অর্নব মন্ডল
প্রত্যেক বছর মহালয়া এলেই আমার ভয়টা বাড়তে থাকে। শরৎকালের রাতে কোকিল ডাকতে কেউ শুনেছে কিনা আমার জানা নেই। তবে আমি শুনি। সত্যি কথা বলতে কি আমাদের পরিবারের সবাই শোনে। আর সেটাই আমার ভয়ের কারন।
একটু খুলেই বলি সবটা। বছর পনেরো আগের কথা। সেবারও মহালয়া পড়েছিল অক্টোবর মাসে। আমার তখন ১৬ বছর বয়স। মহালয়ার দিন ভোরে উঠে রেডিওতে মহিষাসুর- মর্দিনি শোনার জন্য সবাই ব্যাকুল হয়ে থাকতাম। সেবারও মহালয়ার আগের রাতে যে যার ঘরে গিয়ে শোয়ার কিছুক্ষন পরেই প্রথম সবাই শুনলাম কোকিলের ডাক। অদ্ভুত এবং করুন সে আওয়াজ এল বাইরে থেকে। শরৎকালে কোকিল… ব্যাপারটা একটু আশ্চর্য লাগলেও গা করিনি কেউ। ভোরে উঠে রেডিওর আওয়াজ শুনতে পেলাম না। আমি যখন উঠলাম তখন বাড়ির সবাই উঠে পড়েছে। বাইরে গিয়ে দেখলাম দাদুর ঘরের সামনে ভীষন ভীড়। আমাদের একান্নবর্তী পরিবার। বাবা, কাকু, জ্যাঠামশাই সবাই একসাথে থাকত। কাছে গিয়ে দেখলাম আরাম কেদারায় শুয়ে আছেন দাদু। ঘাড়টা একদিকে নোয়ানো। মনে হচ্ছে যেন ঘুমোচ্ছেন। পাশের টেবিলে দাদুর রেডিওটা রাখা আছে। যেটার আওয়াজে প্রত্যেক মহালয়াতে আমাদের ঘুম ভাঙতো। দাদুর ঠোঁটের কোনে একটা লাল কিছু জমাট বেঁধে থাকতে দেখেছিলাম। রক্ত কিনা তখন বুঝিনি। পরে বুঝেছি।
এর ঠিক পরের বছর একই ভাবে চলে গেলেন ঠাকুমাও। সেই মহালয়ার আগের রাতে কোকিলের ডাক। তারপর এক জিনিস। এর পর দু’বছর আর কিছু ঘটেনি। দু’বছর পরে বাবা চলে গেলেন। তার তিন বছর পর কাকু। সত্যি কথা বলতে কী এই ঘটনার পর মহালয়া এলেই আমরা সবাই তটস্থ হয়ে থাকতাম। সবাই বলে দেবীপক্ষ নাকি খুশির বার্তা বয়ে আনে। কিন্তু আমাদের পরিবারের ক্ষেত্রে দেবীপক্ষ মৃত্যু ছাড়া কিছু আনেনি গত কয়েক বছরে।
আগের বছর মহালয়া পড়েছিল সেপ্টেম্বর মাসে। রাতে কারুর ঘুম হয়নি। ওই বছরই আমার বিয়ে হয়। সে রাত্রে কোকিলের ডাক শোনা মাত্র আমি বিছানা থেকে উঠে দৌড়েছিলাম মা এর ঘরে। মা এর শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। দরজাটা সঃশব্দে খুলে ঢুকে দেখলাম মা ঘুমোচ্ছে নিশ্চিন্ত মনে। সন্দেহ হওয়াতে লাইট জ্বালিয়ে দেখলাম সাদা বালিশের গা বেয়ে লাল কিছু একটা ইতিমধ্যেই জমাট বেধে গেছে। উৎসস্থল সেই ঠোঁটের কোন।
এই বছর অক্টোবার মাসে পড়েছে দুর্গাপূজো। মহালয়াও তাই। জানিনা এ বার কার পালা। জ্যাঠামশাই এর শরীরটা একদম ভালো নেই। খুব ঠান্ডা লেগেছে। তবে ওর তাতে গা নেই। রাত্রে ওর কাছে শোব বলাতে বললেন, “যদি মারা যাওয়ার হয় তো যাব। একদিন না একদিন তো যেতেই হবে। ”
রাত একটা তখন। শুতে গেলাম সবাই যে যার ঘরে। সারা বাড়িতে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। কোকিলের আওয়াজ এখনো শোনা যায় নি। কখন যে হঠাৎ একটু ঘুম ধরে গিয়েছিল টের পাইনি। ঘুম ভাঙতেই দেখলাম ৪ টে বেজে গেছে। ধড়ফড় করে উঠে ছুটলাম জ্যাঠামশাই এর ঘরের দিকে। ওর ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা। ভয় হল অঘটন হয়ত ঘটে গিয়েছে। ঘরের সামনে গিয়েই দেখলাম উনি ঘর থেকে বেরোচ্ছেন। আমার দিকে একবার তাকালেন কিন্তু কিছু বললেন না। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তাহলে বোধহয় এবারটা ভালোয় ভালোয় উতরে গেল। টেবিল থেকে একটা জলের বোতল নিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগোলাম। একটু আলো ফুটেছে তখন চারপাশে।
নিজের ঘরের সামনে গিয়ে যা দেখলাম তাতে একটা কনকনে ঠান্ডা স্রোত মেরুদন্ড বেয়ে নেমে গেল। হাত থেকে বোতলটা পড়ে গেল। জলে ভর্তি হতে লাগল মেঝেটা। আমার পায়েও জল লাগল কিন্তু কিচ্ছু অনুভব করতে পারলাম না। আর পারবই বা কী করে? বিছানায় আমার স্ত্রীর পাশে শোয়ানো আছে আমারই দেহটা। চোখটা খোলা। ঠোটের পাশের লাল দাগটা এই আবছা আলোতেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

Dada ami pray bohudin dhore apnar lekha pori durdanto lage kin2 ajj pray bochor duek por hotath chokh a porlo page ta ekhono ager motoi ache borong aro dhar bereche lekhar … aro balo likhun fb te obbosoi post korben
Porbo kotha dilam