছে অনেক ব্যাপার এখনও ধোঁয়াশার মত।”
আমরা সবাই সায় দিলাম তাতে। অতুল বলতে শুরু করল –
“প্রথম দিন তোমাদের সবার সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছিল কাজটা ভেতরের একজনই ঘটিয়েছে। কারন বাইরের কারও তোমাদের কম্পিউটারে অ্যাকসেস থাকা সম্ভব নয়। সেটা থেকেই আমি আমার অনুসন্ধান শুরু করি। একটু খোঁজ নিয়ে জানতে পারি। অমরেশ আর সমীরন এর হাতটান যাচ্ছে। অবশ্য তার মানেই যে ও চুরি করবে তা নয়।”
অতুল একটু থামল সিগারেটে টান দেওয়ার জন্যে। অনন্যা এই সময় বলল, “আজ ব্যাপারটা ও কিভাবে ঘটালো একটু বলবেন?”
অতুল একটা লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “পাসওয়ার্ড। প্রায় প্রত্যেকেই নিজের কম্পিউটারে ব্যাঙ্কিং এর পাসওয়ার্ড সেভ রাখে। GOOGLE CHROME এর Advanced Settings এ গেলেই সেভ করে রাখা পাসওয়ার্ড দেখা যায়। এবার ধরে নিতে হবে ও আপনাদের ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড জানত কিম্বা যখন ল্যাপটপ চলছিল সে সময়ে খুব তাড়াতাড়ি কাজটা সেরেছিল”
“কিন্তু শুধু আমাদের অ্যাকাউন্ট থেকেই টাকা গেল কেন?” ফটো ডিলিট তো বাকিদেরও হয়েছে। এবার প্রশ্ন করল ঐশানী।
“কারন বাকিদের SBI অ্যাকাউন্ট। SBI তে যেকোনো অনলাইন লেনদেন এর জন্যে একটা ONE TIME PASSWORD লাগে। যেটা সবার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এ দেওয়া ফোন নাম্বারে এস এম এস আসে। তাই কেউ যদি আপনার পাসওউয়ার্ড জেনেও যায় তাহলেও খুব ক্ষতি করতে পারবেনা। তাই যাদের NON SBI অ্যাকাউন্ট তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা নিয়ে নিজের Paytm এ ট্রান্সফার করে নিল।”
আমি এবার বললাম, “আচ্ছা কিন্তু ফটো ডিলিট করল কেন? মানে এটা করে কি লাভ হল?”
অতুল হেসে বলল, “প্রত্যেক চোরই নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবে বুঝলে তো। ও ভেবেছিল এটা করে সবাই কে ভুল পথে চালানো যাবে। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না – ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’। ব্যাপারটা সেইরকম খানিকটা।
সত্যবতী বলল, “এবার কি করে বুঝলেন যে কাজটা ওর সেটা বলুন।”
অতুল সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে বলল, “প্রথম সন্দেহ হয় যখন জানতে পারি ও অজিতকে ফোন করে বলেছে যে ওর টাকা চুরি গেছে। আমার এক বন্ধু আছে – পার্থ- হ্যাকিং এক্সপার্ট বলতে পারো। তোমাদের কার কোন ব্যাঙ্ক-এ অ্যাকাউন্ট সেটা আমায় ও বের করে দেয়। ওর অ্যাকাউন্ট ছিল SBI তে। তাই ও যখন জানালো ওর টাকা গেছে তখন একটা খটকা লাগে।”
একটু থামল অতুল। ঘরের মধ্যে অদ্ভুত একটা নিস্তব্ধতা। এবার পাশে রাখা বোতল থেকে খানিকটা জল খেল ও। তারপর আবার শুরু করল, “অজিত এর হয়ত মনে আছে ঐশানীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা সেদিন রেলের অফিসে গিয়েছিলাম। আমার মনের মধ্যে একটা সেন্স কাজ করছিল যে কাজটা যেই করুক সে কলকাতা ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করবে আজকেই। কারণ এরপর পুলিশের ঝামেলা শুরু হলে আর সেটা সম্ভব হবে না। তাই ঐদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যে অবধি তোমাদের মধ্যে কেউ বাইরে যাওয়ার তৎকাল টিকিট কেটেছে কিনা জানার চেষ্টা করছিলাম। দেখলাম প্রদীপ্ত আর সমীরন এই দুজনেই বাইরে যাচ্ছে। দু’জনেরই তৎকাল টিকিট কাটা।”
এমন সময় অমরেশের ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠতে কথায় বাধা পড়ল অতুল এর। অমরেশ তাড়াতাড়ি ফোনটা কেটেই সাইলেন্ট করল, তারপর বলল, “বলুন বলুন। আপনি থামবেন না।”
অতুল বলল, “সন্দেহটা হয়ত প্রদীপ্তর দিকেও যেত। কিন্তু তারপরেই লালবাজারে পুরন্দর পান্ডেকে ফোন করে জানতে চাই যে অ্যাকাউন্ট থেকে ৭০ হাজার টাকা চুরি গেছে এরকম অভিযোগ নিয়ে কোনো লোক ওই সময়ে থানায় গেছে কিনা। পুরন্দর পান্ডে না বলাতে একদম শিওর হয়ে যাই যে এটা ওরই কাজ। তারপরই প্ল্যান ছকে ফেলি। সত্যবটির কাছ থেকে প্রদীপ্তর নাম্বার নিয়ে জানিয়ে দি সমীরনের দিকে খেয়াল রাখতে। প্রথমে খুব একটা ভরসা করেনি তারপর সত্যবতী কে কনফারেন্সে ধরাতে রাজি হয়। হাওড়া যাওয়ার পথে ওই আমাকে ফোন করে বলে স্ট্রেশনের বাথরুমে গিয়ে পাঞ্জাবীর ছদ্মবেশ ধরে বেরিয়ে এসেছে। কারন হাওড়া স্টেশন এখন সিসি টিভি ক্যামেরায় মোড়া থাকে। যাই হোক এরপর বাকি ঘটনা তো প্রায় সবাই শুনে ফেলেছে এরই মধ্যে।”
আমরা সবাই এতক্ষন মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিলাম অতুল এর কথা। সত্যজিৎ রায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমেন রায় দের লেখাতে এরকম হতে শুনেছি। আজ বাস্তবে দেখলাম। আমার মনের মধ্যে একটা খটকা কাজ করছিল বেশ কিছুক্ষন ধরে। বললাম, “আর তোমার বন্ধুটি কে?”
অতুল এবার আমার দিকে ফিরে বলল, “এখানে আমার সবার কাছে বিশেষ করে অজিতের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আছে। নিজের নাম এবং পেশা গোপন করার জন্যে।”
“মানে?” আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সত্যবতী করল প্রশ্নটা।
“মানে আমার পেশা ছবি তোলা নয়। আমি সত্যান্বেষী। এটাই আমার পেশা। গোয়েন্দাগিরি শব্দটা আমার খুব একটা পোষায় না… যাই হোক আমার পেশার কথা শুনলে লোকে ভাড়াটে নিতে চায় না। তাই প্রথমে বলিনি তোমায়। I am sorry। তুমি চাইলে আমায় চলে যেতে বলতে পার।”
২ দিন ধরে এত ধাক্কা খেয়েছি যে এটা আর খুব একটা প্রভাব ফেলল না মনে। সবাই তখন আমার দিকে তাকিয়ে। আমি কি বলি সেটা শোনার জন্যে। বললাম, “ সে না হয় বুঝলাম। তা আসল নামটা এবার তো বলা যায়।”
অতুল এক গাল হেসে বলল, “ ওহ। হ্যাঁ নিশ্চয় বলা যায়। আমার নাম ব্যোমকেশ…। ব্যোমকেশ বক্সী।”
