hacklink hack forum hacklink film izle hacklink UAE online casinosmarsbahisสล็อตเว็บตรงholiganbetholiganbetBetAndreas AZbetciojojobet giriş

কলিং বেল টা বাজাতে গিয়েও একবার থেমে গেলেন ব্যারিস্টার মল্লিক। কী বলবেন সেটা একবার ভেবে নিলেন। মাঝে মাঝে হয় এরকম ওঁর। কথা হারিয়ে যায়। চিন্তার ঝুড়ি হাতড়ে আবার কথা বের করে আনতে হয়। বেল বাজালেন উনি। বর্মন বাড়িটা উত্তর কলকাতার একটা পুরোনো গলির মধ্যে। আশে পাশের বাড়ি গুলো ভেঙে ইতিমধ্যেই ফ্ল্যাট হতে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু এই একতলা বাড়ি টা অড ম্যান আউট এর মত নির্বিকার ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার পাশেই। ভেতর থেকে এক মহিলা মুখ বাড়ালেন।

“কাকে চাই?” জিজ্ঞেস করলেন মহিলা।

ব্যারিস্টার মল্লিক গলা খাঁকরে বললেন, “রুক্মিনী দেবীর সাথে একটু দেখা করার দরকার ছিল।”

মেয়েটি তৎক্ষনাৎ জবাব দিল দিদির শরীর টা ভালো নেই। এখন কথা বলতে পারবে না।

ব্যারিস্টার মল্লিক পকেট থেকে একটা ভিসিটিং কার্ড এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এটা তোমার দিদি কে দেখাও। ওঁর সাথে দেখা হওয়াটা জরুরী।”

মেয়েটা কিছু না বলে কার্ড টা নিয়ে ভেতরে চলে গেল। সাধারনত কারও সাথে কেস সংক্রান্ত কাজে দেখা করতে গেলে তার সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিয়ে নেন ব্যারিস্টার মল্লিক। এক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হয় নি। রাজ বর্মন এর স্ত্রী সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে যা জানা গিয়েছে তা হল উনি এমনি শান্তিপ্রিয় মহিলা। পাড়ার কারুর সাথে খুব একটা ঝামেলা নেই। বিয়ের আগে রবীন্দ্রভারতী তে দর্শন নিয়ে পড়েছেন। থিয়েটার করতেন খুব। দু’একবার পেপারে প্রশংসনীয় রিভিউ বেরিয়েছিল। তবে বিয়ের পর ওসব ছেড়ে দিয়ে সংসারে মন দিয়েছেন।

“আপনি ভেতরে আসুন।” মেয়েটি ডাকল ভেতরে।
তারপর নিয়ে গিয়ে বসালো বসার ঘরের সোফা তে। কিছুক্ষনের মধ্যেই এলেন রুক্মিনী বর্মন। ভদ্রমহিলা দেখতে বেশ সুন্দর। তবে বয়স খুব বেশী নয়। রাজ এর থেকে বেশ খানিক টা ছোটো বলে মনে হচ্ছে।
“আপনি আমার স্বামীর উকিল?” মেয়েটি পাশের চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল।

“আজ্ঞে হ্যাঁ” জবাব দিলেন ব্যারিস্টার মল্লিক।

– এখন কী ওর কাছ থেকেই আসছেন?
– নাহ। ওর কাছে আমি কাল গিয়েছিলাম। আজ আর যাই নি।
কিছুক্ষন দু’জনেই চুপ। ব্যারিস্টার মল্লিক একটু অবাক হলেন। এ কেমন বৌ রে বাবা! স্বামী কে নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করছে না। সাধারনত এরকম কেসে উনি দেখেছেন যে কোনো বৌ আগে বলে ওঠে “উকিল বাবু আমার স্বামী কে বাঁচান। ও নির্দোষ।” উনি ভেবেছিলেন এখানেও হয়তো ওই একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কিন্তু দেখা গেল তা হল না।

তবে নীরবতা ভাঙল রুক্মিনী নিজেই। বলল, “আপনি আমায় সব টা একটু খুলে বলবেন? কিচ্ছু বাদ দেবেন না। সে সত্যি যতই কঠিন হোক, আমি শুনতে চাই।”

ব্যারিস্টার মল্লিক রাজ এর সাথে সমস্ত কথোপকথন যতটা সম্ভব গুছিয়ে বলা যায় বললেন। সব শুনে রুক্মিনী একটু ভেবে তারপর বলল, “তার মানে ও চায় আমি বলি যে ও নটা বাজতে ১০ এ বাড়ি ঢুকেছে তাই তো?”

ব্যারিস্টার মল্লিক একটু অবাক হয়ে বললেন, “উনি ঢোকেন নি?”
রুক্মিনী বলল, “সেটা কথা নয়। আমি এটা বললে কী লাভ হবে কিছু? কোর্ট ছেড়ে দেবে ওকে?”

ব্যারিস্টার মল্লিক কিছু বলার আগেই আবার রুক্মিনী নিজেই বলল, “মানে আমি বলতে চাইছি, আমার এই বয়ানই কি যথেষ্ট ওকে ছাড়ানোর জন্য? আর কিছু প্রমান আছে আপনার কাছে আমার কথার সত্যি যাচাই করার? যাতে ও ছাড়া পাবে।”
ব্যারিস্টার মল্লিক মাথা নীচু করে বললেন, “না এই মুহুর্তে তো আর কিছু নেই।”

রুক্মিনী কিছু একটা ভাবছিল বোঝা যাচ্ছিল। বলল, “হুম”
ব্যারিস্টার মল্লিক খানিক পরে গলা ঝেড়ে বললেন, “আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থাটা –

– তাই? আপনি এর মধ্যেই বুঝে ফেললেন?
– না মানে এই অবস্থায় আর পাঁচটা মানুষের যে মনের অবস্থা থাকা উচিত। আর তাছাড়া আপনি এত ভালোবাসেন আপনার স্বামী কে –
রুক্মিনী সাথে সাথে মাথা তুলে বলল, “Excuse Me?”
ব্যারিস্টার মল্লিক এবার একটু চমকে গেলেন রুক্মিনীর গলার স্বর এর পরিবর্তন শুনে। এতক্ষন কেমন একটা নম্র ব্যাপার ছিল গলায়। আর সেটা পাচ্ছেন না।
রুক্মিনী আবার বলল, “আমি ওকে ভালোবাসি? এটা কে বলেছে আপনাকে? রাজ?”
ব্যারিস্টার মল্লিক এবার একটু আমতা আমতা করে বললেন, “হ্যাঁ মানে… উনিই তো বলছিলেন যে…
“তা আর কী বলেছে শুনি?” রুক্মিনী কথা শেষ না করতে দিয়েই জিজ্ঞেস করল।
– বলছিলেন যে আপনি আপনার স্বামীর জন্যে সব কিছু করতে পারবেন।

হঠাৎ প্রচন্ড জোরে হেসে উঠল রুক্মিনী। ব্যারিস্টার মল্লিক একটু অপ্রস্তুতে পড়ে গেলেন। তাহলে রাজ ওকে মিথ্যে কথা বলল? রুক্মিনী বলল, “রাজ আপনাকে বলেছে আমি ওর জন্য সব কিছু করতে পারি? Oh my god. ছেলেরা কি এতটাই বোকা হয়? কিচ্ছু বোঝে না?”
কথাটা বলেই আবার হাসতে লাগল ও। তারপর হাসি থামিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলল, “আমি ওকে ঘেন্না করি। শুনে নিন উকিল বাবু। আমি ওকে ঘেন্না করি। ফাঁসির দড়ি পড়ুক ওর গলায়। ও মরুক বাঁচুক। আমার কিস্যু যায় আসে না।”

ব্যারিস্টার মল্লিক তখন শব্দ হাতড়াচ্ছেন ভেতরে। ওঁর মত এরকম জাঁদরেল একজন উকিল বুঝতে পারছেন না কী বলবেন। রুক্মিনী একটু থেমে আবার বলল, “হয়তো আমার স্বপ্ন সত্যি হবে কী বলুন? হয়তো আমি দেখতে পাবো ওকে ফাঁসির দড়িতে। আমি যদি বলে দিই ও সেদিন ওই সময় বাড়ি আসে নি। তাহলেই তো সব শেষ। কী বলুন?”
ব্যারিস্টার মল্লিক বললেন, “আপনাকে আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে কেউ বলবে না মিসেস বর্মন।”

– স্বামী? কে স্বামী?
– মানে? কী বলছেন কী?
– রাজ আমার স্বামী নয়। বহুকাল আগে একটা স্বামী ছিল। কিন্তু সে পাগল ছিল। তার কাছ থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস দেখুন। যার কাছে এলাম সে আরও কত বড় জানোয়ার ভাবতে পারবেন না। রোজ রাতে আমাকে… আমাকে…
রুক্মিনী কথাটা শেষ করতে পারল না। একটু থেমে আবার নিজেই বলল, “আমি বলব ও অনেক দেরীতে বাড়ি ফিরেছে সেদিন। হাতে ছিল একটা রক্ত মাখা রড এটাও বলব আমি। ওকে আমি ফাঁসির দড়িতে ঝোলাবোই।”.
ব্যারিস্টার মল্লিক সোফা থেকে উঠে পড়লেন। তারপর বললেন, “শুধু শুধু আপনাকে আর বিরক্ত করে লাভ নেই। আমি আসি আজ। আমার ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলে আপনাকে যদি কিছু জানানোর থাকে জানিয়ে দেবো। কিংবা কোর্টে দেখা হবে আপনার সাথে।”
রুক্মিনীও চেয়ার থেকে উঠে জিজ্ঞেস করল, “একটা কথা আমায় বলুন তো? আপনি সত্যি ভেবেছিলেন রাজ নির্দোষ?”
– হুম। ভেবেছিলাম।
– উফফ! এত বোকা হয় পুরুষ রা? My goodness!
“এবং আমি এখনও মনে করি ও নির্দোষ। চলি।” কথাটা বলেই ব্যারিস্টার মল্লিক বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। আগামী দিনের লড়াই এর জন্য তৈরী হতে হবে। এবং সেটা খুব একটা সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। মেয়েরা সব সহ্য করতে পারে। অনেক টা সময় ধরেই পারে। ওদের ধৈর্য রয়েছে। কিন্তু সেই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে যে তারা কী ভয়ংকর হতে পারে তা তো দেখেই নিলেন উনি আজ। কিন্তু মেয়েটি যে কথাগুলো বলল, সেগুলো যদি সত্যি হয়। তাহলে… রাজ ছেলেটিকেও যতটা ভালো ভেবেছিলেন উনি তত ভালো নয়। কিন্তু তাই বলে খুন? না না। ছেলেটার পক্ষে কী খুন করা সম্ভব? 



ইন্দিরা রায় চৌধুরী হত্যার মূল সাক্ষী দু’জন। অপর্ণা মাইতি এবং রুক্মিনী বর্মন। দু’জনেই কোনো না কোনো কারনে অপছন্দ করে রাজ কে। কাজেই কোর্টে যেটা হওয়ার সেটাই হল। অপর্ণার কথা বাদই দেওয়া যাক। কারন ওর সাক্ষ্য টা খুব অনুমেয় ছিল। ওর ধারনা রাজ ই খুন করেছে ইন্দিরা দেবী কে। কিন্তু রুক্মিনী বর্মনও নিজের কথা রাখলেন। বাড়িতে যা যা বলেছিলেন ব্যারিস্টার মল্লিক কে ঠিক সেই কথা গুলোই আরও গুছিয়ে বললেন কোর্টে। দেরী করে বাড়িতে ঢোকা। হাতে রক্তমাখা রড। জামায় রক্ত।

কোর্ট হয়তো সেদিনই রায় দিয়ে দিত। দিল না শুধু একটাই কারনে। ইন্দিরা রায় চৌধুরীর এক ভাইপো রয়েছে। মন্দার রায়। তাকে গত কয়েক দিন ধরেই পাওয়া যাচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে সম্প্রতি ইন্দিরা দেবীর সাথে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না ওর। তবে বাড়ির পরিচারিকা অপর্ণা আবার ওকে খুব স্নেহ করে। যদিও এটা সেও অস্বীকার করতে পারছে না সেই দিন রাতে ইন্দিরা দেবীর সাথে কথা বলছিল এই ভাইপো। এই সম্ভাবনা টা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলেই স্থগিত রাখা হল কেসের সিদ্ধান্ত। জাজ সাহেব পুলিশ কে হুকুম দিলেন ওই ভাইপো কে খুঁজে আনার।

কেসের দিন সন্ধ্যে বেলায় এমন একটা ঘটনা ঘটল যেটা এই মামলার মোড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিল। সন্ধ্যেবেলা নিজের চেম্বারে ফিরেই একটা খাম পেলেন ব্যারিস্টার মল্লিক। কোনো পোস্ট অফিসের ছাপ নেই তাতে। খাম ছিঁড়তেই ভেতর থেকে বেরোলো একটা চিঠি। বেশ কিছু বানান ভুল রয়েছে তাতে। চিঠিতে লেখা –

মসাই,
রাজ বর্মন কে বাঁচাতে চান? আর ওর ঐ মিথ্যেবাদী বৌটাকে হাতে নাতে ধড়তে চান? তালে আজ রাত ৮ টায় গিরিশ পার্ক এর কাছে ১৩ নম্বর দর্জিপাড়া লেন এর পাশের বারিতে আশুন। একা আসবেন। এসে চুমকির খোঁজ কড়বেন। আর সাথে ৫০০০ টাকা আনবেন। 

চিঠিটা পড়ে একবার ব্যারিস্টার মল্লিক এর মনে হল এটা fake ও হতে পারে। ওকে কোনো ফাঁদে ফেলার চেষ্টা কী? কিন্তু একটু ভাবার পর মনে হল আসল চিঠি না নকল সেটা গিয়েই দেখা যাক। সেন্ট্রাল এ ওর চেম্বার থেকে গিরিশ পার্ক যেতে এমনিতেও খুব একটা খুব সময় লাগবে না। আর এটাই হয়তো রাজ বর্মনের শেষ আশা। একজন নির্দোষ মানুষ এভাবে শাস্তি পাবে এটা কোনোভাবেই মানতে পারছিলেন না উনি।
ঘড়ির দিকে দেখলেন ব্যারিস্টার মল্লিক। ৭ টা ২৫ বাজে। চোখ থেকে চশমাটা খুলে একবার শার্ট দিয়ে মুছে নিলেন। তারপর আবার সেটা পরে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন দর্জি পাড়া লেনের দিকে।

***
১৩ নং দর্জি পাড়া লেনের পাশের বাড়ি টা একটা দোতলা বাড়ি। তবে বাড়িটার গায়ে কোনো নাম্বার নেই। দোতলার একটা ঘর থেকে ক্ষীন একটা আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। ব্যারিস্টার মল্লিক সামনের অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেন ওপরে। ওপরে যে ঘর টা থেকে একটা আলো দেখা যাচ্ছিল সেটায় তিনবার টোকা দিলেন তিনি। কেউ খুললো না। একটু গলা ঝেড়ে উনি জিজ্ঞেস করলেন, “কেউ আছেন ভেতরে?”
আবার কোনো আওয়াজ নেই। এবার একটু জোরে ধাক্কা মারলেন উনি দরজায়। তিন বার। তারপর আবার বললেন “হ্যালো? কেউ আছেন?”
ভেতরে এবার একটা খস খস শব্দ শোনা গেল। কয়েক মুহুর্ত পরেই খুলে গেল দরজা। ভেতরে আলো এতটাই কম যে কাউকে দেখতে পেলেন না ব্যারিস্টার মল্লিক। একটু গা ছম ছম করছিল ওঁর। তার ওপর সাথে লাইসেন্সড রিভলবার টাও আনেন নি। কিছু বিপদ হলে কে বাঁচাবে। এসব ভাবতে ভাবতেই ভেতরে ঢুকলেন তিনি। হঠাৎ আওয়াজ করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। চমকে পেছনে তাকিয়ে দেখলেন একটা ঘোমটা পরা মেয়ে। শরীর তার কুঁজো হয়ে গিয়েছে কোনো কারনে। পরনে একটা পুরোনো ছেঁড়া শাড়ি।

মহিলা এবার খোনা গলায় বলল, “সাথে কাউকে নিয়ে আসোনি তো? আমার সাথে ধাপ্পাবাজি করলে তার ফল কিন্তু ভালো হবেনা।”
“না। আমি একাই এসেছি” ব্যারিস্টার মল্লিক জবাব দিলেন, “এবার দেখি কী রয়েছে তোমার কাছে? যেটা দিয়ে রাজ বর্মন কে বাঁচানো যাবে?”
ঘর টা এক ঝলক দেখে যা মনে হল খুব নোংরা। আসবাব পত্র বিশেষ নেই। একটা কাঠের আলমারি আছে। তার একটা পাল্লা ভাঙা। ঘরের কোন থেকে একটা বোঁটকা গন্ধ আসছে। ব্যারিস্টার মল্লিক পকেট থেকে রুমাল বের করে নাক চাপা দিলেন।
মেয়েটি বলল, “কী? কী ভাবছো? আমার মুখটা কেন ঘোমটায় ঢাকা? দেখবে আমাকে? দেখতে চাও?”

ব্যারিস্টার মল্লিক কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই সে নিজের মুখ ঘোমটা সরিয়ে দিল। মুখের একটা পাশ পুরো পুড়ে গিয়েছে। দেখলেই গা টা গুলিয়ে ওঠে। ব্যারিস্টার মল্লিক চোখ টা সরিয়ে নিলেন অন্য দিকে।
মেয়েটি আবার বলল, “কী? ঘেন্না লাগছে তাই না? লাগবারই কথা যদিও। কিন্তু জানো আমিও আগে খুব সুন্দর দেখতে ছিলাম। ঐ শয়তান মেয়েছেলেটার থেকেও সুন্দর। এখন যদিও বিশ্বাস হবেনা তোমার। এই তো গেল বছর, দু’টো ছেলে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারল আমার দিকে। সব ঐ মাগীটারই কাজ। ওই লোক লাগিয়ে করালো এসব। তার প্রতিশোধ আমি তো নেবোই।”

ব্যারিস্টার মল্লিক এবার অধৈর্য গলায় বললেন, “ঠিক আছে ঠিক আছে। আমার হাতে সময় নেই। আমি এখানে এসেছি আমার ক্লায়েন্ট এর জন্য। কাজের জিনিস কিছু থাকলে দেখাও নাহলে আমি চললাম।”
মেয়েটি এবার বলল, “আর আমার কাজের জিনিস? টাকা কোথায় টাকা?”

ব্যারিস্টার মল্লিক ভারী গলায় বললেন, “পুলিশের কেসে সাহায্য করা তোমার কর্তব্য। তুমি কি জানো আমায় বলো। তারপর তোমাকে কোর্টে ডেকে পাঠানো হবে।”

মেয়েটি বলল, “আমি তো কিছুই জানিনা বাবু। আমার বয়স হয়েছে। স্মৃতিশক্তি টাও কমে এসেছে। তবে ঐ হাজার পাঁচেক টাকা পেলে হয়তো কিছু মনে পড়তেও পারে।”

– কী মনে পড়তে পারে? কী ধরনের প্রমান তুমি দিতে চাইছো শুনি আগে।
– চিঠি। ওই বেহায়া মেয়েছেলেটার লেখা কয়েকটা চিঠি। তোমার কাজে লাগবে এরকমই কিছু চিঠি। তবে ওই… পাঁচ হাজার টাকা।
– আমি ৫০০ টাকা দিতে পারি। তার বেশী একটা টাকাও দেবো না।
– ৫০০?
– ৬০০। ৬০০ টাকা দেবো। আমার কাছে এই মুহুর্তে ওর চেয়ে বেশী আর নেই।

কথাটা বলেই পকেট থেকে ৬০০ টাকা বের করলেন ব্যারিস্টার মল্লিক। প্রথমে মেয়েটি রাজি হয় নি অত কম টাকায় দিতে। শেষে যখন ব্যারিস্টার মল্লিক চলে যাওয়ার ভান করলেন তখন মেয়েটি বাধ্য হয়ে হাল ছেড়ে দিল। ব্যারিস্টার মল্লিক এর মনে হচ্ছিল মেয়েটির কাছে ব্যাপার টা ব্যক্তিগত। বার বার যাকে বেহায়া মেয়েছেলে বলছে সেটাই বা কে? একটু পরেই পরিস্কার হল সব টা।

মেয়েটি ঘরের কোনে রাখা তক্তপোষ এর ওপর পাতা চাদর এর নীচ থেকে কয়েকটা খাম বের করল। তারপর ছুঁড়ে দিল ব্যারিস্টার মল্লিক এর দিকে। তারপর বলল, “ওই ওপরের টা। ওটা তেই কাজ হবে।”
ব্যারিস্টার মল্লিক সব কটা চিঠি ভালো করে খুঁটিয়ে পড়লেন। সবার ওপরের টা পড়লেন দু’বার। তারপর সব কটা চিঠি তুলে নিয়ে পকেটে রাখলেন। চিঠি গুলো রুক্মিনী বর্মনের লেখা প্রেম পত্র। তবে তাঁর স্বামী কে না। অন্য একজন কে। তারিখ দেখে বোঝা যাচ্ছে প্রথম চিঠি টা রাজ বর্মন এর অ্যারেস্ট এর দিন লেখা হয়েছিল।

ব্যারিস্টার মল্লিক জিজ্ঞেস করলেন, “এ চিঠি তোমার কাছে এলো কী করে?”

মেয়েটি বলল, “সে সব জেনে কী হবে? আমি তো বলেছিলাম এমন জিনিস দেবো তাতে কাজ হবে। এই বার ওই মাগী টা বুঝবে আমার স্বামী কে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার ফল।”

– মানে?
– ওই তো যাকে চিঠি লিখেছে মেয়েটা সে আমার বর ছিল। তার মাথা খেয়ে তাকে সরিয়ে নিয়ে গেল আমার থেকে। তারপর আমার রূপ টা নষ্ট করলো। আমি সেদিন থেকে তক্কে তক্কে আছি। সব সময় নজরে নজরে রেখেছি। আমি জানতাম আমারও সুযোগ আসবে।

“হুম। এটার জন্যে হয়তো মেয়েটার মাস কয়েক এর জেল হতে পারে?” ব্যারিস্টার মল্লিক বললেন বিড়বিড় করে।

মেয়েটি ঝাঁঝিয়ে উঠল, “মাস কয়েক? মাত্র কয়েক মাসের জেল হবে? হোক… তাই হোক। জেলে পচে মরুক মেয়েটা।… একি কোথায় যাচ্ছো? টাকা কই? আমার টাকা?”

ব্যারিস্টার মল্লিক ৬০০ টাকা টেবিলে রেখে বেরিয়ে এলেন বাড়িটা থেকে। আসার আগে দেখলেন মেয়েটি টাকাগুলোর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।



ব্যারিস্টার মল্লিকের শুরু থেকেই মনে হয়েছিল রুক্মিনী মানে রাজ বর্মনের স্ত্রী মিথ্যে বলছে। কিন্তু কোনো প্রমান ছিল না। কিন্তু এখন আছে। এখন এমন একটা জিনিস আছে ব্যারিস্টার মল্লিকের কাছে যেটা দিয়ে ছেলেটিকে বাঁচানো সম্ভব।

কোর্টে মামলা শুরু হওয়ার পর সাক্ষী হিসেবে ডাকা হল রুক্মিনী বর্মন কে। ব্যারিস্টার মল্লিকই ডাকলেন। তারপর আগের করা প্রশ্ন গুলো আবার করলেন তাঁকে। রুক্মিনী আগের মতই জবাব দিল রাজ বর্মনের বিরুদ্ধে। এরপর কোর্টে পেশ করা হল সেই চিঠি। রুক্মিনীর হাতের লেখায় সে চিঠির বিষয়বস্তু ছিল এরকম।

“সমীরন, শেষ পর্যন্ত আমাদের ভাগ্য খুললো। ভগবান মুখ তুলে চাইলেন আমাদের ওপর। রাজ কে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে জানো। রাজ যে কিনা একটা মাছিও মারতে দু’বার ভাবে। তাকে কোন এক বুড়ি কে খুনের অভিযোগে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। শুধুমাত্র আমি যদি সত্যি টা বলি যে সেদিন ও সত্যিই ৯ টার আগেই বাড়ি ফিরেছিল তবেই ও বাঁচবে। কিন্তু আমি তা বলব না। এত সহজে ওকে আমি ছাড়বো না। আমি বলব ওর গায়ে রক্ত লেগেছিল। জানো এই কেসে ওর ফাঁসি অবধি হতে পারে। এটা হলে তুমি আমি বাকি জীবন টা দারুন ভাবে কাটাতে পারব। আর মাত্র ক’টা দিন অপেক্ষা করো। তারপরেই আর কোনো বাধা থাকবেনা আমাদের পথে। রুক্মিনী শুধু তোমারই হবে। শুধু তোমার।”

এই চিঠি পেশ কোর্টে পেশ করার পর ভেঙে পড়লেন রুক্মিনী বর্মন। তারপর বাধ্য হয়ে স্বীকার করলেন সব। না স্বীকার করে উপায় ছিল না। রুক্মিনীই যে চিঠি টা লিখেছেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। হাতের লেখা হুবহু এক। উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমান না থাকায় শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া হল রাজ বর্মন কে। এবং কোর্টে মিথ্যে সাক্ষী দেওয়ার জন্য ৬ মাসের কারাদন্ড দেওয়া হল রুক্মিনী বর্মন কে।

ব্যারিস্টার মল্লিক চশমাটা চোখ থেকে খুলে মুছতে মুছতে কোর্টরুম থেকে বেরোচ্ছিলেন। ওঁর স্ত্রী কাল রাতে বলছিলেন এটা নাকি এখন উনি বড্ড বেশী করছেন। চশমা পরিস্কার থাকলেও তিনি চশমা পরিস্কার করছেন। উনি বললেন “আমরা অভ্যাসের দাস। মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই অভ্যাসের বশে এমন সব কাজ করে ফেলি যে…”
হঠাৎ ওঁর মনে পড়ল সাক্ষীর আসনে দাঁড়িয়ে রুক্মিনী বর্মন এক হাতের তালু আর এক হাতে ঘষছিলেন অন্যমনস্ক ভাবে। এটাও তো একটা অভ্যেস! কিন্তু ঠিক এই জিনিসটাই উনি আর একটা কাউকে করতে দেখেছেন সম্প্রতি। কিন্তু কাকে? সেটা মনে করতে আর একটু সময় লাগল। মনে পড়ার সাথে সাথেই ওর মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল। উনি দৌড়ে গেলেন সেদিকে যেদিকে পুলিশ মিসেস রুক্মিনী বর্মন কে নিয়ে যাচ্ছে জেলের দিকে।

ব্যারিস্টার মল্লিক কে অবাক চোখে আসতে দেখেই রুক্মিনী ব্যাপার টা বুঝে গিয়েছিল। বলল, “আপনি তাহলে ধরে ফেলেছেন?”
ব্যারিস্টার মল্লিক বললেন, “হ্যাঁ মানে… তুমি? ওই গলির মহিলা?”
রুক্মিনী হাসল। ব্যারিস্টার মল্লিক বললেন, “কিন্তু কীভাবে?”
রুক্মিনী বলল, “আপনি শুনেছেন কিনা জানিনা। আমি থিয়েটার টা একসময় দারুনভাবে করেছি। আমার কাছে মেক আপ বা গলা পরিবর্তন কোনো ব্যাপারই না!”

ব্যারিস্টার মল্লিক বললেন, “কিন্তু এসবের কোনো দরকার ছিল না। এমনিই কিন্তু রাজ কে আমি বাঁচাতে পারতাম। আমার তো মনেই হয়েছিল ও খুন টা করে নি।”

– হয়তো পারতেন। কিন্তু ‘হয়তো’র ওপর আমি আমার স্বামীর ভাগ্য ছেড়ে রাখতে পারি না। ও তো আপনাকে বলেই ছিল। আমি ওর জন্যে সব করতে পারি। আর তাছাড়া আপনার মনে হয়েছিল ও খুন টা করেনি। কিন্তু আমি Surely জানতাম যে – ”

ব্যারিস্টার মল্লিক রুক্মিনীর মুখের কথা ছিনিয়ে বললেন, “হ্যাঁ। আপনি জানতেন যে ও খুন টা করে নি। বুঝতে পারছি। আপনি ওঁর স্ত্রী। এটাই তো স্বাভাবিক।”

রুক্মিনী বলল, “আপনি ভুল করছেন। আমি বলতে চাইছি যে আপনার মনে হয়েছিল ও খুন করে নি। কিন্তু আমি জানতাম যে ওই খুন টা করেছে।”

রাজসাক্ষী – শেষ পর্ব

Arnab Mondal


হিজিবিজি লেখা আর বিরিয়ানি নিয়ে Phd করছি আর আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কন্ঠস্বর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছি।


Post navigation


One thought on “রাজসাক্ষী – শেষ পর্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা/দিদি