১৫ই জুলাই, ২০৪৭

অনেকক্ষন থেকেই স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন অঞ্জনবাবু। কই কিছু তো হচ্ছে না! প্রায় ১২ ঘন্টা হয়ে গেল। এবার তো অন্তত কিছু হওয়া উচিত।  উনি তো দেখেছেন এতে কাজ হয়। সেই জন্যেই নিজেও করলেন এই কাজ টা। কিন্তু এখনো অবধি তো কোনো সাড়া শব্দ নেই কারুর। হ্যাঁ মানে লোকজন এর সাড়া শব্দ উনি ভালোই পাচ্ছেন। প্যান প্যানানি সুর উঠেছে আশে পাশে। কিন্তু যাদের জন্য এত বড় Step নিলেন তাদের তো কিছু হেলদোলই নেই রে ভাই!

ছোটোবেলা থেকেই ছবি আঁকার শখ ছিল অঞ্জন বসুর। বেশ ভালো ছবি আঁকতেন। ফেসবুকেও দিতেন নিয়মিত। তবে DSLR মার্কেটে আসার পর বুঝলেন ওটা বেশি কার্যদায়ক। কাজেই DSLR নিয়ে শুরু করেছিলেন মামনি দের ছবি তোলা। ফেসবুকে একটা পেজ ও খুলেছিলেন Anjan’s Photography বলে। জ্যুকারবার্গ এর দয়া তে মোটামুটি ৪০ হাজার এর কাছাকাছি লাইক ছিল। উনি জানেন আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এটা কিছুই নয় হয়তো! তাও নিজেকে মোটামুটি একটা মাইক্রো সেলেব্রিটি ভাবতে বেশ ভালোই লাগত। তারপর ওঁর বিয়ে হল ২০২০ সাল নাগাদ। ছেলেও হল একটা পরের বছর। তবে তাতে অবশ্য Mamonigraphy তে খুব একটা ভাটা পড়ে নি ওঁর।

যাই হোক এভাবে চলছিল সবই তারপর বছর ২৫ পর হঠাৎই সুখে থাকতে ভূতে কিলোলো অঞ্জনবাবু কে।

২ রা আগস্ট, ২০৪৭

পিঠে কিলের আঘাত খেয়েই ঘুম টা ভেঙে গেল অম্লান এর। ঘাড়ের কাছে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল মনে হল। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। জানলায় গ্রিল দেওয়া। তাহলে? বাবার সুইসাইড এর পর কিছুদিন ঘর টা ফাঁকাই পড়েছিল। তারপর ও নিজেই ঠিক করে এই ঘরটায় থাকবে। একটু গা ছমছম করেনি যে তা নয়। কিন্তু খুব একটা পাত্তা দেয় নি ও সেই ভয় কে।

পিঠ টা এখনো বেশ ব্যাথা করছে। হঠাৎই ঘরের অন্ধকার এর মধ্যে একটা ছায়ামূর্তি কে দেখেই হৃৎকম্পন শুরু হয়ে গেল ওর। ঠিক এই সময়ই চেনা গলায় ছায়ামূর্তিটা বলে ওঠে, “ভয় পাস না। আমি তোর বাবা!”

অম্লান কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, “ভয় পাবো না???”

–       নারে পাস না। আমার আত্মার শান্তি হয় নি। তাই এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছি এ ঘরের মধ্যে!

কোন সিনেমায় যেন দেখেছিল গয়ায় গিয়ে পিন্ড দিলে ভূতেদের আত্মার শান্তি হয়। কথাটা বলতে যাবে তক্ষুনি অঞ্জনবাবু বললেন, “সারা জীবনে এত মামনির এত অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুললাম জানিস। কিন্তু কেউ একটু কেয়ার করলো না। কেউ না! একটা মেয়েও যদি করতো!”

–       কী করে জানলে করে নি?

–       আরে আমি মারা গিয়েছি ১৫-১৬ দিন হয়ে গেছে। আর আমার ব্যাপারে না হল কিছু কথা, না হল কিছু পোস্ট শেয়ার। ধুর! ভাবলাম সময় থাকতে সুইসাইড করলে একটু বিখ্যাত হয়ে যাবো!

অম্লান এবার অনেকটা স্বাভাবিক। বলল, “আরে এর জন্য মন খারাপ কোরো না! ওরা হয়তো খবর পায় নি। পেলে নিশ্চয় করতো!”

“তাই হবে হয়তো!” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন অঞ্জনবাবু।

–       তবে একটা কাজ কিন্তু করা যায় কিন্তু বাবা!

–       কী রে?

–       আমার ৩ টে ফেক প্রোফাইল আছে। ২ টো মেয়েদের নামে একটা ছেলের নামে।

–       এত গুলো? আমাদের সময় একটা করে বানাতাম আমরা।

–       বাবা! এটা ২০৪৭! তিনটে ফেক প্রোফাইল তো Banta Hai na!

–       আচ্ছা যাই হোক। কি বলছিলি বল!

–       বলছিলাম যে একটা মেয়ের প্রোফাইল থেকে তোমাকে ট্যাগ করে লিখে দি Rest In Peace. তাহলেই লোকে জানতে পেরে যাবে! তারপরেই শেয়ারে ভরে যাবে সারা News Feed!

–       WOW! এটা তো মন্দ বলিস নি!! তাহলে কালকেই লেগে পড় কাজে!

–       হ্যাঁ একদম!

৩ রা আগস্ট, ২০৪৭

আজ অঞ্জনবাবুর মন টা খুব ভালো! ১২৩১ টা শেয়ার হয়েছে ওর ছবি দেওয়া ফটো! সারা জীবনের কৃতিত্বের জন্য এটুকু তো ওঁর পাওয়া উচিত ছিল আগেই। এবার উনি শান্তিতে স্বর্গে যেতে পারবেন। হঠাৎই একটা জিনিস দেখে আবার মাথাটা খুব গরম হয়ে গেল অঞ্জনবাবুর। ওর সারা জীবনের খাটনির ফল এভাবে ভোগ করবে অম্লান??? এটা ঠিক না একদম। পরক্ষনেই ভাবলেন, থাক! আর মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই। ছেলে তো ওর জন্য অনেক কিছু করেছে। এসব ভাবতে ভাবতেই স্বর্গের পথে রওনা দিলেন অঞ্জন বসু।

ওর ছেলে সেদিকে তখন বাবার Anjan’s Photography পেজের নাম পরিবর্তন করে Amlan’s Photography করে দিয়েছে! Mamonigraphy র লোভ কেই বা ছাড়তে পারে! বাবার Legacy টা বজায় রাখতে হবে তো!

ভূত-ভবিষ্যত

Post navigation


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *