নভেম্বর মাস। গ্রামের দিকে হালকা ঠান্ডা পড়ে গেছে। এই সময় মাঝরাতে চাদরের তলা থেকে বেরোতে তপনের বেশ কষ্ট হয়। কিন্তু উপায় নেই। হি/সি পেলে উঠতেই হয়। ওদের শৌচালয় টা আবার ঘরের বাইরে। ওর বাবা ঘরের মধ্যে বানাতে দেয় নি। তপন উঠে পড়ল বিছানা থেকে। ঘরে একটা লাল রঙ এর নাইট বাল্ব জ্বলছে। বিছানা থেকে নেমে বাইরের দরজা খুলে ও এগোলো ওদের খামারের দিকে। ওদিকে পুকুরপাড়েই এখন করে ফেলবে। এখন আরও দু’পা এগিয়ে গিয়ে শৌচালয়ে গিয়ে করতে ইচ্ছে করছে না ওর। পুকুরপাড়ে গিয়েই বুঝল ঠান্ডা টা বেশ ভালোই পড়েছে। শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে বেরোনোটা উচিত হয় নি। তাড়াতাড়ি করে কাজ সেরে নিয়ে হালকা হয়ে তপন বাড়ির দিকে ঘুরেই দেখল কে একটা যেন শাড়ি পরে ওর ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকে গেল। একটু অবাক হল ও। কারন বাড়িতে মেয়ে বলতে আর কেউ নেই ওর এখন। ওর বৌ যমুনা দু’ছেলে কে নিয়ে বাপের বাড়ি গেছে। পরশুর আগে ফিরবে না। তিনকূলে আর কেউ নেই তপনের। বাবা-মা চলে গেছে ছোটোবেলাতেই। এক দিদি মানুষ করেছিল ওকে।  সেও গেল বছর গায়ে আগুন দিয়ে মরল বরের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে। হঠাৎ ওর মনে হল, বোবা পাগলীটা না তো? ওই বড় রাস্তার ধারে ভিক্ষা করে। কিন্তু সে এদিকে তো আসে না। তাহলে কি চোর?

পাশেই পড়ে থাকা একটা গাছের ডাল হাতে তুলে নিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল তপন।  ঘুম ঘুম ভাবটা তখন কিছুটা কেটেছে ওর। আস্তে আস্তে বাড়িতে ঢুকল ও। ওর বাড়িতে লুকোনোর তেমন জায়গা নেই। ২ টো ঘর। একটায় ও আর যমুনা থাকে। আর একটায় ওর ছেলেদু’টো। আর একটা ছোটো রান্নাঘর। কেউ যদি লুকিয়ে থাকে এদিক ওদিক তাহলে আর যাবে কোথায়। তপন ঘরে ঢুকে ঘরের আলোগুলো সব জ্বেলে দিল। তারপর সব কটা ঘর ভালো করে দেখল। রান্নাঘরটাও দেখল। কেউ কোথাও নেই! একটু থমকালো তপন। তাহলে কি ভুল দেখল? হতে পারে। চোখে ঘুমও ছিল তখন। তাই হবে হয়ত!

বাইরের দরজায় খিল দিয়ে, আলোগুলো বন্ধ করে করে তপন একটু জল খেল। তারপর আবার শুতে গেল নিজের ঘরে। মাথার কাছে ওর মোবাইল তার পাশে একটা ছোটো অ্যালার্ম ঘড়ি রাখা। তাতে দেখল দেড় টা বাজে! চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল সে। মিনিট পাঁচেক কাটল। ফ্যান বন্ধ। ঘড়ির টিক টিক শব্দটা বেশ জোরেই শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ ওর মনে হল ওর ঘরের বাইরে কে একটা যেন হাঁটছে। একটা ঝুমুরের আওয়াজ। ঠিক ঘড়ির টিক টিক শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে বাইরে যেন কে পা ফেলছে! স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে। সাথে সাথে বিছানায় উঠে বসল তপন। অনেকদিনের খাট। একটু নড়লেই শব্দ করে জানান দেয় তার বয়স হয়েছে। তপন ওঠার সময় ক্যাঁচ করে যে শব্দটা হল তারপরেই সেই শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল। যেন অন্য কারুর উপস্থিতির টের পেয়েছে সে। এবার একটু ভয় করতে শুরু করল তপনের। তাহলে কি সত্যিই ঘরে কেউ ঢুকেছে? কিন্তু ও তো সব জায়গা ভালো করে দেখল। পরক্ষনেই মনে পড়ল ওর ঘরে ঢুকেই ডানদিকে একটা জায়গায় বিরাট বড় একটা ধানের বস্তা আছে। প্রায় এক মানুষ লম্বা বস্তা। ওদের চাষের ধান। কেউ চাইলে ওর পেছনে দিব্যি লুকিয়ে থাকতে পারবে। কথাটা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা একবার কেঁপে উঠল তপনের। পরক্ষনেই দরজার দিকে একবার চোখ যেতেই ভয়ার্ত একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল ওর মুখ দিয়ে। দরজার ঠিক সামনেই শাড়ি পরে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে।

তাড়াতাড়ি করে বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা নিয়ে ফ্ল্যাশটা জ্বালাল তপন। কই? কেউ তো নেই? এই তো স্পষ্ট দেখল তপন। হঠাৎ খেয়াল হল স্নান করার গামছাটা মেলেছিল ঠিক দরজার ওপর। তারপর লাল নাইটবাল্ব এর আলো আর বাইরের একটা পেঁপে গাছের ছায়া পড়ে মনে হচ্ছে যেন কেউ একজন শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল তপন। সত্যি কীসব ভাবছে ও। ফোনটা পাশে রেখে আবার শুয়ে পড়ল আবার ও। এবার আর ঘুম ধরতে দেরী হল না। ঘুম ভাঙল আরও বেশ কয়েক ঘন্টা পরে। মাথার কাছে ঠান্ডা একটা কিছুর স্পর্শে। প্রথমে ঘুমের ঘোরে ও ভেবেছিল হাওয়া দিচ্ছে হয়ত! তারপরেই কপালে বরফশীতল কিছু একটা অনুভব করতেই ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙতেই চমকে হাত দিল কপালে। কি একটা যেন চ্যাট চ্যাট করছে। আঙুলে নিয়ে চোখের সামনে নিয়ে এসে দেখল। একী? রক্ত? কপালে রক্ত কোত্থেকে এল? সাথে সাথে বিছানা থেকে উঠে দৌড়ে গেল আয়নার দিকে। বাইরে এখনও অন্ধকার! ভোর হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু আলো ফোটেনি। তপন তাড়াতাড়ি বড় আলোটা জেলে আয়নার কাছে গিয়ে ভালো করে হাতটা দেখল। ঘরের লাল নাইট বাল্বের আলোতে যেটাকে রক্ত মনে হচ্ছিল সেটা আসলে…. চন্দন! তপনের মনে পড়ল, আজ তো ভাইফোঁটা। যে দিদি স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বার বার ওকে ফোন করে ডাকত, যার ফোন শেষদিকে ধরাই বন্ধ করে দিয়েছিল তপন বিরক্ত হয়ে, সেই দিদি কাল রাত্রে…

নিজের অজান্তেই চোখের কোন থেকে এক ফোঁটা জল বেরিয়ে এল তপনের।

ভাইফোঁটা

© অর্ণব

নভেম্বর, ২০২৩

নামহীন ১

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি