“বারোয়াড়ি দুর্গা পূজো ব্যাপারটা এখন প্রায় উঠেই গেছে বলা যায়। খুব বনেদী বাড়িতে এখনও হয় ঠিকই কিন্তু তাও সেই হাতে গোনা কয়েকটা। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন দেখেছি। আমার বাড়িতে হত দূর্গাপুজো। এখনও হয় না বললে ভুল হবে। এখনও আমাদের বাড়ির মন্ডপেই হয় পূজো। তবে সেটা আর আমাদের বাড়ির পূজো নেই। পাড়ার সার্বজনীন পূজো হয়ে গেছে। কারন চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে ঠাকুর নিয়ে আসা অবধি সবকিছুই পাড়ার ক্লাবটাই করে।”

এই অবধি লিখে পারিজাতবাবু থামলেন। নাহ্‌ ঠিক দাঁড়াচ্ছে না ব্যাপারটা। এইভাবে লেখা শুরু করলে এটাও প্রকাশকের কাছ থেকে রিজেক্ট হয়ে ফিরে আসবে। তার ওপর যা চলছে বাড়িতে, এভাবে চলতে থাকলে আর ক’দিন পর খেতেও পাবেন না। খাওয়ার কথায় মাথায় আসতেই ঘড়ির দিকে তাকালেন তিনি। ২ টো বেজে গেছে কিন্তু কেউ খেতে ডাকেনি আজ!  পরক্ষনেই মনে পড়ল ডাকবেই বা কে? ওনার স্ত্রী তো গত ৫ দিন ওঁর সাথে কথা বলছেন না।

অবশ্য ওরও দোষ দেখেন না পারিজাতবাবু। কারও স্বামী যদি চাকরি ছেড়ে দিয়ে দিনের পর দিন এইভাবে ঘরে বসে লেখক হওয়ার আশায় বসে থাকে তাতে রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন উনি। রান্নাঘরে গিয়ে দেখতে হবে খাবারের কি ব্যবস্থা।

* * *

পারিজাত চক্রবর্তী প্রায় ২২ বছর স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। বিদ্যাসাগর উচ্চ বিদ্যালয়ে বাংলা পড়াতেন উনি। গল্প লেখার এই বাতিক ওঁর হঠাৎ নয়। কলেজে পড়ার সময়েই সত্যজিৎ রায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, বুদ্ধদেব গুহর লেখা পড়ে ওর খুব গল্প লিখতে ইচ্ছে করত। কিন্তু সব সময়ই মনে হত আমি কি পারব? এই ভাবনাটাই ওকে এগোতে দেয়নি তখন।

কিন্তু একটা ছোট্ট ঘটনা সব কিছু পালটে দেয়। রোজকার মত সেদিনও ১২ টা ১০ এ ক্লাস নিতে ঢুকেছিলেন পারিজাতবাবু। ক্লাস নাইন। নাম প্রেজেন্ট করার পরেই প্রতীম নামে একটি ছেলে ওর কাছে উঠে এল হাতে একটা বই নিয়ে। উনি ছেলেটিকে চেনেন। বেশ চৌকস ছেলে।

“কি ব্যাপার প্রতীম? কিছু বলবে?” জিজ্ঞেস করলেন পারিজাত বাবু।

প্রতীম হাতের বইটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “স্যার আমার একটা গল্প বেরিয়েছে এই পত্রিকায়!”

“তাই? কই দেখি!” পত্রিকা টা সামনে টেনে দেখলেন পত্রিকার নাম ‘আনন্দসঙ্গী’। কিশোরদের পত্রিকা। তারপর সূচিপত্র খুলে দেখলেন গল্প বিভাগের প্রথমেই রয়েছে প্রতীম দত্ত র নাম। গল্পটির নাম ‘বিজয়ী’। পত্রিকাটা ফেরৎ দিতে যেতেই প্রতীম বলল, “স্যার এটা আপনার জন্যই এনেছিলাম। আমার কাছে আর একটা আছে।”

খুব ভালো লাগল পারিজাতবাবুর। হয়ত এই ব্যাপারে ওঁর কোনো অবদান নেই। কিন্তু তাও একটা অন্যরকম ভালো লাগল ওঁর। পরে স্টাফ রুমে বসে গল্পটা পড়ার পর ওর মনে হল, আরে! এরকম গল্প তো উনিও লিখতে পারবেন। এতদিন কেন চেষ্টা করেননি।

বাড়িতে ফেরার পথে একটা নতুন খাতা কিনলেন। তারপর ফিরেই বসে গেলেন লিখতে। কিন্তু কিছুক্ষন ছাড়াই একটা করে বাধা আসতে লাগল। প্রথম বাধা এল ১০ মিনিট পর। ওর স্ত্রী এসে চা খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলেন। তার আধঘন্টা পরেই ছাত্র রা পড়তে চলে এল। উনি ভুলেই গিয়েছিলেন রোজ সন্ধ্যে বেলায় ওঁর পড়ানো থাকে। তবে সেদিন আর উনি পড়াননি। বলে দিলেন আজ শরীর খারাপ তাই আজ পড়াবেন না।

এই সব সেরে লিখতে বসার কয়েক মিনিট পরেই ওর স্ত্রী এসে বললেন,

“কি লিখছো গো?”

“গল্প।” যতটা সম্ভব সংক্ষেপে উত্তর দেওয়া যায় তার চেষ্টা করলেন পারিজাত বাবু।

“কেন হঠাৎ!”

“এমনিই ইচ্ছে হল। কিছু বলবে?”

“হ্যাঁ বলছি আজ তো ৩০ তারিখ হয়ে গেল। এ মাসের ফর্দটা একটু দিয়ে এসো কমলবাবুর দোকানে।”

এবার একটু বিরক্ত হলেন পারিজাত বাবু। এই সময়েই যত ঝামেলার উদয় হতে হল?
উনি বললেন, “অনি কে বলো না। ও কোথায়।”

অনি অর্থাৎ অনির্বান। পারিজাত বাবুর ছেলে। সবে M Tech পাশ করেছে।

ওনার স্ত্রী বললেন, “ও তো একটু বেরিয়েছে। তুমিই যাও।”

আর কথা বাড়াননি পারিজাতবাবু। পাজামা পরেই ছিলেন। পাঞ্জাবীটা পরে ফর্দটা নিয়েই বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

* * *

রান্নাঘরে গিয়ে পারিজাত বাবু দেখলেন কেউ কোথাও নেই। শুধু টেবিলে একটা থালা ঢাকা দেওয়া রয়েছে। ঢাকাটা খুলেই বুঝতে পারলেন ওঁর জন্যই রাখা খাবারটা।

চাকরি ছেড়েছেন প্রায় ছ’মাস হয়ে গেল। কারন ওঁর মনে হচ্ছিল এই চাকরিটার জন্যেই ওঁর লেখা ঠিক আসছে না। স্কুলের খাতা দেখা, ছাত্র পড়ানো সব কিছুতেই অনীহা এসে গিয়েছিল ওঁর। তাই সব কিছু বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন শুধু লেখা নিয়েই থাকেন। কিন্তু তাও যেন ঠিক হচ্ছে না। বেশ কয়েক জায়গায় লেখা পাঠানো সত্ত্বেও উত্তর আসেনি। তবে চেষ্টা থামাননি উনি। এই তো সামনে পূজো আসছে। তাই পূজো সংক্রান্ত একটা লেখা শুরু করেছেন দেখা যাক কি হয়।

ওনার থালার পাশেই টেবিলের ওপর একটা চিরকূট চোখে পড়ল পারিজাত বাবুর। খেতে খেতেই বাঁ হাতে করে কাগজটা সোজা করলেন উনি। হাতের লেখাটা ওঁর স্ত্রীর এটা বুঝতে অসুবিধে হল না। এত সুন্দর হাতের লেখা আর কারও হতেই পারে না।

চিরকূটে লেখা –

“আমার পক্ষে আর এভাবে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। প্রথমে ভেবেছিলাম এই পাগলামিটা মানিয়ে নেব। কিন্তু পারছি না আর। আমার ডিভোর্স চাই। কিছু জিনিস নিয়ে গেলাম। বাকি পরে এসে নিয়ে যাব।

ইতি – ইন্দ্রানী”

আর খেতে পারলেন না পারিজাত বাবু। উঠে পড়লেন টেবিল ছেড়ে।

 

ইন্দ্রানী দেবীর জন্ম আসামে হলেও ছোটবেলা থেকে প্রায় পুরোটাই কেটেছে কলকাতা শহরে। বাবার চাকরীর কারনে তিন বছর বয়সে ওঁকে কলকাতা চলে আসতে হয়। তারপর থেকে আর যাওয়া হয়নি। অনেক দিন থেকেই ভেবে রেখেছিলেন এ বার পুজোয় ওঁদের তেজপুরের বাড়িতে গিয়ে থাকবেন। কিন্তু বাড়ির পরিবেশের কারনে কথাটা তুলতে পারেন নি স্বামীর কাছে।

কয়েক মাস আগে অবধি এরকম ছিল না সবকিছু। হঠাৎ করে ওঁর স্বামীর ইচ্ছে হল। লেখক হবেন। কারন? কারন ওঁর নাকি ছোটোবেলা থেকে এটাই ইচ্ছে। সব ইচ্ছে কি সবার পূরন হয় নাকি? ইন্দ্রানী দেবীরও ইচ্ছে ছিল চিত্রশিল্পী হবেন। ছবি আঁকা নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন উনি। সেই স্বপ্ন পূরন করার জন্যে কি সংসার ছেড়ে দিয়ে রঙ তুলি নিয়ে বসেছেন? মানুষ স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে , পরিস্থিতির সাথে সাথে মানিয়ে নিতে গেলে পুরোনো স্বপ্ন গুলো কে ধরে বেঁচে থাকলে হয় না। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে হয়।

“কোথায় নামবেন বলবেন দিদি!” ড্রাইভারের ডাকে সম্বিৎ ফিরল ইন্দ্রানী দেবীর।

জানলার কাঁচ নামিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলেন কতদূর এলেন। তারপর বললেন, “পরের মোড় টা থেকে ডানদিক নিয়ে নিন। তারপর একটু এগিয়ে ‘অমৃত সুইটস’ এর কাছে নামাবেন আমায়।”

ড্রাইভার কিছু বলল না।

উত্তর কলকাতায় ওঁর নিজের বাড়ি রয়েছে। কেউ থাকে না এখন সেখানে।  আজ ওখানেই যাচ্ছেন উনি।

অনেক দিন ধরেই বাড়িতে ঝামেলা চলছে ইন্দ্রানী দেবীর। মাঝে মাঝেই কথা বন্ধ। কষ্ট করে সংসার চলছে কিন্তু আজ আর পারলেন না। আজ ওঁর আর পারিজাতবাবুর পঁচিশতম বিবাহ বার্ষিকী। কিন্তু ওঁর স্বামীর সে ব্যাপারে কোনো হুঁশ নেই। আর কত দিন এভাবে চলত। এদিকে অনির্বান একবার বেরোলে আর বাড়ি ফিরতে চায় না। আর সেটা খুব অস্বাভাবিকও না। ঠান্ডা যুদ্ধের মাঝে কেই বা পড়তে চায়।

প্রথম দিকে স্বামীর এই গল্প লেখক হওয়ার রোগ টাকে খুব ভালোভাবেই নিয়েছিলেন ইন্দ্রানী দেবী। তখন তো পারিজাত বাবু গল্প লিখলেই আগে ওঁকে শোনাতেন। উনি ভাল বললে তবেই পাঠাতেন বিভিন্ন পত্রিকায়। অনেক সময় বেশ কিছু লেখার কিছু পরিবর্তন করতে হলেও উনি বলতেন। কিন্তু যখন এই পাগলামির জন্যে ২২ বছরের চাকরিটাই ছেড়ে দিলেন তখন আর…

“এই যে! অমৃত সুইটস্‌।”

ড্রাইভারের গলার আওয়াজে  ইন্দ্রানী দেবী বুঝলেন ওঁকে এবার নামতে হবে।

* * *

ইন্দ্রানী দেবীর বাবা মারা যায় যখন তখন ওঁর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বাবার শরীর অনেকদিন থেকেই খারাপ যাচ্ছিল। কিন্তু ওঁর মায়ের যাওয়াটা যেন আরও আকস্মিক। একদিনের হার্ট অ্যাটাকেই সব শেষ। তারপর থেকে উত্তর কলকাতার এই পুরোনো বাড়িতে আসেন নি উনি। পুরোনো স্মৃতিগুলো তাড়া করবে এই ভয়েই হয়ত।

আজ দুপুর এর পর থেকেই বৃষ্টিটা বেশ জোরে পড়ছে। দুর্গাপূজোর আগে যা বৃষ্টি হওয়ার সেটা হয়ে গেলেই ভালো। নাহলে আবার পূজোটা মাটি হবে।

এই কথাটা মনে হতেই নিজের ওপর ভীষন হাসি পেল  ইন্দ্রানী দেবীর। এ বারের পূজোটা যে এমনিই মাটি সেটা আর ভাবার অপেক্ষা রাখে না। তা সে বৃষ্টি হোক বা না হোক।

শুয়ে শুয়ে একথা সেকথা ভাবতে ভাবতেই ওঁর চোখ গেলে পাশের একটা টেবিলের দিকে। এটা তো উনি খেয়াল করেন নি আগে। এটা কবে কেনা হয়েছে? টেবিলের ওপর একটা টেবিল ল্যাম্প টেবিলের সামনের দিকের ড্রয়ারটিতে এখনো চাবি লাগানো রয়েছে।

খাট থেকে উঠেই ড্রয়ার টা খুললেন ইন্দ্রানী দেবী। ড্রয়ারের ভেতর সযত্নে রাখা রয়েছে একটা ডায়েরী।

আমার মনের মধ্যে মাঝে মাঝেই একটা প্রশ্ন খুব উঁকি দিত। স্বপ্ন মানুষের কাছে বেশি মূল্যবান না স্মৃতি?  খুব বেশি মানুষ কে আমি এটা জিজ্ঞেস করতে পারিনি। কারন খুব বেশি মানুষের সাথে আমার মেশার সুযোগ হয় নি। যার সাথে বেশি হয়েছে তাকে যখনই জিজ্ঞেস করতাম সে বলত, আমি অত কিছু বুঝি না। আমার কাছে তুমিই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।

ছোটোবেলা থেকেই আমি খুব কম কথা বলি। মানে যেটাকে Introvert বলে আর কি। সারাক্ষন গল্পের বইতে মুখ দিয়ে বসে থাকতাম। শেক্সপীয়র থেকে আর্থার কোনান ডয়েল আবার হেমেন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিচ্ছু বাদ দিতাম না। সব বই এর যোগান দিত আমার কাকু।

বাড়ি থেকে যখন আমার বিয়ে দেওয়া হল তখন আমার বয়স ১৬। আমার একেবারেই ইচ্ছে ছিল না বিয়ে করার কিন্তু বাবার ওপর কথা বলার সাহস আমি কখনও দেখাই নি। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে আসার পর শুরুর দিকে আমি কারুর সাথে কথা বলতাম না। খুব কান্না পেত। এক এক সময় তো প্রায় সারা রাত না ঘুমিয়ে কেঁদেছি খুব। তার কারন আমার স্বপ্ন ছিল যে আমি লিখব। কত কিছু ভেবেছিলাম এসব নিয়ে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার অর্থ সেই স্বপ্নকে জলাঞ্জলী দেওয়া এবং ঘর সংসার করা। এই স্বপ্ন ভাঙার যন্ত্রনা আমায় বহুদিন তাড়া করেছিল।

কিন্তু আর একটা মানুষের সাথে এক ছাদের তলায় থাকতে থাকতে আমার ভেতরের যন্ত্রনা টা যেন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ওই যে বলে না, মানুষ অভ্যাসের দাস। আমার মনে আছে আমি প্রথমবার ওঁর সাথে ভালো ভাবে কথা বলেছিলাম। মহালয়ার দিন। তার আগে ওনার শত চেষ্টাতেও ভালো করে মুখ তুলে তাকাতে পারিনি।

উনি বললেন, “শোভা? কোথাও ঘুরতে যাবে? পূজো তো আসছে।”

“কোথায়?”

“তুমি বল কোথায় যাবে?”

“আমি তো জানিনা সেরকম ভালো কোনো জায়গা?”

“পুরী গিয়েছো আগে কখনো?”

পুরী তো দূরের কথা আমি আমার নিজের রাজ্যের জায়গাই দেখিনি ভালো করে। স্বভাবতই দু’দিকে ঘাড় নাড়ালাম।

উনি বললেন, “তাহলে পুরীর টিকিট পাই নাকি দেখি। আমার অফিসের এক কলিগের ভাই রেলে চাকরী করে। আশা করছি ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”

ব্যবস্থা সত্যিই হয়েই গিয়েছিল। প্রথম বার সমুদ্র দেখার অভিজ্ঞতা আমি এভাবে লিখে বোঝাতে পারব না। তাই চেষ্টাও করছি না। কিন্তু আরও কিছু জিনিস দেখেছিলাম আমি।

সেইবারই আমার প্রথম ট্রেনে ওঠা। তাই স্টেশনের পরিবেশের সাথে আমি খুব একটা পরিচিত ছিলাম না। কিন্তু পুরী স্টেশনে এবং জগন্নাথ মন্দিরের বাইরে যত ভিখারী দেখেছিলাম তত মানুষ আমি ১৭ বছরে দেখেছি এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি না।

সেদিন কিছু জিনিস বুঝেছিলাম। আমার লেখিকা হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে গেছে বলে আমি এতদিন কারুর সাথে ভালো ব্যবহার অবধি করিনি। কিন্তু এটাই তো সব নয়। যারা সামনে থালা বাটি নিয়ে, কোলে ছোটো ছোটো বাচ্চা নিয়ে ওখানে বসে ভিক্ষে করছে ওরা কি স্বপ্ন দেখেনি? ওদের ছেলে মেয়ের স্বপ্ন দেখেনা? আমার তো অন্তত মাথার ওপর ছাদ রয়েছে, দু’বেলা খাবার যোগান রয়েছে।

সব স্বপ্ন কখনও সত্যি হয় না। যারা বলে হয়, তারা হয় জানে না আর না হয় মিথ্যে বলে। আজ এত বছর বাদে কেন এসব লিখছি আমি নিজেও জানিনা। হয়ত লিখতে চাই বলে হয়ত জীবনের শেষ লগ্নে এসে আরও কিছু অনুভব করেছি বলে।

স্বপ্ন মূল্যবান ঠিকই। তবে আমার কাছে আজ যেন স্মৃতিগুলো আরও বেশি মূল্যবান মনে হয়।

কাল রাতে পারিজাত বাবুর শুতে খুব দেরী হয়ে গিয়েছিল। নতুন একটা গল্প লিখছিলেন। সেটা শেষ করে তারপর শুয়েছেন। স্বভাবতই সকালে উঠতে খুব দেরী হওয়ার কথা। কিন্তু ঘুমটা খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে গেল ওঁর। তার কারন হয়ত খিদে। কাল দুপুরের পর থেকে কিছু খান নি। রাতেও পেটে কিছু পড়েনি আর ওঁর ছেলেরও কোনো পাত্তা নেই। কোথায় গেছে কে জানে? ফোনেও লাগল  না।

গতকাল দুপুরের পর থেকে ভীষন অস্থির লাগছিল পারিজাত বাবুর। কয়েকবার ফোন করেছেন স্ত্রীকে। কিন্তু প্রথম দু’বার সেটা কেটে দেওয়া হল এবং তৃতীয়বারের বেলায় ফোনটা সুইচ অফ করে দেওয়া হল। এর পর আর চেষ্টা করেন নি। কেউ যদি থাকতে না চায় তাহলে তাকে জোর করে রাখার কোনো মানে হয় না। আর থাকতে চাইবেই বা কেন? পারিজাত বাবু নিজেও মাঝে মাঝে বোঝেন যে পাগলামি করছেন। বোঝেন যে এবার এসব বন্ধ করা উচিত কিন্তু নিজের মন কে বোঝাতে পারেন না।

ঢং ঢং করে ডাইনিং এর ঘড়িটায় ৬ টা ঘন্টা বাজল। আজ কত তারিখ হল যেন? ২ রা সেপ্টেম্বর বোধ হয়। এটা মনে পড়তেই পারিজাত বাবুর হঠাৎ কালকের তারিখের কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল যে কাল ওদের বিবাহ বার্ষিকী ছিল। ছিঃ ছিঃ! নিজেকেই নিজেই ধিক্কার দিলেন তিনি। এটা উনি ভুলে গেলেন কীভাবে? এই অন্যায়ের কোনো ক্ষমা নেই।

এমন সময় বাইরে একটা আওয়াজ শুনেই চমকে উঠলেন পারিজাত বাবু। বাড়িতে তো কেউ নেই। তাহলে আওয়াজ আসছে কোত্থেকে? আওয়াজ টা কয়েক সেকেন্ড ছাড়া ছাড়া হয়েই যাচ্ছে? ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে পড়লেন উনি। আওয়াজটা রান্নাঘরের দিক থেকেই আসছে বোঝা যাচ্ছে।

তাড়াতাড়ি করে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলেন ওঁর স্ত্রী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ওর ঘরের দিকেই আসছেন। ওকে দেখেই বললেন, “ও! উঠে পড়েছো? মুখ হাত ধুয়ে নাও। বাড়িতে অল্প ময়দা ছিল। লুচি করেছি। খেতে খেতে নতুন কি লিখেছো শুনবো।”

পারিজাত বাবু কয়েক মুহুর্ত অবাক চোখে তাকিয়ে চলে গেলেন বাথরুমের দিকে।

ইন্দ্রানী দেবী সোফায় রাখা নিজের ব্যাগের চেনটা খুলে একটা ডায়রী বার করলেন। এটা কাল মায়ের ড্রয়ারে পেয়েছেন। ডায়রীর ওপর লেখা, “স্মৃতিটুকু থাক” তার ঠিক নীচে লেখা শোভারানী চৌধুরী।

একটা কাছের মানুষের স্বপ্ন ভাঙার কথা উনি জেনেছেন। আর একজনের টা বাঁচানোর জন্য অল্প চেষ্টা করাই যায়।

স্মৃতিটুকু থাক

Post navigation


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: