সোমা দেবী ফোন টা রেখে কিছুক্ষন ভাবলেন। তারপর নিজের মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই ফেসবুক টা কেমন রে?”

ওঁর মেয়ে রিংকি তখন কানে হেডফোনে গান শুনোট শুনতে ফেসবুক করছিল। ও বলল, “ওই আজকাল করে অনেকে। ছবি দেয়, গল্প করে ওই আর কি!”

সোমা দেবী বলল, “তোরা করিস না?”

তোর অর্থে রিংকি এবং রাতুল (ওঁর ছেলে)।

রিংকি বলল, “হ্যাঁ করি। খুব একটা না!”

সোমাদেবী একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, “আমাকে একটা ফেসবুক খুলে দিবি? আমিও করব!”

রিংকি ভুরু কুঁচকে বলল, “তুমি?”

সোমাদেবী বললেন, “হ্যাঁ আসলে, সুনীতা বলছিল ওরা সবাই করে। অনেক দূরের মানুষরা কোথায় কী করছে, কোথায় ঘুরছে সব জানা যাবে, দেখা যাবে!”

সুনীতা মানে সোমাদেবীর ছোটো বোন! দিল্লী তে থাকে।

রিংকি বলল, “ও তুমি পারবে না! অনেক ঝামেলা!”

“কী পারবে না?” ঘরে ঢুকল রাতুল। ঢুকেই জিজ্ঞেস করল কথাটা।

রিংকি বলল, “মা ফেসবুক করবে বলছে! সেই জন্যেই বলছিলাম পারবে না!”

রাতুল একবার তাকালো রিংকির দিকে। এই নিয়ে ওর আর রিংকির কথা হয়েছে আগে। মা বাবা যদি ফেসবুক করতে চায় যেন তেন প্রকারেণ আটকাতে হবে। কারন ফেসবুকে রিংকি অর বয়ফ্রেন্ডের সাথে ফটো দেয়। ঘুরতে যায় বিভিন্ন জায়গায়। এগুলো মা বাবার চোখে পড়লে চাপ! আর রাতুলেরও গার্লফ্রেন্ড আছে। হ্যাঁ তার কথা যদিও মা জানে, তাও এসব ওদের চোখে পড়লে কীভাবে নেবে কে জানে! সেই জন্যেই ওদের ফেসবুক করতে দেওয়া যাবে না এমনটাই আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিল ওরা।

রাতুলও বোনের সুরে সুর মেলালো! বলল, “ধুর! ওসব পারবে না তুমি! ছাড়ো!”

সোমা দেবী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর চলে গেলেন রান্নাঘরে। উনি জানেন নিজে নিজে ফেসবুক উনি খুলতে পারবেন না! কিন্তু খুলে দেওয়ার পরও কি নিজে কিছুই করতে পারবেন না? এতটাই কী অকর্মন্য উনি? কে জানে! মাঝে মাঝে এই বাড়িতে বড্ড একা লাগে ওঁর!

সেদিন রাত্রে রাতুল ঘরে ঢুকে দেখল মা বিছানায় শুয়ে ফোনে ছবি দেখছে। রাতুল জিজ্ঞেস করল, “কী করছ?”

সোমাদেবী ওকে দেখে উঠে বসলেন। বললেন, “সুনীতা রা গোয়া গিয়েছিল তার ছবি পাঠালো। ফেসবুকেই নাকি দিয়েছে সব! কিন্তু আমি তো আর দেখতে পাবো না। তাই মেসেজে পাঠালো! তোর কী খিদে পেয়েছে?”

রাতুলের খারাপ লাগল একটু। কী হবে ফেসবুক খুলে দিলে? ফ্রেন্ড রিক্যুয়েস্ট পাঠাবে? পাঠাক না। একজন মানুষের ফেসবুক করার শখ হয়েছে সে করবে। তাতে কী হবে?

ও বলল, “না মা। খিদে পাইনি। একটু পর খাবো!”

রাতুল গেল রিংকির ঘরে। রিংকি কে বলল , “শোন না… মায়ের ফেসবুক টা খুলে দিই বুঝলি?”

রিংকি আঁতকে উঠল। “মানে? কী বলছিস কি?”

রাতুল বলল, “কী আর হবে? করে দিই না। খারাপ লাগছে মায়ের!”

রিংকি বলল, “দ্যাখ আমি জানি তোর প্রেমের কথা মা জানে। কিন্তু আমার টা জানে না! এরপর আমাদের ফ্রেন্ড রিক্যুয়েস্ট পাঠাবে। আমাদের অ্যাকসেপ্ট করতে হবে! তখন?”

রাতুল বলল, “তুই আমার কথাটা শোন…

রিংকি বলল, “তুই আমার কথা ভাবছিস না একবারও! মা কে ফ্রেন্ডলিস্টে নিয়ে আমি ফেসবুকে থাকতে পারবো না!”

এমন সময়ই হঠাৎ দরজার কাছে সোমাদেবীর গলার আওয়াজ শোনা গেল।

উনি ডাকলেন, “আয় রে! খেতে আয় তোরা!”

রাতুল আর রিংকি পরস্পরের দিকে তাকালো! মা শুনে ফেলে নি তো! ইসস! আর একটু আস্তে বলা উচিত ছিল!

ওরা দু’জনে খেতে গেল। টেবিলে বসে ওরা সাথে সোমাদেবী আর ওদের বাবা অচিন্ত্যবাবু।

রাতুল আর রিংকির মাথায় তখন একটাই কথা ঘুরছে। মা শোনে নি তো ওদের কথা?

অচিন্ত্যবাবু খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা কেমন আছে?”

বাবা মানে সোমাদেবীর বাবা! খুব খারাপ অবস্থা। ক্যানসারের লাস্ট স্টেজ। ডাক্তার বলেছে আর বেশীদিন নেই!

সোমাদেবীর গলাটা কেঁপে গেল একটু। উনি বললেন, “ভালো না। আজ দাদা ফোন করেছিল। আর বেশীদিন না!”

অচিন্ত্যবাবু বললেন, “কবে যাবে জানিও। এই সময় ওখানে থাকাটা জরুরী!”

সোমাদেবী বললেন, “দাদার সাথে কথা বলে বলছি তোমাকে!

রাতুল আর রিংকি চুপচাপ খেয়ে উঠে গেল টেবিল থেকে! ওরা এখনও বুঝতে পারছে না মা সব শুনতে পেয়েছে কিনা।

বুঝতে পারল আরও কিছুক্ষন পরে। সোমাদেবী রান্নাঘর টা মুছে, বাসনপত্র নামিয়ে ওদের কাছে এলেন। রাতুল তখন ফোনে গেম খেলছিল আর রিংকি ইউটিউবে কিছু একটা দেখছিল। মাকে আসতে দেখে নড়ে চড়ে বসল ওরা।

মা রাতুলের ঘরে একটা জলের বোতল রেখে বলল, “ফেসবুক খুললে আমি তোদের ফ্রেন্ড হতে চাইবো না! দেখ তাহলে যদি…”

রিংকি আর থাকতে না পেরে বলল, “দাও তোমার ফোন টা দাও!”

সোমাদেবী ফোন এনে দিলেন ওকে। তারপর রিংকি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বানিয়ে দিল মায়ের।

রাতুল অবাক চোখে মাকে দেখছিল। মা কেমন অদ্ভুত ভাবে রিংকির কাছে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো, মেসেজ করা, কমেন্ট করা, রিয়্যাক্ট করা এগুলো বুঝছে।

ফেসবুকে গিয়েই অনেক পরিচিত কে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালেন সোমাদেবী। তবে নিজের কথা রেখেছিলেন রাতুল আর রিংকি কে নিজেদের স্পেস উনি দিয়েছেন। ওদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট উনি পাঠান নি। ওরাও নিজেদের কথা ভেবেই আর জোর করে নি।

ফোন টা এল পরের দিন দুপুরে। রাতুলদের মামাবাড়ি থেকে। অবস্থা ভালো না। দাদু সবাইকে দেখতে চাইছে! অচিন্ত্যবাবুকে অফিসে সাথে সাথে ফোন করলেন সোমাদেবী।

অচিন্ত্যবাবু ৪০ মিনিটের মধ্যে গাড়ি নিয়ে চলে এলেন বাড়িতে। ওরা সবাই রেডি হয়েছিল। অচিন্ত্যবাবু আসতেই বেরিয়ে পড়ল ওরা।

ওদের বাড়ি থেকে মামাবাড়ি ২ ঘন্টার রাস্তা। ড্রাইভার একটু স্পিডেই চালাচ্ছিল গাড়ি। ওদিক থেকে ওঁর দাদা বার বার ফোন করছে সোমাদেবী কে। বার বার জিজ্ঞেস করছে কোথায় তোরা?

সোমাদেবী শুধুই বলছেন, “আসছি! আসছি!”

গাড়ির মধ্যে একটা থমথমে পরিবেশ!

অচিন্ত্যবাবু ড্রাইভার কে বলছেন আরও জোরে চালাতে। সোমাদেবী জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছেন! সময় যেন কাটছেই না!

যাই হোক! ওদের মামাবাড়ি থেকে ওরা তখন মিনিট দু’য়েক দূরত্বে। সোমাদেবীর দাদা ফোন করলেন আবার!

সোমাদেবী ফোনটা ধরেই বললেন, “আসছি আমি। এই যে শিবমন্দিরের কাছে। আর ১ মিনিট লাগবে!”

ফোনের ও প্রান্ত থেকে কোনো উত্তর এল না। শুধু ওঁর দাদার দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ যেন প্রচন্ড জোরে ভেতরে গিয়ে লাগল। সব শেষ! বাবা আর নেই।

সোমাদেবী নিজে তৈরী ছিলেন এটার জন্য। উনি কাঁদলেন না। শক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দিকে গেলেন।

সে বাড়িতে তখন কান্নার রোল উঠেছে। সোমাদেবী বাড়িতে ঢুকে সোজা গেলেন বাবার বিছানার কাছে। হাঁটু গেড়ে বসে বাবার মাথায় একবার হাত বোলালেন!

বুকের ভেতর টা ফেটে যাচ্ছে ওর! না। উনি কাঁদবেন না। উনি কাঁদবেন না আজ!

অচিন্ত্যবাবু এগিয়ে গেলেন ওঁর পাশে। হাতটা ধরলেন ওঁর। সোমাদেবী উঠে দাঁড়ালেন। তারপর পিছিয়ে এলেন কয়েক পা। রিংকি এগিয়ে এসে ওর মা কে নিয়ে গেল পাশের ঘরে।

বিছানায় কতক্ষন বসেছিলেন জানেন না উনি। কান্নার স্বর আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। সন্ধ্যে হল। সোমাদেবীর দাদা এসে বললেন, “তুই আজ বাড়ি যা!”

সোমাদেবীর সম্বিৎ ফিরল। উনি বললেন, “কেন?”

দাদা বললেন, “কাল সকালে আসিস! জিনিসপত্র কিছুই আনিস নি তো! কালকে ধীরে সুস্থে আয়। অনেক কাজ আছে। থাকতে হবে তোকে ক’দিন!”

কথাটা দাদা ঠিকই বলেছে। সত্যি কিছু নিয়ে আসা হয় নি তাড়াহুড়োতে!

ওখান থেকে যখন বেরোলেন ওরা তখন প্রায় সাড়ে ৮ টা বাজে!

গাড়িতে আবারও সেই থমথমে পরিস্থিতি। কেউ কথা বলছে না কারুর সাথে। পথে শুধু গাড়ি থামিয়ে অচিন্ত্য বাবু রাত্রের খাবার নিলেন। গিয়ে নাহলে আবার সোমাদেবী কে রান্না করতে হবে।

রাত্রে অল্প কিছু মুখে দিয়ে শুতে গেল সবাই।

কিছুতেই ঘুম আসছে না সোমাদেবীর। বিছানায় ছটপট করছেন উনি। বাবার সাথে শেষ দেখাটাও হল না। কিন্তু উনি ঠিক করেছিলেন আজ কাঁদবেন না! এবং কাঁদেনও নি।

হঠাৎই টুং করে একটা আওয়াজ জানান দিল ফোনে কোনো নোটিফিকেশন এসেছে। সোমাদেবী ফোন টা হাতে নিয়ে দেখলেন ১২ টা বাজে। নোটিফিকেশন প্যানেল টা খুলে যে নোটিফিকেশন টা খুলে দেখলেন ফেসবুকে নতুন দু’টো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে। রাতুল আর রিংকির। দু’জনেরই।

আজ কাঁদবেন না ভেবেছিলেন সোমাদেবী। কিন্তু রাখতে পারলেন না সে কথা। খুব সামান্য একটা জিনিস। ফেসবুক নোটিফিকেশন। এতক্ষন ধরে অতি কষ্টে আটকে রাখা কান্না টা কে জাস্ট মুহুর্তের মধ্যে বের করে আনল। ডুকরে কেঁদে উঠলেন সোমাদেবী।

পাশে আর একটা শক্ত হাত, ওঁর হাতের ওপর হাত রাখল!

সেই কান্নার মুহুর্তেও সোমাদেবী বুঝলেন উনি একা নন!

কান্না

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি