রেস্টুরেন্টে ঢুকেই চারপাশ টা একবার দেখলেন নির্মল বাবু। এটা ওকে কোথায় নিয়ে আসা হল কে জানে। ধুর বুড়ো বয়সে আর এসব ভালো লাগে? নির্মলবাবু রিটায়ার করেছেন বছর পাঁচেক হল। এখন বাড়িতে বসে বই পড়তেই বেশী ভালোবাসেন। তার ওপর আজ আবার রবিবার।

আজ সকালে চা-বিস্কুট সহযোগে নিরানন্দবাজার পত্রিকা পড়ার সময়েই হঠাৎ নির্মল বাবুর মেয়ে এসে বলল, “বাবা! আজ কোথাও একটা যেতে হবে তোমায়!”

নির্মল বাবু প্রথমে ভাবলেন কিছু কিনতে বেরোতে হবে বোধহয়। জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন কি আনবেন। তার আগেই তাঁর মেয়ে বলল, “আজ তোমার জন্মদিন। আজ কিন্তু কিচ্ছু শুনবো না। আজ বাইরে খেতে যাবো আমরা!”

আজ ওঁর জন্মদিন? আশ্চর্য আজকাল আর সেভাবে সব কিছু মনে রাখতে পারছেন না তিনি। কেন কে জানে! বাইরে আজকাল আর খেতে যেতে ইচ্ছে করে না নির্মল বাবুর। যদিও উনি এখনও যেরকম ফিট তাতে শরীর খারাপ হয়তো করবে না। কিন্তু বড্ড বিরক্ত লাগে এই শরীরটা নাড়াতে।

নির্মল বাবু বললেন, “এসবের আবার কী দরকার? বাড়িতেই হোক না খাওয়া-দাওয়া?”

নির্মল বাবুর মেয়ে সোহিনী বলল, “না বাবা। মা চলে যাওয়ার পর থেকে তুমি কেমন যেন হয়ে গেছো। ঠিক না এটা। আজ তোমায় বাইরে যেতেই হবে।”

কথাটা সোহিনী ভুল বলে নি। মঞ্জুষার চলে যাওয়াটা ওঁকে খুব ধাক্কা দিয়েছে। কিন্তু থাক। আজ আর ওসব ভাববেন না উনি।

“কী হল বাবা? যাবে তো” সোহিনী আবার জিজ্ঞেস করল অধৈর্য গলায়।

নির্মল বাবু বললেন, “আচ্ছা ঠিক আছে। সে যাবো না হয়! তোর বর যাবে তো?”

সোহিনী বলল, “নাহ। আজ তোমাকে নিয়েই যাবো। তোমার স্পেশাল দিন বলে কথা!”

“জানো? মা কি বলত?”

প্রশ্নটা করেছে সোহিনী। এখন ওরা একটা গাড়িতে। ওলা না কি একটা বিদঘুটে জিনিস বুক করবে বলল ও। তারপর উনি দেখলেন একটা Maruti Swift Dezire এল ওদের নিতে। এই গাড়িটার এত বিচ্ছিরি কেন নাম কে জানে!

“কি বলত?” জিজ্ঞেস করলেন নির্মল বাবু।

সোহিনী বলল, “মা বলত তোমার জন্য নাকি ৬৫ বছরের জন্মদিন টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তোমার না। তোমাদের পরিবারের সমস্ত ছেলের জন্য।”

এই কথাটা নির্মল বাবু আগেও শুনেছেন। ওঁর মা ওকে বলেছিলেন। ওদের পরিবারের ছেলেদের ৬৫ বছর বয়স হলে নাকি ওদের জীবনটাই পালটে যায়। অদ্ভুত কিছু ব্যাপার ঘটে তাদের সাথে। যেটা নাকি সবাই সহ্য করতে পারে না। এই কারনেই উনি শুনেছিলেন ওঁর দাদু পাগল হয়ে গিয়েছিলেন শেষ বয়সে।

নির্মল বাবু বললেন, “ধুর! ওসব গাঁজাখুরি ব্যাপার! গল্প কথার মত শুনে আসছি ছোটো থেকেই।”

কথা বলতে বলতেই গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন নির্মল বাবু। দেখলেন প্রায় জনা ২০ ছেলে মেয়ে লাইন দিয়ে হেঁটে চলেছে। নির্মল বাবু একটু অবাক হলেন। এরা এরকম এতজন একসাথে দুপুর বেলা হেঁটে কোথায় যাচ্ছে?

“এই রে! দেখেছো কান্ড?”

সোহিনীর কথায় ফিরে তাকালেন নির্মল বাবু!

“কী হয়েছে?” জিজ্ঞেস করলেন উনি

সোহিনী বলল, “এই যে পেপারে একটা ভয়ংকর ছবি পাবলিশ হয়েছে আজ?”

“কি ছবি?” জিজ্ঞেস করলেন নির্মল বাবু।

সোহিনী বলল, “আইসিস এর একটা পোস্টার পাওয়া গেছে কোনো এক দেওয়ালে। যাতে লেখা আছে Coming Soon!”

নির্মলবাবু কিছু বললেন না। আইসিস কলকাতায় আসাটা নিঃসন্দেহে বড় একটা খবর। কিন্তু সেটা উনি কিই বা করতে পারেন? হয়তো চোখ বড় বড় করে গলাতে চমক এনে বলতে পারেন, “অ্যাঁ কি বলছিস কি?” তার বেশী কিছু করার ক্ষমতা ওঁর আছে কী?

“তাহলে? কী মনে হয়? তোমার কি সুপারপাওয়ার হবে?” জিজ্ঞেস করল সোহিনী।

ওরা এখন বসে আছে পার্ক স্ট্রীট এর একটা জমকালো রেস্টুরেন্টে। ওয়েটার একটু আগেই অর্ডার নিয়ে গেছে। সোহিনী ইংরেজীতে কি সব খাবারের নাম বলল উনি বুঝতে পারেন নি। শুধু চিকেন শব্দ টা চার বার মত শুনতে পেয়েছেন।

সোহিনীর প্রশ্ন শুনে হাসলেন নির্মলবাবু। বললেন, “কীসের সুপার পাওয়ার?”

সোহিনী বলল, “এই যে তোমার তো ৬৫ বছর হয়ে গেল আজ। তাহলে নিয়ম মত তোমার তো সুপার পাওয়ার আসা উচিত।”

নির্মল বাবু বললেন, “তুই এখনও ওই পারিবারিক গাঁজাখুরি গল্পটায় আটকে আছিস?”

সোহিনী বলল, “দেখো সবার সাথে হয়েছে? তোমার দাদুর সাথে হয়েছে। আমার দাদুর সাথে হয়েছে উনিও তো শুনেছিলাম চশমা ছাড়াই এক মাইল দূরের জিনিস স্পষ্ট দেখতে পেতেন!”

নির্মল বাবু আবার হাসলেন। ওর বাবার এই ক্ষমতার কথা সবাই জানতো। চোখ টা মারাত্মক ভালো ছিল ওঁর বাবার। ৭৫ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত চশমা লাগেনি।

এমন সময় নির্মল বাবুর হঠাৎ চোখ গেল পাশের টেবিলে বসে থাকা ছেলে মেয়ে গুলোর দিকে।

এই মেয়েটাকে উনি আগে কোথায় যেন দেখেছেন। কিন্তু কোথায় দেখেছেন মনে করতে পারলেন না। ছেলেটার দিকেও বার কয়েক দেখলেন উনি। কিন্তু ছেলেটাকে আগে দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না। কিন্তু মেয়েটাকে… কোথায় দেখেছেন?

“ও বাবা” সোহিনীর ডাকে সম্বিৎ ফিরল নির্মল বাবুর।

নির্মল বাবু বললেন, “হ্যাঁ বল।”

সোহিনী বলল, “কি ভাবছো?”

নির্মল বাবু মৃদু স্বরে বললেন, “আমাদের পাশের টেবিলের মেয়েটাকে তুই আগে কোথায় দেখেছিস? আমাদের পাড়ার মেয়ে কী?”

সোহিনী এক মুহুর্ত মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, “না তো। কেন? তোমার চেনা লাগছে?”

নির্মল বাবু বললেন, “হ্যাঁ। কোথায় যেন দেখেছি! কিন্তু মনে করতে পারছি না!”

সোহিনী বলল, “ছাড়ো তো ওসব! তুমি কি ড্রিংক নেবে কিছু?”

নির্মলবাবু একটু অবাক হলেন। বুঝতে পারলেন সোহিনী মদ খাবেন কিনা জিজ্ঞেস করছে! পৃথিবীটা কত বদলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ওঁর সময়ে বাবাকে এসব প্রশ্ন করার কথা উনি ভাবতেও পারতেন না। আর আজ…

সোহিনী বলল, “কী গো? খাবে?”

নির্মল বাবু না বললেন।

সোহিনী বলল, “ঠিক আছে। তাহলে তোমার জন্য Fresh Lime Soda বলছি। ওটা ভালো লাগবে তোমার!”

নির্মলবাবু কিছু বললেন না। উনি এসব অত ভালো বোঝেন না। আজ মেয়ে যা বলবে তাই খেতে হবে ওকে।

যে ওয়েটারটা এরপর সেই ড্রিংক নিয়ে এল তাকে দেখে আবার অবাক হলেন নির্মল বাবু। একেও তো কোথাও একটা দেখেছেন। কিন্তু কোথায়? স্ট্রেঞ্জ? এতটা স্মৃতিভ্রম হবে ওঁর?

সদ্য টেবিলে দিয়ে যাওয়া ফ্রেশ লাইম সোডায় এক চুমুক দিলেন নির্মল বাবু।

বাহ! বেশ ভালো তো! মেয়েকে সে কথা বলতে যাবেন এমন সময় একটা ব্যাপার হল। ওঁর পাশের টেবিলে আর একজন ওয়েটার এসে ছেলেটিকে বলল, “স্যার আপনার বাইকটা আপনি যেখানে পার্ক করেছেন ওটা আমাদের এন্ট্রান্স। একটু প্লিজ সরিয়ে দেবেন?”

ছেলেটি, “হ্যাঁ নিশ্চয় বলে উঠে চলে গেল”

কিন্তু নির্মলবাবুর সেদিকে হুঁশ নেই। উনি তখন দেখছেন সেই ওয়েটার কে। উনি হলফ করে বলতে পারেন উনি এই ওয়েটারটিকেও আগে দেখেছেন। কিন্তু কোথায় সেটা ওর মনে পড়ছে না। উনি কি আগে কখনও এখানে খেতে এসেছেন?

নাহ! অসম্ভব। আর তাও যদি হয়। ওনার পাশের টেবিলের মেয়েটিকেও ওর চেনা চেনা লাগছে কেন?

হঠাৎই সবটা মনে পড়ে গেল নির্মল বাবুর। একটু আগেই রাস্তায় যে ২০ জনকে একসাথে হেঁটে যেতে দেখেছিলেন তাদের মধ্যেই এই ৩ জন ছিল। হ্যাঁ। তাই তো। আর কারুর মুখ সেভাবে মনে পড়ছে না নির্মল বাবুর। তবে দূরে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। ওকে দেখেও মনে হল ওই ছেলেটিও ছিল ওই মিছিলে। কিন্তু কেন? কীসের মিছিল ছিল ওটা?

টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লেন নির্মল বাবু। ওঁর মাথা ঘুরছে! উনি আর এক মুহুর্ত থাকতে পারবেন না এখানে! সোহিনী অবাক হল বাবাকে উঠতে দেখে। বলল, “কী হল? কোথায় যাচ্ছো? শরীর খারাপ লাগছে?”

নির্মল বাবু কিছু না বলে মাথায় হাত দিয়ে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে।

সোহিনীর গলা শোনা গেল পেছনে। “কী হল বাবা? শরীর খারাপ করছে? বাড়ি যাবে?”

নির্মল বাবু বাইরে বেরিয়ে এসেই বসে পড়লেন ফুটপাথে! আর পারছেন না উনি। মাথার মধ্যে অসহ্য যন্ত্রনা। টেবিলের সেই ছেলেটাকে দেখলেন। বাইকটা সরিয়ে রাখছে সে। কিন্তু একে উনি ওই মিছিলে দেখেন নি। কেন? এর সাথের মেয়েটি তাহলে ওখানে কী করছিল?

উত্তর টা পাওয়া গেল কয়েক সেকেন্ড পরেই। সোহিনী তখন নির্মলবাবুর মাথায় হাত বোলাচ্ছিল আর জিজ্ঞেস করছিল “কী হয়েছে তোমার?”

হঠাৎই বিকট শব্দে চারপাশটা যেন কেঁপে উঠল। পর পর ৩ বার আওয়াজ হল। বিস্ফোরনের! আর ওদের পেছনের সেই রেস্টুরেন্টের বিল্ডিং টা থেকে ভেঙে পড়তে লাগল ইঁট পাথর! চারদিকে তখন হাহাকার শোনা যাচ্ছে। সোহিনী টেনে সরিয়ে নিয়ে এল নির্মলবাবু কে।

এত হাহাকারের মধ্যেও নির্মলবাবুর মনে তখন স্বস্তি। রাস্তার সেই মিছিলের অর্থ এখন উনি বুঝেছেন। সে মিছিল ছিল মৃত্যু মিছিল। তারাই সেই মিছিলে ছিল যাদের আজ বিস্ফোরনে মৃত্যু হওয়ার কথা ছিল। আজকে ওঁর ৬৫তম জন্মদিনে ওনার প্রাপ্তি এই যে আজ থেকে উনি মৃত্যু দেখতে পাবেন। সবার আগেই।

ঘটনাটা ঘটল তার কয়েক সেকেন্ড পরেই। সেই ভাঙা বিল্ডিং এর সামনে তখন ভিড় জমেছে। পরক্ষনেই নির্মল বাবু খেয়াল করলেন রাস্তার ঠিক উল্টোদিক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ওঁর মেয়ে সোহিনী। গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে এল নির্মল বাবুর। সোহিনী এই মুহুর্তে ওর হাত ধরে আছে। তাহলে রাস্তার ওপারে এইমাত্র ওটা উনি কাকে দেখছেন? হঠাৎই রাস্তার ওপারে একটা বাচ্চা ভীড়ের মধ্যে থেকে ছিটকে যেন বেরিয়ে এল। তারপর মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে। সোহিনী সাথে সাথেই এগিয়ে গেল বাচ্চাটাকে তুলবে বলে।

নির্মল বাবু ওকে আটকাতে গিয়েও পারলেন না। উল্টোদিক থেকে একটা লরি আসছে। প্রচন্ড স্পিডে! সোহিনী কি দেখেছে সেটা? মনে হয় না। চোখ বন্ধ করে ফেললেন নির্মলবাবু। আর একটা আওয়াজ হল! অস্ফুট! ‘বাবা’ শব্দটা শেষবারের মত কানে এল নির্মল বাবুর!

জন্মদিন

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি