জানলা দিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দেখল ও একবার। বৃষ্টিটা একটু কমেছে। একেবারে থামেনি যদিও তবে মিনিট পনেরো আগে যেরকম মুষলধারে হচ্ছিল তার তুলনায় অনেকটাই কমেছে। ওহ! আজকের দিনটাই মাটি হয়ে যাচ্ছিল আর একটু হলে। সকাল থেকে বৃষ্টি যেন হচ্ছে তো হচ্ছেই। আচ্ছা ওর কি মন খারাপ? না, খুব বেশী নয়। একটু খারাপ। আসলে জয় এর এস এম এস টা পেলে ভাল লাগত। ও যদি আজকের দিনটা ভুলে যায়, তাহলে কে মনে রাখবে? আর বাপি? বাপিও তো ভুলে গেছে। সকালবেলাতেই কোথায় না জানি বেরিয়ে গেল বৃষ্টি মাথায় করে। এখনো ফেরেনি। কি হয়েছে কি সবার আজ? সবার কি একই দিনে অ্যামনেশিয়া হয়ে গেল নাকি? মা। মাকে খুব মনে পড়ছে আজ। মা থাকলে কি বাপি আজকের দিনটা ভুলে যেতে পারত? কখনোই পারত না। কেন যে হঠাৎ চলে গেল মা না বলে। কলিং বেলটার হঠাৎ আওয়াজ এ সংবিৎ ফিরল ওর। বাপি এল বোধহয়। চুপচাপ গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। ঘরে ঢুকল বাপি। ঢুকেই চেঁচিয়ে বলল, “কোন বেয়াদপ বাড়ির সামনে একটা স্কুটার রেখে দিয়েছে। গেটটা পুরো ব্লক হয়ে আছে। যা তো মা, একটু সরিয়ে দে তো।”

“যাচ্ছি” বলে জুতোটা পায়ে গলিয়ে নেমে গেল ও নিচে। কে না কে স্কুটার রেখেছে বাড়ির সামনে সেটা নিয়ে চেঁচামেচি করছ। কিন্তু আজ যে নিজের মেয়ের জন্মদিন সেটা ভুলেই গেছ। কেমন বাবা তুমি? বুকটা ফেটে কান্না আসতে চাইল ওর। কাছের মানুষেরা সবাই কি করে ভুলে গেল আজকের দিনটা।
নিচে নেমে দেখল গেটের সামনেই একটা হিরো হন্ডা প্লেসার রাখা। একদম নতুন মনে হচ্ছে। কে কিনল আবার এটা? সামনের বাড়ির জয়ন্ত কাকুর মেয়ে কি আমেরিকা থেকে চলে এল নাকি? ও পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল স্কুটিটার দিকে। দেখল সিটের ওপর একটা বড় কার্ডবোর্ডের ওপর রাখা একটা সাদা কাগজে লেখা আছে, “Happy Birthday Ma”. মানে? কিছু ভাবার আগেই পেছন থেকে বাবার গলা শোনা গেল, “কিরে? ভেবেছিলি আমি ভুলে গেছি?” আর কিছু ভাবতে পারল না ও। চোখে হঠাৎই জল চলে এল। লজ্জা পেয়ে ঝাপিয়ে পড়ল বাবার বুকে। “আই লাভ ইউ বাপি। সরি আমি ভেবেছিলাম তুমি ভুলে গেছ।”
“হয়েছে হয়েছে। আর মাখন লাগাতে হবেনা। এই নে চাবি।”
চোখটা মুছে চাবিটা নিয়ে ও ছুটে গেল ওর স্কুটির দিকে। চাবি লাগিয়ে স্টার্ট দিল গাড়িতে।
“সাবধানের চালাস। আজ রাস্তা কিন্তু খুব স্লিপ হয়ে আছে।” বলল বাবা।
“ঠিক আছে। চাপ নিও না। একপাক ঘুরেই চলে আসব।”
“আর হ্যাঁ, বাইক পছন্দ করা থেকে আজ নিয়ে আসার আগে অবধি সব কিছুই কিন্তু তোর এক বন্ধু করেছে।”
অবাক হল ও। “আমার বন্ধু? কে?”
“ঘুরে আয়। তারপর বলব।”
“ওকে টাটা। এখুনি ফিরব।”
তারপর স্কুটি চালিয়ে বেরিয়ে গেল ও। বৃষ্টি এখন আর পড়ছে না। ওহ! কি আনন্দ যে হচ্ছে ওর কেউ ভাবতেই পারবেনা। কতদিনের ইচ্ছে ছিল নিজের একটা স্কুটি হবে। আজ ইচ্ছে পূরন হয়েছে। বাঁদিকে সুদীপদার গলি, ডানদিকে হলুদ-কালো রেলিং দেওয়া পচা পুকুর পেরিয়ে ও এগিয়ে চলল স্কুটার নিয়ে। আস্তে আস্তে ও এসে পড়ল কাটান যাওয়ার মরাম দেওয়া রাস্তায়। এই রাস্তায় ও আগে অনেকবার এসেছে। প্রথম প্রথম যখন প্রেমে করছে তখন এখানে চলে আসত দু’জনে। বাড়িতে কেউ জানতেও পারত না। আর এদিকটায় লোকজনও বিশেষ নেই। দুদিকে সবুজ মাঠ। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। হঠাৎই ওর চোখ গেল ওর সামনে হেঁটে যাওয়া ছেলে-মেয়েগুলোর দিকে। ছেলেটার টি-শার্টটা খুব চেনা লাগছে। মেয়েটাকেও চেনা লাগছে পেছন থেকে। দু’জনে হাত ধরে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে নিশ্চিন্তে। কে ওরা? এত চেনা লাগছে কেন ওর? ছেলেটা একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ চুমু খেল মেয়েটার গালে। তারপর পেছনে তাকাল একবার। আরে? এতো……..
স্কুটার এর হ্যান্ডেলটা একটু নড়ে গেল কি? চাকাটা স্লিপ করল মরামে। উলটে পড়ার মুহুর্তে ওর একটাই কথা মনে এল। মানুষ বিশ্বাস ভাঙ্গে কেন? কি আনন্দ পায় ওতে? মাথায় খুব ব্যাথা অনুভব করল ও। মুখটাও খুব জ্বালা করছে। পায়ের ওপর কিছু একটা ভারি জিনিস পড়েছে। চোখটা আর খুলে রাখতে পারল না ও।

সপ্তমী, সকাল
জয়

“এই ওঠ রে বাবু। অয়নরা দাঁড়িয়ে আছে কখন থেকে।” মায়ের ডাকে চোখ খুলল জয়। মোবাইলে সময়টা দেখল। ছ’টা বাজতে পাঁচ। এত তাড়াতাড়ি উঠে কি করবে ও। অয়নরা দাঁড়িয়ে আছে কেন? এত সকালে কি আর অন্য কাজকর্ম নেই ওদের?
ফোনটা বাজল হঠাৎ। স্ক্রিনে নাম দেখাল রাজর্ষি দা। কি হয়েছে কি আজ সবার ? কেউ মারা গেছে নাকি হঠাৎ। ঘুম জড়ানো গলায় বিরক্তি মিশিয়ে ফোন ধরল ও।
“হ্যালো।”
ওপ্রান্ত থেকে চিৎকার এল, “অ্যাই গরু? ক’টা বাজে? আজ ক্লাবের পুজো, ঘট ডোবাতে যেতে হবে। আর তুই শালা এখনো ঘুমোচ্ছিস?”
মুহুর্তের মধ্যে সব মনে পড়ে গেল ওর। এ বাবা! তাই তো। কাল রাত্রে পইপই করে বলে দিয়েছিল রাজর্ষিদা সবাই কে। যাতে সবাই যেন ৫টার মধ্যে চলে আসে। কি যে হয়েছে ওর এখন। কাল শোবার আগে ভেবেছিল অ্যালার্ম দিয়ে দেবে। কিন্তু বেমালুম ভুলে গেছে। তড়াক করে সোজা হয়ে বসল বিছানায়।
“সরি বস। আসছি ১৫ মিনিটের মধ্যে।”
“তাড়াতাড়ি আয়। আমি মৈনাক আর অয়নকে পাঠিয়েছি তোর বাড়ি।”
“ওকে। আসছি এখুনি।”
তারপর ফোন রেখেই ছুটল বাথরুমে। ১০ মিনিট পর রেডি হয়ে নিচে নেমে এসে দেখল অয়ন আর মৈনাক বিরক্তিভরা মুখ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
“সরি সরি। ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেল।” জয় বলল।
অয়ন দাঁত খিচিয়ে বলল, “শালা সারারাত ধরে যদি হ্যান্ডেল..”
“ওহ! অয়ন আস্তে। এখনও জয় এর বাড়ি পেরোসনি এটা মাথায় রাখ।” মৈনাক থামাল অয়নকে।
জয় শুধু হাসল। মৈনাকটার মধ্যে বেশ বাবা বাবা ভাব চলে এসেছে।  সাইকেলটা বের করে সিটে বসল জয়। মৈনাক আর অয়নও সাইকেল এনেছে। আজকের ওয়েদারটা বেশ ভাল। মেঘ হাল্কা আছে আকাশে তবে বৃষ্টি হবে বলে মনে হয় না। ওদের ক্লাব মানে ‘রামনগর তরুন সংঘ’ প্রত্যেক বারই খুব ধুমধাম করে দুর্গাপূজো করে। ক্লাবের প্রধান চার সদস্য হল, জয়দ্বীপ রায়, অয়ন চৌধুরী, মৈনাক চক্রবর্তী আর রাজর্ষি দা মানে রাজর্ষি মন্ডল। রাজর্ষিদা অবশ্য ওদের সাথেই পড়ে সেকেন্ড ইয়ার এ। আসলে ক্লাস টেনে পড়তে পড়তে একবার রাজর্ষিদার খুব শরীর খারাপ হয়। মাধ্যমিক এর আগে প্রায় ২০ দিন নার্সিংহোমে ভর্তি থাকতে হয়। সেবার আর রাজর্ষি দা মাধ্যমিক দিতে পারেনি। এক বছর ড্রপ দিয়ে আবার জয়দের সাথে পরীক্ষা দেয়। সেই থেকে রাজর্ষিদা ওদেরই বন্ধু।
“তোর কি হয়েছে রে মৈনাক? সকালবেলাতেই এত হট হয়ে আছিস কেন?” জয় এর কথায় মৈনাক ওর দিকে মুখ ফেরাল।
অয়ন পাশ থেকে ফোড়ন কাটল, “ওর তমা মনে হয় কাল রাতে লিক করেনি। সেই জন্যেই মেজাজ গরম ওর।”
মৈনাক ফুঁসে উঠল এবার, “অয়ন এবার কিন্তু বাবা-মা তুলে গালি দেব। ভাল লাগবে তো তখন?”
“আরে থাম না।” জয় বলল, “কি হয়েছে বল মৈনাক।”
“তমালিকা আমার সাথে আর সম্পর্ক রাখতে চায় না।”
“মানে? কেন?”
“জানিনা। বলছে ও আর আমার প্রতি আগের মত টান অনুভব করছে না। আর ভালবাসতে পারবেনা আমাকে।”
“দেখ হয়ত ফ্যামিলিতে কিছু প্রবলেম হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে। এখনি অত চাপ নিসনা। কয়েকদিন একটু ব্রেক দে ব্যাপারটা তে”।
“হুম।” ছাড়া আর কিছু বলল না মৈনাক। ক্লাবে গিয়ে ওরা দেখল ওরা বাদে সবাই তৈরি ঘাটে যাওয়ার জন্য।  রাজর্ষিদা ওদের দেখে বলল, “কোনোদিন কি সময় জ্ঞান হবেনা তোদের?”
অয়ন পাশ থেকে ফোড়ন কাটল, “আহ! আবার বহুবচন কেন?”
“চুপ কর। তোরা সবকটা একইরকম। ক্লাবের পূজো যত মাথাব্যাথা শুধু আমার। নে সাইকেলগুলো রেখে চল। দাঁড়িয়ে আছে সবাই তোদের জন্য।”
ক্লাবের দুয়ারে সাইকেলটা রাখতে রাখতে অয়ন বলল, “আচ্ছা কবি নজরুল এর একটা গান আছে না- ‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে’ ?”
মৈনাক এবার ফিক করে হেসে ফেলল, বলল “ওরে ক্যালানে। ওটা রবীন্দ্রসঙ্গীত”।
অয়ন বলল, “আরে আমি জানতাম। দেখছিলাম তুই জানিস কিনা”।
এরা সত্যি এক একটা স্যাম্পেল। হঠাৎ অয়ন বলে উঠল, “আরে ওটা শুভদীপ না? অনিন্দিতার বয়ফ্রেন্ড?”
অনিন্দিতার নামটা শুনেই ফিরে তাকাল জয়। এই নামটা শুনলে ওর মনের ভেতরটায় কে যেন হাতুড়ি পিটতে থাকে। হ্যাঁ শুভদীপই তো! ও এত সকালে এখানে কি করছে? মৈনাক বলল, “রঞ্জনার বাড়ি থেকে বেরল মনে হল।”
“এত সকালে?” জয় অবাক হয়ে বলল, “ওর বাড়ি তো অনেক দূর রে। ওখান থেকে রামনগর আসতে আসতে প্রায় ১ ঘন্টা লেগে যায়। এই সময় ও রঞ্জনার বাড়িতে কি করছে?”
“ওরে সাইকেল রাখতে রাখতে কি দশটা বাজিয়ে দিবি?” পূজো প্যান্ডেলের সামনে থেকে রাজর্ষিদার চিৎকার শোনা গেল। আপাতত শুভদীপ ভাবনায় ইতি দিয়ে ওরা এগিয়ে গেল প্যান্ডেল এর দিকে।

সপ্তমী, সকাল
অনিন্দিতা

আজ সকালে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেছে অনিন্দিতার। বাবা এখনো ওঠেনি। ও বরাবরই দেরী করে ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু আজ হঠাৎই ঘুমটা ভেঙে যেতে আর শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করল না। আজ সপ্তমী। মুখ ধুয়ে নিজেই চা বানিয়ে ছাদে চলে গেল ও। দোলনায় বসে বসে চা খেতে লাগল। আকাশটা খুব সুন্দর লাগছে। শরৎকালের আকাশ তো এরকমই হয়। নীল এর মাঝে মাঝে সাদা সাদা তুলোর মত মেঘ। বহুদিন পর আজ সকালের আকাশ দেখছে ও। পাশের সব বাড়িগুলোরই জানলা এখনো বন্ধ। কেউ ওঠেনি এখনো ঘুম থেকে। হঠাৎ অনিন্দিতার মনে হল সারা পৃথিবীতে কি এখনো কেউ ওঠেনি? নিজেকে খুব লাকি মনে হল ওর। এই অসাধারন সকালটা হয়ত এই মুহুর্তে শুধু ওই দেখতে পাচ্ছে এটা ভেবে।
মোবাইলে দেখল ৬ ট ১৫ বাজে। ওর ইচ্ছে হল শুভদীপ কে একবার ফোন করতে। শুভর কি হয়েছে কে জানে? গত তিন-চারদিন ভাল করে কথা বলছেনা। বলছে নাকি খুব ব্যস্ত। পূজোর ছুটিতে কিসের এত ব্যস্ততা এটা বুঝতে পারেনা অনিন্দিতা। শুভর নাম্বার টিপে ডায়াল করল ও। কিছুক্ষন পরেই রিং হতে শুরু করল। ঘুমোচ্ছে নাকি কে জানে? নাহ! কেউ ধরল না। রিং হতে হতে কেটে গেল। আবার করল ও।
নাহ! এবারও কেটে গেল। ধুর! সবাই খালি ঘুমোচ্ছে আজ। দূরে কোথাও একটা ঢাকের আওয়াজ পেল ও। ঘট ডোবাতে যাচ্ছে বোধহয় কোনো ক্লাব। ওদের বাড়ির গলি থেকে বেরিয়েই বড় রাস্তা, সেটা দিয়ে কিছুদূর গেলেই কংসাবতী নদীর ঘাট। সেখানেই আসে অনেক ক্লাব ঘট ডোবাতে। হঠাৎ ওর মনে পড়ল আজ জয় এর ক্লাবের পূজো। ওরা তো বোধহয় এই রাস্তা দিয়েই যাবে। ওদের সাথে ঘাট অবধি গেলে খুব ভাল হত। বাড়িতে থাকতে এখন আর ইচ্ছে করছে না ওর। জয় কে ফোন করল ও।
কিছুক্ষন পরে ওপ্রান্ত থেকে শোনা গেল, “হ্যাঁ বল”।
“কোথায় রে তুই?”
“এই তো ঘট ডোবাতে যাচ্ছি”।
“আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে কতক্ষন পরে যাবি? আমিও যাব তোদের সাথে”।

“তুই? কেন?”
“এমনি। ঘুম ভেঙে গেছে। ভাল লাগছেনা ঘরে বসে থাকতে। শুভকে ফোন করলাম ফোন তুলল না। ঘুমোচ্ছে বোধহয়”
“আরে আমরা তো তোদের বাড়ি পেরিয়ে গেছি। এখন প্রায় ঘাটের কাছে। এখন আর আসতে হবেনা। খুব ব্যস্ত আমি এখন। আর রাজির্ষিদা টা শেষ মুহুর্তে কোথায় যেন চলে গেল। সন্ধ্যে বেলায় ক্লাবের পুজোয় আসিস।”
মনটা খারাপ হয়ে গেল ওর। ধুর! সবাই নিজের নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। আর জয়টাও এখন কেমন যেন হয়ে গেছে ম্যাদামারা টাইপের। অথচ আগে দু’জনের বন্ধুত্বটা খুব ভাল ছিল। বেস্ট ফ্রেণ্ড ছিল একে অপরের। তারপর শুভ এল অনিন্দিতার জীবনে। ও জয়কে ঠিক মেনে নিতে পারত না অনিন্দিতার সাথে। বহুবার গোলমাল হয়েছে জয়কে নিয়ে। তারপর আস্তে আস্তে কথাবার্তা কমিয়ে দিয়েছে ও জয় এর সাথে। আর জয় নিজেও তো কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি কেন অনিন্দিতা ওর সাথে কথা বলা কমিয়ে দিল। এখন শুভও ওকে খুব একটা সময় দেয় না। মাঝে মাঝে তাই খুব একা লাগে অনিন্দিতার। যখন জয় ছিল তখন কোনদিন এই একাকীত্বটা ও অনুভব করেনি। কিন্তু এখন করে।
“কিরে কিছু বল।“ ওপাশ থেকে জয় এর অধৈর্য গলা শোনা গেল।
“রাখছি এখন” বলে ফোনটা কেটে দিল অনিন্দিতা। ছাদ থেকে নেমে এল ও। বাবা এখনো ঘুমোচ্ছে মনে হয়।  টেবিলে মায়ের ছবিটা রাখা আছে। দেখলে মনে হবে মা যেন হাসি মুখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। হঠাৎ যে কি হয়ে গেল। এই তো সেদিনও মা ওকে খাইয়ে দিয়েছে রাতে। আসলে ও রাত্রে সবদিন মায়ের হাতে খেত। মা না খাইয়ে দিলে খেতই না। এই ব্যাপারটা অবশ্য ওর বন্ধুরা কেউ জানেনা। শুধু জয় জানে। জয়কে একদিন কথায় কথায় বলে ফেলেছিল ও। তারপর জয় এর সে কি হাসি। প্রচন্ড খেপিয়েছিল সেদিন জয় ওকে।
“কিরে মা? কখন উঠলি?” বাবার ডাকে ঘোর কাটল অনিন্দিতার।
“অনেকক্ষন। আজ খুব তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেছে আমার।”
“তাড়াতাড়ি ? বলিস কি রে? সূর্য উঠেছে আজ?”
“এই তুমি সকাল সকাল আমায় রাগিও না তো!” ভুরু কুঁচকে রাগী রাগী মুখ করে বলল অনিন্দিতা। বাবা হেসে চলে গেল বাথরুমে। রাগলে ওকে খুব মিষ্টি লাগে জয় বলত। অনিন্দিতার ভাবতে মাঝে মাঝে অবাক লাগে যে ওর বয়ফ্রেন্ড শুভদীপের সাথে ওর যা মনে রাখার মত স্মৃতি আছে তার থেকে অনেক বেশি স্মৃতি আছে জয় এর সাথে। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল ওর। স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখল ‘শুভ কলিং’। হাসিমুখে ফোনটা তুলল ও। “বল”
“সকালবেলাতেই ঘুমটা না ভাঙালে কি চলছিল না?” শুভর গম্ভীর গলা শোনা গেল।
“আরে না আসলে তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার। সেই জন্যেই ভাবলাম তোকে একবার ফোন করি।”
শুভ এবার আরো রেগে গেল। বলল, “তোর ঘুম ভেঙে গেছে বলে তুই অন্যের ঘুম নষ্ট করবি? অদ্ভুত যুক্তি। জানিস কাল কত রাতে ঘুমিয়েছি আমি?”
অনিন্দিতার খুব বিরক্ত লাগছিল। এভাবে কথা বলছে কেন শুভ? এতও সুন্দর একটা সকাল নষ্ট করার অধিকার শুভকে কে দিয়েছে। সকাল ৬ টার সময় ফোন করেছে বলে এত মেজাজ দেখাতে হবে? এবার রেগে গেল অনিন্দিতা।
“কেন? কি করছিলি রাত্রে জেগে?”
“সেটা নাই বা জানলি। শোন। ডোন্ট কল মি এগেইন”
ফোনটা কেটে দিল শুভ। কি হয়েছে কি শুভর? আগে তো এরকম ছিল না ও। এতটা পরিবর্তন মাত্র ক’দিনের মধ্যে! ও ভাবল আর একবার কি ফোন করবে শুভকে। আজকের দিনটায় শুভর সাথে ঝগড়া করে থাকতে ইচ্ছে করল না ওর। ভাবল ফোন করে মানিয়ে নেবে শুভকে। শুভর নাম্বার ডায়াল করল। কিছুক্ষন পরে স্ক্রিনে দেখাল ওয়েটিং। কেটে দিল ও। মিনিট দশেক পরে আবার ডায়াল করল। ওয়েটিং আসছে। এখনো ওয়েটিং? কাকে ফোন করছে শুভ এখন?

(চলবে)

বোধন – পর্ব ১

Post navigation


2 thoughts on “বোধন – পর্ব ১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করবেন না দাদা